ঢাকা, মঙ্গলবার 25 July 2017, ১০ শ্রাবণ ১৪২8, ৩০ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যায় ভেঙ্গে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

এইচ এম আকতার : সুঁই সুতার অর্থনীতিতে গ্রামীণ ভূমিকাও কম নয়। কিন্তু শহরকে ছাড়িয়ে যাওয়া চাঙ্গা গ্রামীণ অর্থনীতিতে কালো মেঘের ছায়া পড়ছে। বন্যা আর রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাসে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ছে। অর্থনীতির এই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাজেট বাস্তবায়নে। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি। দ্রুত শহজ শর্তে কৃষিঋণ আর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন করা না গেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই ক্ষত থেকেই যাবে।

জানা গেছে, সোনালি আঁশের সেইদিন আর নেই। বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে তৈরি পোশাক রফতানি। অর্থাৎ শিল্পখাত এবং তার সঙ্গে সেবাখাত এগিয়ে গেছে অনেক। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে জিডিপিতে এখন কৃষিখাতের অবদান শতকরা ১৫ দশমিক ৩৩ ভাগ। এছাড়া এই কৃষিখাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে ৪৮ দশমিক ১ ভাগ কর্মজীবী মানুষের।

এরপরেও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ধীর গতিতে কৃষি প্রধান অর্থনীতি থেকে একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দেশে পরিণত হচ্ছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ২১ দশমিক ৮ ভাগ৷ ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি অবদান দাড়ায় ১৮ দশমিক ৭ ভাগ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবাখাতের অবদান ৫৩ দশমিক ৩৯ ভাগ, শিল্প খাতের ৩১ দশমিক ২৮ এবং কৃষি খাতের ১৫ দশমিক ৩৩ ভাগ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি বৃহৎ খাতের মধ্যে কৃষির অবদান এখন তৃতীয়।

জানা গেছে, টানা বন্যায় সারা দেশে ফসলের হানি হয়েছে। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের চাষযোগ্য শস্যভান্ডারও। এতে করে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে গ্রামীন জনপদ। এর প্রভাবে সারা দেশের বেড়ে যায় চালসহ সব ধরনের নিত্য পন্যের দাম। যে কৃষক নিজের চাহিদা পূরন করে ধান-চাল বিক্রি করে সংসার চালাতো সে এখনও ওএমএস কার্ডের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে।

জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে কিছুটা চাঙ্গা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। এতে দেখা গেছে, দেশের চাহিদা মিটিয়ে চাল রফতানিও করেছে বাংলাদেশ। বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪৪ বছরে দেশের ধান চাষের জমি ১৮ শতাংশ কমেছে৷ কিন্তু একই সময়ে চালের উৎপাদন বেড়েছে ৩ দশমিক ১৬ গুণ৷ বছরে দুই লাখ টন চাল রফতানি করা হয়। শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের চাল নিচ্ছে। আফ্রিকায় চাল রফতানির জন্য বাজার খোঁজা হচ্ছে।

 কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৫ লাখ টন চাল আমদানি করেও বাজার নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না সরকার। চালের দাম বাড়ছেই। কৃষকের নিরাপত্তায় চাল আমদানি ওপর শুল্ক বসানো হয়েছিল ২৫ শতাংশ। বাজার নিয়ন্ত্রণে শুল্ক ১৫ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ করছে। গ্রামীণ অর্থনীতি কতটা ভেঙ্গে পড়ছে এতে তা বুঝতে কষ্ট হয় না। 

বন্যায় কি পরিমান ফসলের হানি হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। একইভাবে মৎস্যখাতের ক্ষতিও জানা নেই পরিসংখ্যান ব্যুরোর। তাহলে কিভাবে তারা কৃষকের ক্ষতি পুরন দিবে। এতে করে ক্ষতি কাটিয়ে উঠার কোন সুযোগ নেই।

টিআর কাবখা বয়স্কভাতা মত সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টিনি আরও বাড়াতে হবে। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত হওয়ার কারণে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এসব খাতে ব্যয় না বাড়িয়ে আরও কমার সম্ভব না রয়েছে। এতে করে আরও ঝুঁকিতে পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতি।

একইভাবে যাদের সংসার চলতো বিদেশি টাকায় তারাও এখনও কিছুটা বিপাকে পড়ছে। তাদের মাসিক আয় কমছে। এর প্রভাবে কমেছে জাতীয় রেমিট্যান্স। সব মিলে গ্রামীণ অর্থনীতি নেতিবাচক ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়বে জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে। নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত না হওয়া এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই কালো মেঘের ছায়া কাটিয়ে উঠতে বাজেটে সামাজিক নি রাপত্তার বেষ্টনি আরও বাড়াতে হবে। ব্যাংকে অলস টাকা ফেলে না রেখে যদি সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেয়া যায় তাহলে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। তবে দেশের রফতানিতে যে হারে আয় কমছে তার প্রভাবও পড়তে পারে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। এতে করে কর্মসংস্থার হারাতে পারে অনেকেই।

সোনালী আশঁ থেকে শূই সুতার অর্থনীতিও কিছুটা বিপর্যয়ের মুখে। তৈরি পোষাক শিল্পের রফতানি গত ১৫ বছরের চেয়ে সবচেয়ে কম বিদায়ী অর্থবছরে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে বন্যা আর রেমিট্যান্স প্রবাহ কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এক বছর আগে ঋণের ১০০ টাকার মধ্যে শহরের ব্যবসায়ীরা নিতেন গড়ে ৯০ টাকা ১৫ পয়সা। আর বাকি ৯ টাকা ৮৫ পয়সা পেতেন গ্রামের মানুষ। এখন ১০০ টাকার মধ্যে গ্রামের মানুষ পাচ্ছেন গড়ে ১০ টাকা ১৭ পয়সা। আর শহরের ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন ৮৯ টাকা ৮৩ পয়সা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গর্বনর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগের বেশি গ্রামে বাস করে। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রামের উন্নতি মানেই সমগ্র দেশের উন্নতি। এ কারণে গ্রামের মানুষের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ব্যাংকের শাখা স্থাপন, এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকগুলোকে শহরের সমান অনুপাতে গ্রামে শাখা খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের সেবা দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তারপরেও আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কৃুষির অবদান আগের চেয়ে কমছে। বেড়েছে শিল্পের অবদান। তার সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বণ্যা আর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া। একইভাবে বিদেশ থেকে অনেক শ্রমিক খালি হাতে ফিরছেন। এরা আবারও বেকার হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়তে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে গ্রাম এলাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে মোট ঋণের ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তিন মাস পর অর্থাৎ ২০১৬ সালের মার্চ শেষে ঋণ বিতরণ আনুপাতিক হার বেড়ে ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালের জুনে আরও বেড়ে ১০ দশমিক শূন্য এক শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে গ্রাম এলাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে মোট ঋণের ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে শহর এলাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে মোট ঋণের ৯০ দশমিক ১৫ শতাংশ। তিন মাস পর অর্থাৎ ২০১৬ সালের মার্চ শেষে ঋণ বিতরণ আনুপাতিক হার কমে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। ২০১৬ সালের জুনে আরও কমে দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৯৯ শতাংশে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে শহর এলাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে মোট ঋণের ৮৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, গ্রামাঞ্চলে আগের চেয়ে এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ হচ্ছে। কৃষিখাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অকৃষি খাতে পল্লি এলাকার মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান সুসংহত হচ্ছে। তবে সম্প্রতি সারা দেশে বন্যা আর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি লন্ডভন্ড হচ্ছে। এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লাগবে। এজন্য সরকারকে নানা উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, পল্লি এলাকায় কৃষিখাতের বাইরে ছোট-বড় প্রায় ৫৬ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা দেশের মোট প্রতিষ্ঠানের সাড়ে ৭১ শতাংশ। এই হিসাবে এক দশকের ব্যবধানে গ্রামীণ এলাকায় ৩২ লাখ ৬৭ হাজার প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

২০০৩ সালের শুমারি অনুযায়ী, শহরে ৫১ দশমিক ৬৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলত, তখন গ্রামে চলত ৪৮ দশমিক ৩১ ভাগ প্রতিষ্ঠানে। ২০১৩ সালে গ্রামে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। শহরে এ সূচক কমে হয় ৪০ দশমিক ২২ শতাংশ। দেশের তৃতীয় ওই অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে ৩১ মের মধ্যে পরিচালিত হয়। সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন খানা এবং সব ধরনের স্থায়ী-অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানকে এই শুমারির অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রামমুখী হচ্ছে ব্যাংকের সেবা। সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোও গ্রামে শাখা খুলতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এক বছরে তফসিলি ব্যাংকগুলো ২৫৭টি শাখা খুলেছে। এর মধ্যে গ্রামে খোলা হয়েছে ১৩২টি। এ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের গ্রামীণ শাখা বেড়েছে ১১৬টি। এর বাইরে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও গ্রামের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ