ঢাকা, বুধবার 26 July 2017, ১১ শ্রাবণ ১৪২8, ১ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সোনারগাঁয় ঘুরতে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ : নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের একটি ছোট গ্রামের নাম ‘শাহ্চিল্লাপুর’। সবুজ শ্যামলীমার মাঝে গড়ে ওঠা এ গ্রামটি বাংলার নামকরা কোন পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত না হলেও ইতিহাস-ঐতিহ্য পিপাসু লোকদের কাছে ‘শাহ্চিল্লাপুর’ অতি পরিচিত একটি নাম। ঐতিহাসিকভাবে এই ছোট গ্রামটির গুরুত্বেরও কমতি নেই। আর এর প্রধান কারণ বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান  গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্। এখানেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ্। প্রথম ইলিয়াছ শাহী বংশের এ সুলতানের সমাধিটি অপরুপ কারুকার্য খচিত। সমাধিটি কালো কষ্টিপাথরে নির্মিত হওয়ায় বর্তমানে সমাধিটি ‘কালা দরগাহ্’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত।
ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলার প্রথম ইলিয়াছ শাহী বংশে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্ ৩য় সুলতান হিসেবে বাংলার রাজসিংহাসন লাভ করেন। তিনি তার রাজ্য পরিসীমা বিস্তৃতির চেয়ে সুদৃঢ় করার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বআরোপ করেন। জাতিকে সচেতন ও সমৃদ্ধশালী করার লক্ষ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রেখেগেছেন গৌরবোজ্জল অবদান। সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ্ ছিলেন আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। সুলতান বিদ্বান লোকদের সান্নিধ্যে থাকতেন ও তাদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করতেন। তৎকালীন সমসাময়িক চৈনিক সম্রাট ইয়ং লি’র সাথে তার গভীর সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। তিনি চীন, মক্কা ও মদিনায় বিশেষ দূত প্রেরণ করেন। আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করার মাধ্যমে তিনি মক্কা ও মদিনায় ‘গিয়াসিয়া মাদ্রাসা’ নামক দু’টি মাদ্রাসা নিমানে বিশেষ অবদান রাখেন।
প্রকৃতি ও সাহিত্যপ্রমী এ সুলতান আরবি ও ফারসি ভাষায় বহু কবিতা লিখেছেন। সুলতানের সঙ্গে পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে পত্রালাপ ছিল। সুলতান বিখ্যাত কবি হাফিজকে বাংলায় নিমন্ত্রণ করেন। সুলতানের এই নিমন্ত্রণের জবাবে কবি হাফিজ সুলতানকে একটি গজল লিখে পাঠিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান ছিল সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ-এর।
সুলতানের পিতা-সুলতান সিকান্দার শাহ্ ও পিতামহ-সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াছ শাহী’র মতোই আলেম ও সুফিদের গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ্। প্রথম বাঙালী মুসলমান কবি  শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউছুফ-জুলেখা’ কাব্য রচনা করেন তাঁর শাসনামলেই। এছারাও সুলতানের সমসাময়িক কবিদের মধ্যে শেখ আলাউল হক ও নূর কুতুব আলম খুব বিখ্যাত ছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ পবিত্র মক্কা ও মদিনার তীর্থযাত্রীদের সহায়তা করতেন। বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্ ১৪১১ খ্রিষ্টাব্দে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মৃত্যু বরণ করলে শাহচিল্লাপুর গ্রামে তাকে সমাহিত করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগায়ের শাহচিল্লাপুর গ্রামে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহর  সমাধির পাশে গিয়ে দেখা যায় প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি এ পুরাকীর্তির কোনো রকম ধ্বংস, বিকৃতি, পরিবর্তন বা ক্ষতি করলে পুরাকীর্তি আইন ১৯৭৬-এর ১৯ ধারা অনুযায়ী এক বছর পর্যন্ত জেল বা জড়িমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রকৌশলী জাকির হোসেনের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, ১৯২০ সালের ২২ নভেম্বর গিয়াসউদ্দিনের সমাধিকে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের পূরাকীর্তির তালিকায় অর্šÍভুক্ত করে তৎকালীন সরকার। সমাধিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত। এটি ১০ ফুট লম্বা, ৫ ফুট চওড়া ও ৩ ফুট উঁচু। সমাধির ৩ ফুট উচ্চতার খিলানের ওপর আরও দেড় ফুট উচ্চতায় ৭ ফুট লম্বা অর্ধাবৃত্তাকার কষ্টি পাথরে ঢাকা। মূল সমাধির কার্নিশে রয়েছে সুক্ষ্ম কারুকাজ খচিত অলংকার। দুই পাশে রয়েছে তিনটি করে তিন খাঁজবিশিষ্ট খিলান। খাঁজের মধ্যে রয়েছে প্রলম্বিত শিকল ও ঝুলন্ত ঘন্টার নকশা।

বরগুনা জেলার বামনা উপজেলা থেকে সমাধি পরিদর্শনে আসা ‘হলতা ডৌয়াতলা ওয়াজেদ আলী খান ডিগ্রী কলেজের’ একাদ্বশ শ্রেণীর ব্যবসায়ী শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী মুনমুন আক্তার  জানান, বাংলার ইতিহাস ও শাসকদের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মকে পরিচয় করাতে সুলতানের সমাধী এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। যা বাংলার অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলছে। আর এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার আগ্রহ থেকেই সোনারগাঁয়ে আমাদের ঘুরতে আসা। এবিষয়ে জানতে চাইলে ইতিহাসবিদ সামসুদৌহা চৌধুরী বলেন, সুলতান গিয়াসউদ্দিনের  সমাধি বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। এর সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও যত্নবান হওয়া উচিত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনাব শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ৬০০ বছরের ঐতিহাসিক এবং কষ্টি পাথরে নির্মিত সমাধির উন্নয়ন ও রক্ষনাবেক্ষণে কাজ করছি’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ