ঢাকা, বুধবার 26 July 2017, ১১ শ্রাবণ ১৪২8, ১ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘সীমাহীন সীমানায়’ খোরশেদুল আনোয়ারের প্রতিভা ও প্রকাশনার নবমাত্রিক প্রকরণ

জিয়া হাবীব আহসান : পেশায় বিজ্ঞানের শিক্ষক, নৌবাহিনী  কলেজ চট্টগ্রামের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক কিন্তু ছাত্রজীবন (চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে যাঁকে কবি, গীতিকার ও কলামিস্ট হিসেবেই আমার চেনা জানা তিনি হলেন আমার প্রিয় বন্ধু খোরশেদুল আনোয়ার। খোরশেদুল আনোয়ার বিগত শতাব্দির নব্বই দশকের শুরু থেকেই বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে ওসব জাতীয় প্রচার মাধ্যম ও ক্যাসেট-ভিসিডি শিল্পের জন্য লিখেছেন এবং লিখে যাচ্ছেন অসংখ্য গান। প্রতিভাবান এ গীতিকবি রচিত শত শত গান আজ দেশবরণ্যে  সব শিল্পীদের কণ্ঠে সহস্র শ্রোতার মন মাতিয়ে রেখেছে। কিন্তু সে সৃষ্টিশীল মানুষটি রয়ে গেছেন একেবারে অন্তরালে। তিনি আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংগীতের জন্য এ পর্যন্ত যেটুকু করেছেন তাতেও যেনো আমরা কিছুটা হলেও তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকলাম। সম্প্রতি তাঁর ‘সীমাহীন সীমানায়’ শিরোনামের গানের বইটি উপহার পেয়ে এই লেখক ও তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে কিছু একটা লেখার তীব্র তাড়না অনুভব করতে থাকি। লেখকের ডজনখানেক গ্রন্থের মধ্যে- হারিয়ে যাওয়ার  শৈশব (কিশোর কবিতা), ছন্দে ছড়ায় বর্ণশেখা (শিশু পাঠ্য), ছিলেন তিনি ফরেন (রম্য কবিতা); অনামিকার বৈরি আগুন (অনুকবিতা); এতোদিন পরে হলো এভাবে দেখা (গীতিকাব্য); স্বভাব (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কবিতা); মুখোমুখি (বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকার); স্মরণীয় বরণীয় (বিখ্যাতজনদের নিয়ে লেখা); নির্বাচিত কলাম প্রভৃতি গ্রন্থগুলো পড়ে বার বার বিবেক তাড়িত হয়েছি কিছু একটা লেখার, কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠেনি।
বেতার, টেলিভিশন, ক্যাসেট, সিডি, ভিসিডির সুস্থ ধারার সংগীতের যারা দর্শক-শ্রোতা তাদের নগন্য একজন হিসেবে বেশ অবাক হলাম যখন খোরশেদুল আনোয়ারের সীমাহীন সীমানায় গ্রন্থটি হাতে পেলাম এবং পড়ে জানলাম আমাদের বহুলশ্রুত ও জনপ্রিয় অনেক গানের ¯্রষ্টা এই গীতিকবি। যেমন শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের গাওয়া-কেয়রে বুঝাইত ন-পাইল্যাম কালা হনর জ্বালা, শেফালী ঘোষের কন্ঠে-মনটা নিয়ে তলে তলে, আব্দুল মান্নান রানার কন্ঠে-বেদনার বালুচরে, সৈয়দ আব্দুল হাদীর কন্ঠে- রঙ্গিন তোমার জীবন মেলায়, সুবীর নন্দীর কণ্ঠে-বলছে বলুক ওরা, শাকিলা জাফরের কণ্ঠে-চলে গেছো সেই ভালো, ফাহমিদা নবীর কন্ঠে-দাঁড়ালে সম্মুখে এসে, কাজী আয়েশা আমানের কণ্ঠে- বাইরে বৃষ্টি ধারা, সাইফুদ্দিন মাহমুদ খানের কণ্ঠে- চলতে পথে প্রজাপতির, প্রবাল চৌধুরীর কণ্ঠে- মনে করো তুমি আজ, এ কী হতে গিয়ে কি যে হয়ে গেলো কিংবা এতোদিন পরে হলো এভাবে দেখা, সৈকত দাসের কন্ঠে- শুধু বরষায় কাটে না যদি, রথীন্দ্রনাথ রায়ের কন্ঠে- মন তুই গরব করিস না, গাজী মওদুদের কন্ঠে- তোমার আকাশে উঠেছে চাঁদ এমন আরো বহুবিখ্যাত এবং শ্রোতাপ্রিয় গানগুলোর গীতিকার হলেন খোরশেদুল আনোয়ার। শুধু তাই নয় তাঁর লেখা গান আরো গেয়েছেন দেশবরেণ্য কন্ঠশিল্পী বশির আহমেদ, মোঃ আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, মোঃ খুরশিদ আলম,সামিনা চৌধুরী, ওমা খান, মনির খান,লায়লা আর্জুমান্দ, সিরাজুল ইসলাম আজাদ প্রমুখেরা। তাঁর লেখা গানে সুর সংযোজনা করেছেন এদেশের কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা আনোয়ার পারভেজ, আলী হোসেন, গোলাম হোসেন লাডু ,শেখ সাদি খান, এএইচএম রফিক, লাকি আখন্দ, মোস্তাক আহমদ,একে মেসবাহ উদ্দিন আহমদ। আরো সুর করেছেন- বশির আহমেদ, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, রথীন্দ্রনাথ রায়, প্রবাল চৌধুরী, জালাল আহমেদ, আবু তাহের, এমএম নজুরুল ইসলাম, এসএম ফরিদ, মোঃ চান মিয়া, সৈয়দ নুরুল ইসলাম মুফতি, সুরবন্ধু অশোক চৌধুরী, বাণী কুমার চৌধুরী, মোখলেসুর রহমান, মোঃ মোস্তফা কামাল, মিয়া মোহাম্মদ বদরুদ্দিন প্রমুখেরা।
‘সীমাহীন সীমানায়’ গ্রন্থেও প্রথম দিকটা সাজানো আছে  ১০১টি স¦রচিত গানে। বইটির দ্বিতীয় পর্বে আছে লেখকের কাছে লেখা গুণীজনদের কিছু মূল্যবান চিঠি। এগুলো সমসাময়িক কাল ও বিচিত্র বিষয়ের দলিল। তৃতীয় পর্বে কিছু দুর্লভ ছবিতে অ্যালবাম সাজিয়েছেন যা গ্রন্থটিকে দান করেছে ভিন্ন মাত্রিক আমেজ। বইটি যতই পুরোনো হবে এর মেধামুল্য ততই বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে। প্রমিত বাংলা ও আঞ্চলিক উভয় ভাষায় রচিত গানগুলোতে বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পেয়েছে স্বদেশ ও মানবপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা, সমাজসাম্য সহ যাপিত জীবনের প্রায় সকল অনুষঙ্গ। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ঐতিহাসিক মাইজভান্ডার গ্রামে জন্ম গ্রহণকারি এই প্রতিভাটির লেখনিতে আধ্যাত্মিকতার ছাপ থাকবে এটাই যেনো স্বাভাবিক।       
সদ্য প্রকাশিত ‘সীমাহীন সীমানায়’ গ্রন্থটিতে শুভ কামনা পর্বে দেশ-বরেণ্য শিক্ষাবিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য পরম শ্রদ্ধেয় প্রফেসর মোহাম্মদ আলী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “কবি খোরশেদুল আনোয়ারের মধ্যে যে প্রতিভা ও প্রতিশ্রুতি দেখেছি তার আরো স্ফুরণ হোক, তিনি বাংলাদেশের একজন সফল গীতিকবি”।
বইটির বিনিময় মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০/- টাকা। আই আই প্রকাশন, চট্টগ্রাম থেকে সীমাহীন সীমানায় । প্রচ্ছদ এঁকেছেন ডিজাইনার রাজীব, বর্ণবিন্যাস ও মুদ্রণে এস.এন কালার প্রিন্টার্স, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম। পুস্তকটির প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে লেখক খোরশেদুল আনোয়ার বলেন, অনেকে ভাবতে পারেন গানের আবার বই কী। অথচ সবাই জানি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে নোবেল জিতেছিলেন তাঁর গানের গ্রন্থ গীতাঞ্জলির জন্য।  বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে পরম শ্রদ্ধেয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমান, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মাসুদ করিম, কে.জি মোস্তফা, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, আবু জাফর, এসএম হেদায়াত, ফজল এ খোদা, শহীদুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান মনির, নজরুল ইসলাম বাবু, শাফাত খৈয়াম, নুরুজ্জামান শেখ, এম এন আখতার ও আবদুল গফুর হালি প্রমুখ কিংবদন্তি গীতিকবিদের উদ্দেশ্যে। লেখক খোরশেদুল আনোয়ার বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত সিনিয়র গীতিকার, নাট্যকার,কথক ও গ্রন্থনাকারি। বাংলা একাডেমি, ঢাকা এবং বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদ কেন্দ্রিয় পরিষদের জীবন সদস্য, বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদ চট্টগ্রামের বিভাগীয় শাখার উপদেষ্টা। এ প্রতিভা রাজধানী কেন্দ্রিক কর্মজীবন বেছে না নেওয়ায় তাঁর প্রকৃত মর্যাদা ও প্রাপ্য সম্মান থেকে বহুদুরে এবং আড়ালে পড়ে আছেন। দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির মত প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিৎ এসব প্রতিভাদের খুঁজে বের করে যথাযথ মূল্যায়ন করা। নিমগ্ন এক সৃজনশিল্পী খোরশেদুল আনোয়ার। সৃষ্টিশীলতার অনেকগুলো শাখায় তাঁর সাবলীল বিচরণ। ছড়াকার হিসেবে প্রথম জীবনে আত্মপ্রকাশ করে গল্প কবিতার গিরিপথ ধরে গীতিকাব্যের ভুবনে তিনি এখন দেদীপ্যমান।
রসায়ন বিজ্ঞানের কৃতীছাত্র, সতীর্থ বন্ধুবর খোরশেদুল আনোয়ার পেশাগত ভাবে অধ্যাপক হলেও লেখার নেশা ও পেশার বৈপরীত্য তাঁকে থামাতে পারেনি। ব্যস্ত নাগরিকতার  মধ্যেও শব্দশিল্পের সাথেই তাঁর নিরন্তর বসবাস। তাঁর এই পথচলা সুদীর্ঘ হোক, আমাদের শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ও সংগীতাঙ্গনে খোরশেদুল আনোয়ারের নাম আরো উদ্ভাসিত ও আলোকিত হয়ে উঠবে এ কামনা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ