ঢাকা, বুধবার 26 July 2017, ১১ শ্রাবণ ১৪২8, ১ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচারকের বিরুদ্ধে অসত্য বলার অভিযোগ

বরিশালের মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম মো. আলী হোসাইনের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে সঠিক তথ্য না জানানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর কারণ সৃষ্টি হয়েছে বরগুনার ইউএনও গাজী তারিক সলমানকে জামিন নামঞ্জুর করে হাজতে পাঠানোর বহুল আলোচিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, একজন চাকরিরত ইউএনওকে হাজতে পাঠানোর কারণসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার হাকিম আলী হোসাইনকে নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। ওই নোটিশের যে লিখিত জবাব হাকিম দিয়েছেন তার মধ্যে অসত্য তথ্য রয়েছে। যেমন জামিন নামঞ্জুর করার কথাটিই তিনি অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, ইউএনও তারিক সলমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তিনি নাকি তাকে আদালতের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পুলিশকেও তিনি নাকি ইউএনওর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছিলেন। পুলিশ নাকি সে আদেশ অনুযায়ী ইউএনওকে আদালতের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে নিয়ে গিয়ে তার বসার ব্যবস্থা করেছিল। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নাকি নিয়ে যাওয়ার সে দৃশ্যটিকেই এমনভাবে দেখানো হয়েছিল, যা দেখে মনে হয়েছে, পুলিশ তাকে হাজতে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ঘটনা সম্পর্কে জানিয়ে বরিশালের মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম মো. আলী হোসাইন লিখেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে ইউএনও সাহেবের জামিন একটিবারের জন্যও নামঞ্জুর করা হয়নি। ফলে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না।’
অন্যদিকে মুখ্য মহানগর হাকিমের দাবিটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ঘটনার দিন আদালতে দায়িত্ব পালনকারী কোর্ট পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর নৃপেন্দ্র কুমারসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, হাকিম সাহেব জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে হাজতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন বলেই পুলিশ ইউএনও তারিক সলমানকে হাজতে ঢুকিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, হাজতের সেদিনের রেজিস্টারের এক নম্বর সিরিয়ালেও হাজতি হিসেবে ইউএনও তারিক সলমানের নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে। কোর্ট পুলিশের একাধিক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, জামিন নামঞ্জুর করে হাজতে পাঠানোর আদেশ তারা নিজেদের কানেই শুনেছিলেন। সে অনুযায়ী ইউএনও তারিক সলমানকে তারা হাজতে ঢুকিয়েছিলেন কিন্তু হাতকড়া পরাননি। তাছাড়া সম্মান দেখিয়ে ইউএনও সাহেবকে তারা চেয়ারেও বসতে দিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী অন্য অনেকেও নিশ্চিত করেছেন, ইউএনও তারিক সলমানকে আসলেও হাজতে ঢোকানো হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, দেশের প্রায় সব টিভি চ্যানেলের খবরেই দেখা গেছে, হাকিম আলী হোসাইনের আদেশ পালন করতে গিয়ে দু’জন পুলিশ এমন শক্তভাবে ইউএনও সলমনের দুই হাত চেপে ধরে কোর্ট হাজতে নিয়ে গিয়েছিল, যেভাবে সাধারণত হাতকড়া পরিয়ে চোর-ডাকাত ও সন্ত্রাসী ধরনের অপরাধীদের নিয়ে যাওয়া হয়। ইউএনও সলমানকে সেদিন দীর্ঘ দু’ঘণ্টা কোর্ট হাজতে রেখেছিল পুলিশ। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে এবং হাকিম আলী হোসাইন নিজেও জানিয়েছেন, তার নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজাত জমা দেয়ায় ইউএনও সলমানকে দু’ঘণ্টা পর জামিন দেয়া হয়েছিল।
চাকরিরত একজন ইউএনওর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা এবং তাকে হাজতে পাঠানোর এই ঘটনা সারাদেশে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল বিশেষ করে জনপ্রশাসনের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা তথা আমলাদের মধ্যে। উল্লেখ্য, সবকিছুর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ। বরগুনার সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার গাজী তারিক সলমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানহানির মামলার  অভিযোগপত্রে তিনি বলেছিলেন, বরিশাল জেলার আগৈলঝারার ইউএনও থাকাকালে গাজী তারিক সলমান নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বিকৃত’ ছবি দিয়ে স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রণপত্র ছাপিয়েছিলেন। সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ‘জাতির পিতা’র ‘বিকৃত’ ছবি ছাপানোর কারণে ক্ষুব্ধ হয়েই ইউএনও তারিক সলমানের বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করেছিলেন ওবায়েদ উল্লাহ। অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের যে ‘বিকৃত’ ছবির অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়েদ উল্লাহ মানহানির মামলা দায়ের করেছিলেন সেটা ছিল পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্রীর আঁকা। গত ১৭ মার্চ শেখ মুজিবের জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় ছবিটির জন্য ওই শিশু প্রথম পুরষ্কার পেয়েছিল। ইউএনও সলমানের উদ্দেশ্য ছিল একদিকে সাংবিধানিক ‘জাতির পিতা’ সম্পর্কে শিশুদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা, অন্যদিকে নেতাকে সম্মান জানানো। এজন্যই তিনি স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রণপত্রে প্রথম পুরষ্কার পাওয়া ছবিটি ব্যবহার করেছিলেন। শিল্পবোদ্ধাসহ বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন, কোনো শিল্পকর্মেই বিষয় বা ব্যক্তির হুবহু ছবি বা চিত্র ফুটে ওঠে না। প্রসঙ্গক্রমে দেশে প্রচলিত বিভিন্ন মানের টাকার নোটগুলোতে ব্যবহৃত শেখ মুজিবের ছবির উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, এসবের কোনো একটিতেই নেতার হুবহু চেহারা পাওয়া যায় না।  বড় কথা, মরহুম নেতার যে ছবিটিকে ‘বিকৃত’ বলা হয়েছে সেটা দেখে একজন শিশু-কিশোরও বুঝবে, ওটা আসলে কার ছবি।
এজন্যই অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়েদ উল্লাহর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ‘অতি ভক্তি’ দেখানোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন নেতাদের সুনজরে পড়া। দ্বিতীয় একটি তথ্য হিসেবে এসেছে অভিযুক্ত ইউএনও তারিক সলমানের সততা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম। জানা গেছে, আগৈলঝারার ইউএনও থাকাকালে তিনি এমন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যেগুলোর কারণে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে একজন নেতার ছেলেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় নকল করার দায়ে বহিষ্কার করার তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অনেকে। সেই ঘটনার পর থেকে ইউএনও সলমানকে বদলি করার এবং তাকে বিপদে ফেলার ও অসম্মানিত করার নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়েছিল। মূলত সে কারণেই তারিক সলমানকে মামলাায় ফাঁসিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়েদ উল্লাহ। ওই মামলায় বরিশালের মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিমের আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েই গত ১৯ জুলাই হাজত খাটতে হয়েছে ইউএনও তারিক সলমানকে। ঘটনাপ্রবাহে হাকিম আলী হোসাইনের বিরুদ্ধে আইনসঙ্গত প্রশ্ন তুলে বলা হয়েছে, মামলাটি আমলে নিয়ে এবং চাকরিরত একজন ইউএনওকে হাজতে পাঠিয়ে তিনি গুরুতর অপরাধ করেছেন। উল্লেখ্য, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও ক্ষুব্ধ হওয়ায় একদিকে বাদী ওবায়েদ উল্লাহ মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে। এদিকে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা তো ক্ষুব্ধ হয়েছেনই, এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তারই অংশ হিসেবে তাকে শোকজ করা হয়েছিল, যার জবাবে তিনি সত্য গোপন করেছেন এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আমরা মনে করি, ইউএনও তারিক সলমানকে হাজত খাটানোর ঘটনাটিকে হাল্কাভাবে নেয়ার কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পরিণতি অশুভ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, একদিকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন হাকিম আলী হোসাইনসহ জড়িত সকলের শাস্তির দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পর্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছেন। সে কারণে কেবলই ‘সুষ্ঠু তদন্ত’ করে ‘উপযুক্ত’ ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিলে কিংবা দু’জন জেলা প্রশাসককে বদলির পাশাপাশি জনাকয়েক পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করলেই অসন্তোষ প্রশমিত হবে না। কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে বিশেষ করে বরিশালের মুখ্য মহানগর হাকিম আলী হোসাইনের বিরুদ্ধেÑ যার সম্পর্কে এরই মধ্যে দুর্নীতি ও অসততার অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ওবায়েদ উল্লাহকে সামনে রেখে বরিশাল আওয়ামী লীগের যে নেতারা মরহুম নেতা শেখ মুজিবের প্রতি ‘অতি ভক্তি’ দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও এমন ব্যবস্থা নেয়া দরকার, যাতে দেশের আর কোথাও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়। জনপ্রশাসনে যাতে অসন্তোষ ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারেও সরকারের উচিত সতর্ক হওয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ