ঢাকা, বুধবার 26 July 2017, ১১ শ্রাবণ ১৪২8, ১ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আবদুল আলীমের ইসলামি গান

-মাহমুদ ইফসুফ

মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়
সালাম করবো গিয়া নবীজীর রওজায়

সারা বাংলায় একসময় ইসলামি গান মানুষের মুখে মুখে ফিরত। যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলো গজল, হামদ, নাত, মারফতি, মুর্শিদী। ইসলামি সংগীত ছাড়া কোনো আসর বা সাহিত্য মজলিস জমতো না। সভা সমাবেশ বা ওয়াজ মাহফিল নাত-ই-রাসুল ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ থাকত। আব্বাসউদ্দিন আহমদ এবং আবদুল আলীমের কল্যাণেই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় তাওহিদের গান, কুরআনের গান এবং রাসুলের শানে নিবেদিত সুরলহরী।
সুরশিল্পীর জগতে আবদুল আলীমের উত্থান নাতে রাসুল পরিবেশনের মাধ্যমে। ইসলামি গান গেয়ে তিনি রাতারাতি তারকা বনে যান। তিনি গানের জগতে প্রবেশ করেন ১৯৪৩ সালে। আল্লাহর রসুল মুহাম্মাদ স.  কে স্মরণের মধ্য দিয়ে তাঁর সংগীত সাধনা শুরু। ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামি গান ছিলো তাঁর জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর রেকর্ডকৃত প্রথম গান দুটি হলো: ‘আফতাব ঐ বসলো পাটে আঁধার এলো  ছেয়ে, চল ফিরে চল মা হালিমা আছেরে পথ চেয়ে।’ এবং ‘ তোর মোস্তফাকে দেনা মাগো, সঙ্গে লয়ে যাই, মোদের সাথে মেষ চারণে ময়দানে ভয় নাই।’ গীতিকার ছিলেন মোহাম্মাদ সুলতান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নির্দেশে তাঁরই সুরে গান দুটির রেকর্ড করেন মেগাফোন কোম্পানির ট্রেনার ধীরেন দাস। সময়: ইসায়ি ১৯৪২ সাল, স্থান: কলকাতা।
তবে ঘরোয়া প্রোগ্রামে আগমন ঘটে আরও কিছুদিন পূর্বে। ১৯৪২ সালে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই মঞ্চে আবদুল আলীম গাইলেন, ‘সদা মন চাহে মদিনা যাবো।’ মঞ্চে বসে আবদুল আলীমের গান শুনে ফজলুল হক শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কিশোর আলীমকে জড়িয়ে নিলেন তাঁর বুকে। উৎসাহ দিলেন, দোয়া করলেন এবং তখনই বাজারে গিয়ে পাজামা, পাঞ্জাবি, জুতা, পুটি, মোজা সব কিনে দিলেন।
বেতারে আবদুল আলীমের অভিষেক ঘটে ১৯৪৮ সালে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের একমাস পূর্বে তিনি কলকাতা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। ডিসেম্বর মাসে এলেন ঢাকায়। পরের বছর ঢাকা বেতারে অডিশন দিয়ে কৃতকার্য হন। ১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট তারিখে তিনি মমতাজ আলী খানের রচনা ও সুরে বেতারে প্রথম গাইলেন, ‘ও মুর্শিদ, পথ দেখাইয়া দাও- আমি ঐ পথ চিনি না তো সঙ্গে কইরা নাও।’ অতএব দেখা যায়, মঞ্চ, রেকর্ড, বেতার এ তিন মাধ্যমেই তাঁর শুভযাত্রা ধর্মীয় গানের মাধ্যমে।
আবদুল আলীম আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া ‘এই সুন্দর ফুল,’ ‘বেলা দ্বিপ্রহর-আল্লা মেঘ দে’ প্রভৃতি ইসলামি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। আল্লা মেঘ দে পানি দে, ছায়া দেরে তুই’- আবদুল আলীমের কণ্ঠে এ গান যখন ধ্বনিত হয়েছিল বর্তমান মিয়ানমারে, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। আব্বাসউদ্দিনের কণ্ঠেও গানটি বৃষ্টির কারণ হয়েছিল। (সৈকত আসগর: আবদুল আলীম, পৃ ৩৯) আল্লাহর শানে গান গাওয়ার মাহাত্ম্য এখানেই।
তাঁর ইসলামি সংগীত নিদর্শন: সদা মন চাহে মদিনা যাবো, আফতাব ঐ বসলো পাটে আঁধার এলো ছেয়ে, তোর মোস্তফাকে দে না মাগো, এই সুন্দর ফল সুন্দর ফুল মিঠা নদীর পানি, নবী মোর পরশমনি নবী মোর সোনার খনি, আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই, দীনের দরদী রে আমার নৌকা বাইয়া দেয়, পথের দিশা দাও গো মুর্শিদ পথের দিশা দাও, মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায় সালাম করবো গিয়া নবীজীর রওজায়, পূবাল হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া, এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফুল মিঠা নদীর পানি আল্লাহ তোমার মেহেরবানী, পরের জায়গা পরের জমিন, দুয়ারে আইসাছে পালকী নাইয়রি যাও তুলো রে তুলো মুখে আল্লাহ রসুল সবে বল ও মুখে আল্লাহ রসুল সবে বল ইত্যাদি।
আবদুল আলীম মূলত: ভাটিয়ালী সম্রাট হলেও ইসলামি গানও ছিলো তাঁর প্রধান আরাধ্য। মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশনসহ সব অনুষ্ঠানেই তিনি ইসলামি গান গেয়ে দর্শক শ্রোতাদের আনন্দ দিতেন। হাল আমলে সংস্কৃতি, বিনোদন বা গান যেন অশ্লীলতা বা সেক্স নির্ভর। অতীতে এরূপ ছিলো না। আবদুল আলীম ৩০ বছরের সংগীত জীবনে কখনও শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করেননি। তাঁর গান সকল শ্রেণির শ্রোতাদের উপযোগী। ঘরে বাইরে, মঞ্চে মিডিয়ায় সব জায়গাতেই তা পরিবেশনযোগ্য। এসব গানে নেই বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা, যৌনতা, অসামাজিকতা, রুচিহীনতা। আবদুল আলীমের আদর্শ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং চিন্তাচেতনার স্ফূরণ ঘটে তাঁর কণ্ঠে। তিনি গীতিকার বা সুরকার ছিলেন না। কণ্ঠশিল্পীই তাঁর প্রধান পরিচয়। তাঁর কন্ঠে মধু ঝড়েছে দীর্ঘ তিন দশক। তিনি গত হয়েছেন বহু আগে। ৪৩ বছর পূর্বে। কিন্তু তিনি মানব হৃদয়ে, মন মননে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
হদিসঃ
১। সৈকত আসগর: আবদুল আলীম ১৯৩১-১৯৭৪, বাংলা একাডেমি ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৯৭
২। আব্বাসউদ্দিন আহমদ: আমার শিল্পী জীবনের কথা, হাসি প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ৩৪ নর্থব্রুক হল রোড, ঢাকা-১১০০, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০০২
৩। সংস্কৃতি ডট কম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট
৪। উইকিপিডিয়া; ১৭ জুলাই ২০১৭

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ