ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 July 2017, ১২ শ্রাবণ ১৪২8, ২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজধানী ঢাকার জন্য ‘ব্যর্থ মহানগরী’র পরিণতি?

আষাঢ়ের পর এবার শ্রাবণেও শুরু হয়েছে টানা বর্ষণ। দিনের পর দিন ধরে প্রায় বিরামহীন বৃষ্টির কারণে শুধু নয়, বন্যার পানিতেও তলিয়ে গেছে সারাদেশ। এমন কোনো জেলার কথা বলা যাবে না, যে জেলার গ্রামাঞ্চল পানির নিচে চলে না গেছে। প্রতিটি জেলা শহরকেও এরই মধ্যে বৃষ্টি ও বন্যার পানি কম-বেশি ডুবিয়ে ফেলেছে। রাজধানী ঢাকা তো অচল ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেই, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ অন্য সব শহর ও মহানগরীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভয়ানকভাবে। কোথাও কোথাও মানুষকে গলা সমান পানি ভেঙে এবং জীবন বিপন্ন করে চলাচল করতে হচ্ছে। বেশির ভাগ শহরের পানিই সহজে সরে যেতে পারছে না। চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে পানি সরে যেতে সময় লাগছে সাত-আট ঘণ্টা। কিন্তু সম্পূর্ণ পানি সরে যাওয়ার আগেই নতুন করে নামছে বৃষ্টির ঢল। ফলে আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে মানুষের জীবন। একই অবস্থা চলছে দেশের অন্য সব এলাকাতেও। গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, যমুনা সেতুর পশ্চিম প্রান্তে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার প্রবেশমুখ হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল সম্প্রতি প্রচ- যানজটে স্থবির হয়ে পড়েছে। সেখানে হাজার হাজার যানবাহন আটকে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-চট্টগ্রামসহ অন্য প্রতিটি মহাসড়কের অবস্থাও একই রকম। কোনো মহাসড়ক দিয়েই নির্বিঘেœ চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। খানা-খন্দকে ভরা মহাসড়কগুলোর যেখানে-সেখানে যখন-তখন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি যেমন ঘটছে তেমনি তৈরি হচ্ছে যানজটের।
যে কোনো দৈনিকের সচিত্র খবরে শুধু নয়, বেসরকারি টেলিভিশন ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আজকাল বন্যা ও বৃষ্টির দুর্ভোগ সম্পর্কেই বেশি খবর জানানো হচ্ছে। একযোগে প্রাধান্যে থাকছে সমস্যার কারণ সম্পর্কিত আলোচনাও। প্রসঙ্গক্রমে স্বাভাবিক কারণেই রাজধানী ঢাকাকে এক নম্বরে রাখা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, দুই সিটি করপোরেশন এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীন খোঁড়াখুড়ি ও নির্মাণ কাজের কারণে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অলি-গলি ও মহল্লা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় প্রচ- পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও বা কোমর পর্যন্ত পানি জমেছে। এই পানিও আবার স্বচ্ছ বা নিরাপদ নয় বরং কালো, নোংরা এবং দুর্গন্ধযুক্ত। পানিতে রয়েছে নানা রোগ জীবাণু। ওদিকে কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে ডুবে যাওয়া রাজধানীর কোনো এলাকার সড়ক দিয়েই কোনো ধরনের যানবাহন নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারছে না। অনেক এলাকায় কোনো যানবাহন ঢুকতে পর্যন্ত পারছে না। সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং ভয়হীন হিসেবে পরিচিত রিকশাচালকেরাও এরই মধ্যে ব্যর্থ ও পরাস্থ হয়েছে। এমন অনেক দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে, যেখানে রিকশাচালকের গলা পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে।
রিকশাচালকদেরই যখন এই অবস্থা তখন গণপরিবহনসহ অন্য সব যানবাহনের কথা সহজেই কল্পনা করা যায়। বাস্তবেও প্রচ- পানিবদ্ধতার শিকার হয়েছে প্রতিটি এলাকা। কোনো কোনো এলাকার সড়কে দুই থেকে তিন-চার ফুট পর্যন্ত পানি জমে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। ফলে  কোনো এলাকার সড়ক দিয়েই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। মোটর সাইকেল থেকে শুরু করে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার তো বটেই, যাত্রীবাহী বাসও অচল হয়ে পড়েছে যেখানে-সেখানে। বাসের ড্রাইভার-কন্ডাক্টররা রসিকতা করে শক্তভাবে সিটের হ্যান্ডেল ও ছাদের রড ধরে থাকার উপদেশ দিচ্ছে যাত্রীদের। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকের পাশাপাশি কোনো কোনো দৈনিকেও রাজধানীর সড়কগুলোকে গাড়ির গ্যারেজের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। কারণ, বেশিরভাগ সড়কেই শত শত গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। এর ওপর রয়েছে যানবাহনের তীব্র সংকট। মানুষকে গাড়ির জন্য কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। মুষলধারার বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে তারা। সাধারণ ছাতায় কোনো কাজই হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নোংরা ও বিষাক্ত পানি। গাড়িতে ওঠার এবং গাড়ি থেকে নামার সময় কুস্তি তো করতে হচ্ছেই, একই সঙ্গে নোংরা ও বিষাক্ত পানিতেও শরীর নোংরা হয়ে যাচ্ছে মানুষের। এই একটি বিষয়ে স্কুলগামী শিশু-কিশোর থেকে অফিসগামী চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী পর্যন্ত প্রত্যেকেই সমান তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছেন। পড়ছে মহা বিপদেও। আধ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লেগে যাচ্ছে এমনকি চার-পাঁচ ঘণ্টা। গুরুতর অসুস্থদেরও হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সড়কে অ্যাম্বুলেসও চলাচল করতে পারছে না। এভাবে সব মিলিয়েই বিগত মাত্র কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে ও পানিজটে রাজধানী ঢাকা মহানগরী আসলে অচল হয়ে পড়েছে। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মেট্রোরেল প্রকল্প, ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, তিতাস ও বিটিসিএলসহ কয়েকটি সংস্থা বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুড়ি ও নিত্য নতুন সড়ক ও ড্রেন ধরনের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এক সংস্থা কোনো এলাকায় কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পরপর অন্য কোনো সংস্থা আবার একই এলাকায় তাদের মতো করে খোঁড়াখুড়ি ও নির্মাণ কাজ শুরু করে দেয়। ফলে ওই এলাকায় সড়কের অবস্থা যেমন স্বাভাবিক হতে পারে না তেমনি অল্প বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে একাধিক ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেল প্রকল্প এসেছে প্রধান উদাহরণ হিসেবে। এগুলোর পাশাপাশি রাজধানীর প্রায় সব এলাকারই কোথাও চলছে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ, টেলিফোন, গ্যাস ও অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল প্রতিস্থাপনের কাজ, কোথাও আবার চলছে ওয়াসার পানি সরবরাহের সংযোগ পাইপ বসানোর কাজ। সবই চলছে কয়েক বছর ধরে। ফলে মানুষের ভোগান্তিরও অবসান ঘটছে না।  প্রশ্ন উঠেছে অপরিকল্পিত নগরায়নের পরিপ্রেক্ষিতেও। কারণ, নগরায়নের নামে শত শত পুকুর ও খাল ভরাট করা হয়েছে। এসব স্থানে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন ও স্থাপনা। ভবনগুলোর আশপাশে মাটির নিচে প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা রাখা বা প্রশস্ত ড্রেন তৈরি করা হয়নি। এছাড়া পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনা জমে গিয়ে ড্রেনগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, রাজধানীর কোনো এলাকাতেই চারপাশের নদ-নদীতে পানি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা বা ব্যবস্থা নেই।
আমরা মনে করি, বিশেষ করে পানিজট ও মানুষের দুর্ভোগের বিষয়কে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার এই দেশে মাত্র কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই পুরো রাজধানী তলিয়ে যাবে, অচল হয়ে পড়বে এবং মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির শেষ থাকবে না- এমন অবস্থা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। একই কারণে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা একথা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছেন যে, রাজধানী হিসেবে ঢাকা একটি ‘ব্যর্থ মহানগরীর’ অশুভ পরিণতি বরণ করতে চলেছে। এমন আশংকা নিঃসন্দেহে ভীতিকর। আমরা মনে করি, ঢাকাকে যাতে ‘ব্যর্থ মহানগরীর’ পরিণতি বরণ করতে না হয় সে লক্ষ্যেই সরকারের উচিত তৎপর হয়ে ওঠা। এজন্য খাল ও পুকুর দখল করে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ প্রতিহত করার পাশাপাশি বাধাহীন পানি প্রবাহের জন্য রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় যথেষ্ট প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ করতে হবে এবং কোনো ড্রেনেই আবর্জনা জমতে দেয়া যাবে না। দুই সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসা, তিতাস, বিটিসিএলসহ রাস্তা বিভিন্ন নির্মাণ ও খোঁড়াখুড়িতে নিয়োজিত সকল সংস্থার কাজে অবশ্যই সমন্বয় করতে হবে। সব মিলিয়ে আমরা চাই, রাজধানী ঢাকা যাতে আর কখনো এবারের মতো বিপর্যস্ত হয়ে না পড়ে এবং ঐতিহাসিক এই মহনগরীকে যাতে ‘ব্যর্থ মহানগরীর’ অশুভ ও ভয়ংকর পরিণতি বরণ করতে না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ