ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 July 2017, ১২ শ্রাবণ ১৪২8, ২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একটি ভাষণ ও চিঠির কথা

২৫ জুলাই থেকে প্রণব মুখার্জি আর সরকারি ফাইলে সই করবেন না। অথচ বিগত ৪৪ বছর ধরে এই কাজ তাঁকে করতে হয়েছে। ২৫ জুলাই থেকে শুরু হলো তার অবসর জীবন। ভারতের চতুর্দশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর রামনাথ কোবিন্দ প্রথা অনুযায়ী বিদায় জানাবেন ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে। প্রয়াত স্ত্রী শুভ্রার একটি ছবি নিয়ে রাইসিনা হিলস থেকে ১০ রাজাজি মার্গের সরকারি নিবাসে গিয়ে উঠবেন প্রণব মুখার্জি। শুরু হবে তার নতুন জীবন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন যা কিছু উপহার পেয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী সবকিছুই ছেড়ে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি ভবনে। নিয়ে যাচ্ছেন শুধু উপহার পাওয়া বইগুলো। একমাস ধরে রাজাজি মার্গের দোতলা বাড়ির একতলায় দু’টি ঘরের ভেতরকার দেয়াল ভেঙ্গে তৈরি করা হয়েছে তার পাঠাগার। হয়তো বইয়ের ভুবনেই ডুবে থাকবেন বাকি জীবন। হয়তো রচনা করবেন গ্রন্থও। এমন বাতাবরণে তার বিদায়ী বক্তৃতার একটি কথা কানে বাজছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বহুত্ববাদিতা ও সহনশীলতাই ভারতের অন্তরাত্মা। বক্তব্যটি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। প্রসঙ্গত একটি চিঠির কথাও আজ মনে পড়ছে।
দিল্লীর ঐতিহাসিক জামে মসজিদের শাহী ইমাম মাওলানা সাইয়েদ আহমেদ বুখারী কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে ইমাম কাশ্মীর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর পরিস্থিতি দিনের পর দিন খারাপ হতে চলেছে। এ জন্য ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। কাশ্মীরের শান্তি পরিবেশ সৃষ্টি করতে দেরি হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। সুতরাং ওই ইস্যুর সমাধানের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাশ্মীরকে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসাধ্য প্রয়াস চালানো উচিত। এছাড়া সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোসহ পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি আলোচনারও আহ্বান জানিয়েছেন ইমাম বুখারী। তিনি বলেন, পৃথিবীতে ভূস্বর্গ নামে পরিচিত কাশ্মীর শান্তি ও আনন্দময় জীবন যাপনের জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু আজ তা কান্নার উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ইমাম বুখারী। আসন্ন ঈদুল আযহায় মুসলমানদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, আসন্ন ঈদুল আযহার সময় মহিষ অথবা ছাগল পরিবহনকারী লোকদের উপর যাতে কোন জুলুম না হয় তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। পশু রক্ষার নামে যদি তাদের মারধর করা হয় তাহলে দেশে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ঈদুল আযহার সময় পশু কুরবানি দেয়া ইসলাম ধর্মের ঐতিহ্য হওয়ায় এতে কোনভাবেই বাধা আসা উচিত নয়।
দিল্লীর ঐতিহাসিক জামে মসজিদের ইমাম যেসব বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। বিষয়গুলো শুধু ভারতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমাদের এই অঞ্চলের শান্তি ও প্রগতির জন্যও বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আর ইমাম বুখারী এমন এক সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখলেন যখন দেশটির বিভিন্ন অংশে গরুর গোশতকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এমনকি ইতোমধ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণে বেশকিছু মুসলিম নাগরিক নিহতও হয়েছেন। আমরা তো জানি যে, ভারতের নেতৃবৃন্দ ভারতকে একটি ধর্মনিপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করে থাকে। ভারতের সংবিধানেও তেমন কথা লেখা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মুসলমানদের ধর্মীয় ঐতিহ্য গরু জবাইতে বাধা দেয়া হবে কেন? বিষয়টি কি অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক নয়? ভারতে সহনশীলতার অভাব এত প্রকট হয়ে উঠলো কেন?
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারতের উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে আমরা জানি। এরপরও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আচরণে সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের হাতে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা ও অপহরণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি সাপাহার সীমান্তেই ৫ জন বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। বিএসএফ-এর হাতে আটক গরু ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলামকে ফেরত পাঠাতে চিঠি দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উল্লেখ্য যে, গত ২০ জুন সকালে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোসালপুর সীমান্তে বিএসএফ গুলী করে স্কুলছাত্রসহ দুই বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। এছাড়া জলাশয়ে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতীয় নাগরিকদের বিরোধের জের ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার জামিনপুর সীমান্তে গত ২৫ মার্চ দুপুরে তাণ্ডব চালায় বিএসএফ। বাংলাদেশ ভূখ-ের প্রায় ১০০ গজ ভিতরে ঢুকে বিএসএফ-এর সাউন্ড গ্রেনেড হামলায় নারী ও শিশুসহ ১২ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশী নাগরিকদের মনে আতঙ্ক ও ভীতি বিরাজ করছে।
বর্তমান সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হলেও সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের মাত্রা মোটেও হ্রাস পায়নি। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বিএসএফ’র চলমান নৃশংসতায় পর্যবেক্ষকরা বিস্মিত। ভারতের সাথে পাকিস্তান, চীন, নেপাল ও ভূটানের সীমান্ত রয়েছে। কোথাও বিএসএফ-এর এমন আচরণ লক্ষ্য করা যায় না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেই বিএসএফ সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করছে। বিএসএফ-এর নৃশংসতা ও হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের সীমান্ত প্রহরী বাহিনী প্রধানের বক্তব্যে বিস্মিত হতে হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা সীমান্ত পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিজিবি’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, বিএসএফ নিজেদের আত্মরক্ষার্থেই সীমান্তে গুলী চালায়। সীমান্ত চোরাচালানকারীরা খুব দুর্ধর্ষ মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সীমান্ত হত্যা এখন অনেক কম। সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় আনতে বিজিবি-বিএসএফ যৌথভাবে কাজ করছে বলেও তিনি জানান। এমন বক্তব্যে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুসারে কোন দেশ অন্য দেশের নাগরিককে হত্যা করতে পারে না। কেউ যদি অন্যায় করে তবে তাকে গ্রেফতার করে দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এসবের কিছুই মানছে না বিএসএফ। তাদের গুলীতে অহরহ নিহত হচ্ছে বাংলাদেশী নাগরিকরা। যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয় না। সীমানায় স্থাপনা নির্মাণের আইনও মানছে না ভারত। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোন স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। কিন্তু ভারত ৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছে বলে দৈনিক সংগ্রামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সীমান্তে ভারতের এইসব কর্মকা-কে বন্ধুসুলভ বলে বিবেচনা করা যায় না। এমন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবাদসহ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বন্ধুত্ব বিনষ্ট হওয়ার কথা নয়। পৃথিবীর সব স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার অধিকার রয়েছে। সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নিজ দেশের সরকারের সমালোচনা তো আমরা করেই থাকি। তবে আজ প্রতিবেশী ভারত সম্পর্কেও কিছু কথা বলতে হয়। ভারতের বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার শেষ ভাষণে তো চমৎকার করে বলেছেন, বহুত্ববাদিতা ও সহনশীলতাই ভারতের অন্তরাত্মা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, অন্তরাত্মার আহ্বানে কতটা সাড়া দিচ্ছেন ভারতের শাসক গোষ্ঠী? অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের সাথে নিপীড়নমূলক আচরণকে এবং সীমান্ত আগ্রাসনকে আমরা কোন ভাষায় অভিহিত করবো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ