ঢাকা, শুক্রবার 28 July 2017, ১৩ শ্রাবণ ১৪২8, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শুধু কথায় কাজ হবে না

বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাওয়া রাজধানী ঢাকা এখন সারা বিশ্বেই সংবাদ শিরোনামে এসে গেছে। টেলিভিশন ও রেডিওসহ আন্তর্জাতিক সকল গণমাধ্যমেরই প্রধান খবর এখন অচল ও অকার্যকর হয়ে পড়া বাংলাদেশের রাজধানী। এদেশেরই বিশেষজ্ঞদের তথ্য-পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো কোনো গণমাধ্যমে এমনকি এ মন্তব্যও করা হয়েছে যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা একটি ব্যর্থ ও বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পাশাপাশি বাংলাদেশের সকল গণমাধ্যমেও স্বাভাবিক কারণেই ঢাকাকেন্দ্রিক খবর প্রাধান্যে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবারের সংবাদপত্রগুলোতে ‘বৃষ্টির পানিতে ডুবল রাজধানী’, ‘ডুবে গেছে রাজধানী ঢাকা’ এবং ‘সিটি ফ্লোটিং ইন রেইন ওয়াটার’ ধরনের শিরোনাম করা হয়েছে। কোনো কোনো দৈনিক আবার শিরোনামেই প্রশ্ন করেছে, ‘ডুবন্ত ঢাকাকে বাঁচাবে কে?’ এবং ‘এ দুর্ভোগের শেষ কোথায়?’ 

এসব শিরোনাম ও খবরের কারণ নিশ্চয়ই উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। শ্রাবণের বিরামহীন বৃষ্টিতে কয়েকদিন ধরেই ঢাকা মহানগরী কার্যত অচল ও স্থবির হয়ে পড়েছিল। অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছিল গত বুধবার। সেদিন সকাল থেকে মূষলধারে বৃষ্টি নেমেছিল। রাজধানীর এমন কোনো এলাকার নাম বলা যাবে না, যে এলাকা সেদিন কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে না গিয়েছিল। সচিবালয়ের ভেতরে পর্যন্ত পানি জমেছিল তিন-চার ফুট। এমনকি রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনের সামনের সড়ক দিয়ে মানুষ ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করেছে! নৌকা চলেছে পুরানা পল্টনের প্রধান সড়কে। অন্য অনেক এলাকাতেও নৌকাই হয়ে উঠেছিল একমাত্র ভরসা। কারণ, কোনো কোনো সড়কে চলাচলকারী বাসে পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়ায় গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল। সিএনজির প্রশ্ন ওঠে না, এমনকি রিকশা পাওয়াও সৌভাগ্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। অনেক সড়কেই যাত্রীসহ রিকশা আবার উল্টেও গেছে। এরকম অনেক ছবিই প্রকাশিত হয়েছে দৈনিকগুলোতে। 

এক কথায় বলা যায়, সবদিক থেকেই বুধবারের রাজধানী মহাদুর্ভোগের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। এমন এক পরিস্থিতিতেও ক্ষমতাসীনদের বাগাড়ম্বর কমার লক্ষণ দেখা যায়নি। নাটকীয় ঢঙে বেশি কথা বলার জন্য ‘বিখ্যাত’ হয়ে ওঠা সেতু ও সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনেকাংশে নীরব হয়ে গেলেও এবার নতুন করে আশার কথা শুনিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বুধবারের বৃষ্টিতে দিশেহারা মানুষ যখন হাবুডুবু খাচ্ছিল তখনও মন্ত্রী ধৈর্য ধরার আহবান জানিয়ে বলেছেন, আগামী বছর আর বৃষ্টিতে পানি জমবে না। প্রসঙ্গক্রমে মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি যে, সরকার উন্নয়ন কর্মকান্ডের জোয়ার বইয়ে চলেছে এবং সে কারণেই নাকি এবারের বৃষ্টিতে মানুষকে ‘কিছুটা’ অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়েছে। এরপর ‘তবে’ যুক্ত করে মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী বছর বৃষ্টি ও বর্ষার আগেই চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ড সমাপ্ত হবে। ফলে এবারের মতো আর পানি জমবে না বরং সব পানি দু’চার ঘণ্টার মধ্যে সরে যাবে। জনগণ তখন নাকি এত উন্নয়নের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারবে না!

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তার বক্তব্যের কোথাও এই সত্যের স্বীকৃতি পর্যন্ত দেননি যে, দুই সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসা, তিতাস ও বিটিসিএলসহ সরকারের কয়েকটি সংস্থা বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখঁড়ি ও নিত্যনতুন সড়ক ও ড্রেন ধরনের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই বলেই রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অলি-গলি ও মহল্লা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় প্রচন্ড পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। বুধবারের দুর্ভোগের প্রধান কারণও ছিল সেটাই। মন্ত্রী বরং সত্য এড়িয়ে সরকারের কথিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের জয়গান গেয়েছেন এবং জনগণকে আগামী বছর পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহবান জানিয়েছেন। অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা কিন্তু মন্ত্রীর সঙ্গে একমত হতে পারেননি। পরিবর্তে সকলেই সাধারণভাবে সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ বলেছেন। তাদের অভিমত, দীর্ঘমেয়াদি ও সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে অগ্রসর না হয়ে লোক দেখানো এমন কর্মকান্ড নিয়েই সরকার ব্যস্ত রয়েছে, যেগুলোর পেছনে দেশ ও জনগণের কল্যাণের চাইতে ‘নগদ নারায়ণ’ তথা অর্থ আয় করার উদ্দেশ্য গোপন থাকছে না। ক্ষমতাসীনরা আসলে দলীয় লোকজনকে ঠিকাদারি দেয়ার মাধ্যমে টাকা উপার্জনের ব্যবস্থা করেছেন। এজন্যই কোনো সংস্থার সঙ্গে অন্য সংস্থার কার্যক্রমে কোনো সমন্বয় নেই। সবাই শুধু নিজেরটুকু নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে। মূলত সে কারণেই রাজধানী ঢাকার অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা তাই না বলে পারেননি যে, শুধু ‘টোটকায়’ কাজ হবে না। পদক্ষেপ নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে। সে পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়ও দলবাজি করার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। সব ধরনের নির্মাণ কাজে থাকতে হবে সমন্বয়।

আমরা মনে করি, ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অচল হয়ে পড়া রাজধানীবাসীকে কেবলই কথিত উন্নয়নের ‘ট্যাবলেট’ গেলানো এখন আর সম্ভব নয়। ধৈর্যও তারা যথেষ্টই ধরেছে। সুতরাং কেবলই মিষ্টি কথার বাগাড়ম্বর ছেড়ে কাজের মতো কাজ করে দেখাতে হবে। এখন আর শুধু কথা ও আশ্বাসে ধৈর্য ধরতে সম্মত হবে না জনগণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ