ঢাকা, শুক্রবার 28 July 2017, ১৩ শ্রাবণ ১৪২8, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চীনের গোয়াংজুতে এক চক্কর

জিয়া হাবীব আহসান : প্রাচীন সভ্যতার দেশ চীন সফরের বাসনা ছিল দীর্ঘ দিনের। গত রমজানের ঈদের পর হঠাৎ একটা সুযোগ এসে গেল। দেওয়ানহাট, শেখ মুজিব রোডস্থ ট্রাভেল পার্কের মালিক স্নেহধন্য এমরান আহমেদ বললো, ‘স্যার ঈদের ছুটিতে এবার চীন ঘুরে আসুন।’ আমি, মানবাধিকার আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন ও এডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ হারুন, ভগ্নিপতি এডভোকেট সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও বৃটিশ ‘ল’ গ্র্যাজুয়েট ভাগিনা নাদিমকে নিয়ে ৫ জনের পাসপোর্ট ও যাবতীয় ডকুমেন্ট এমরানের হাতে পরদিনই পৌঁছে দিলাম। ৭ দিনের মধ্যে ৫ জনেরই ভিসা হয়ে গেল ৩ মাসের জন্য। ঈদের পর পর ৫ দিনের প্রোগ্রাম সেট আপ হলো। চীনের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র গোয়াংজু হয়ে রাজধানী বেইজিং এবং কুনমিং হয়ে দেশে ফেরার প্রোগ্রাম চূড়ান্ত হলো। ইতিমধ্যে ভগ্নিপতি এডভোকেট সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ ৬ মাসের কম থাকায় তিনি নতুন পাসপোর্টের আবেদন পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে জমা দিলেন। তিনি পাসপোর্টের মেয়াদ ও ভিসা থাকায় নতুন পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে বর্তমান পাসপোর্টটি ফেরৎ চাইলেন। কিন্তু পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হলেও চীন যাওয়ার আগের দিন ৫ই জুলাই ভাগিনা নাদিম দেখতে পেল তার বাবার পাসপোর্টটি ছিদ্র করে দেয়া হয়েছে। পাসপোর্ট অফিসের এমন দায়িত্বহীন বা কান্ডজ্ঞানহীন কাজের জন্য আমাদের একজন প্রিয় সফর সঙ্গীকে সফর তালিকা থেকে বাদ দিতে হলো। পাসপোর্ট অফিসের এহেন অমার্জনীয় অপরাধের কারণে আনোয়ার ভাইয়ের প্লেনের টিকেটসহ যাবতীয় কনফার্ম বুকিং মানি নষ্ট হয়ে গেল। শুধু ফিরতি ফ্লাইটের টিকেটগুলো স্থগিত করা গেলো। এভাবে পাসপোর্ট অফিসের অবহেলা ও কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডের মাশুল তাকে দিতে হল। যাক আমরা ৪ জনই সফরের জন্য জুলাই ৬ ’১৭ ইং তারিখ চট্টগ্রাম থেকে সন্ধ্যা ৮টার ইউ.এস বাংলার একটি ডোমেস্টিক ফ্ল্যাইটে ঢাকা পৌঁছলাম। ইন্টারন্যাশনাল লাউঞ্জে চায়না সাউদার্ন এয়ার এর ফ্লাইটে রিপোর্ট করে বোর্ডিং, ইমিগ্রেশান, ইত্যাদি শেষ করলাম। রাত ১২.৫০ টায় চায়না সাউদার্ন এয়ার লাইন্স এর একটি ফ্লাইট আমাদের নিয়ে উড়াল দিল। ঘর থেকে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ৪ (চার) সফরকারীর মুসাফিরি জীবন শুরু হলো। ইসলামরে দৃষ্টিতে ১৫ দিনের কম নিয়তে ৪৮ মাইল বা ৭০ কিলোমিটার অতিক্রম করলে তিনি মুসাফির। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরানে সফরের ব্যাপারে বান্দাহ্কে পৃথিবী বিচরণ করে সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন এবং বিভিন্ন জাতির প্রতি তাঁর আচরণ, শিক্ষা ও নির্দশনসমূহ অবলোকন করতে বলছেনে। এ-ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সুরা আন আম (আয়াত ১১), সুরা রুম (আয়াত ৪২) এবং সুরা নামল (আয়াত ৬৯) প্রণিধানযোগ্য। হারাম হালাল খাবারের আতংকটা বিমান থেকেই শুরু। কারণ এর আগে যে সব বন্ধুরা চীন সফর করেছেন তারা এ ব্যাপারে বার বার সতর্ক করেছেন। আমার স্ত্রী অধ্যক্ষ আশ্ফা খানম লাগেজে আপেল, মুড়ি, বিস্কুট, চনাচুর সহ নানা রকম শুকনো খাবার দিয়েছিলেন, যা চীনে গিয়ে অনেক কাজে লেগেছে। চায়না সাউদার্ন এয়ারে খাবারের মধ্যে ডিমের পুডিং, কেক, ফ্রুটস এসব হালাল খাবার বেছে নিলাম। পুরো ফ্লাইটে একটি সীটও খালি নেই। বাংলাদেশ থেকে গোয়াংজুতে সহ চীনের বিভিন্ন রাজ্যে এতো যাত্রী যাওয়া আসা করে তা দেখে অবাক হলাম। চীন বিশ্বব্যাপী তাদের বাণিজ্য সম্ভারের হাত প্রসারিত করেছে। ইতিপূর্বে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর প্রভৃতি দেশে দেখেছি ‘চায়না টাউন’ নামে তাদের পৃথক বাজার রয়েছে। বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী (মোবাইল, ল্যাপটপ, টেব) টাইলস, নানা রকম মেশিনারিজ, টুলস, বীজ, খাদ্য শস্য, কাগজ, গার্মেন্টস সামগ্রী, খেলাধূলার সামগ্রী প্রভৃতি সম্ভার তারা বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছে। আধুনিক ফুটবল, গলফ, দাবা খেলার তারাই প্রচলন করে। যে কোন মানের যে কোন মূল্যের পন্য তারা ফরমায়েশ মতো উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারে। চাইনিজরা পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী সু-পরিচিত। চীন পৃথিবীর পঞ্চ অক্ষ শক্তিরও অন্যতম। তারাই পৃথিবীতে প্রথম চা, চিনি, সিল্ক, ছাপাখানা, কম্পাস, ক্যালকুলেটর, বারুদ, কাগজ প্রভৃতি আবিষ্কার করে। প্রাচীনতম আকুপাংচার ও হারবাল চিকিৎসায় তাদের অনেক খ্যাতি। বিশ্ব সভ্যতায় তাদের অবদান অনেক বেশি। খনিজ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার তারাই প্রথম শুরু করে। জ্ঞান অর্জনের জন্য ভৌগোলিক সীমা ও দূরত্ব বিবেচনায় না এনে আখেরী নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও” (তাবরানী)। এ হাদীসের সনদ নিয়ে মতভেদ থাকলেও মহানবী (সাঃ) এর অমিয় বাণী ‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর জন্য ফরজ এবং মহানবী (সাঃ) ও সাহাবাদের জিন্দেগীর সাথে হাদিসটির যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। সাহাবা (রা:)-রা এজন্যে ওহীর জ্ঞানের আলো ছড়াতে চীন সহ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েন। তৃতীয় হিজরীর কাছাকাছি সময়ে প্রিয় নবী (সাঃ) এর মাতুল হযরত আবু ওয়াক্কাস (রা:) সহ আরো কয়েকজন সাহাবীদের চীন সফরের ঘটনা রয়েছে, যা পরে আলোচনা করবো। জুলাই ০৭ তারিখ সকাল স্থানীয় সময় সাড়ে ছ’টার দিকে গোয়াংজু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করি। এয়ারপোর্টের বিশালত্ব এবং প্লেনে উঠা নামার পরিমাণ গুণে শেষ করার মতো নয়। চীনারা নাকি এ পোর্টটিকে তাদের সবচেয়ে ক্ষমতাধর বিমান বন্দরে পরিণত করতে চায়। কেননা বিশ্ব বানিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে রাজ্যটির গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা বাংলাদেশী ৪ মুসাফির আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করে বিমান থেকে অবতরণ করলাম। দ্রুত ইমিগ্রেশান ও লাগেজ সংগ্রহের কাজ সেরে নিলাম। আমরা সবাই মিলে জরুরী প্রয়োজনে ইউ এস ১০০ ডলার চেইঞ্জ করে ৬২০ চীনা কারন্সেী (আর.এম.বি) পেলাম। বিমানবন্দরে ডলারের রেইট কম ও সীম কার্ডের মূল্য ১০০ আর.এম.বি। কিন্তু অন্যত্র ১০০ ডলার ভাঙ্গালে ৬৮৪ চীনা কারন্সেী পর্যন্ত পেয়েছি। আর মোবাইল সীমের মূল্যও বাইরে অনেক কম। এড. সৈয়দ হারুন সকলের জন্য শুধু একটি সীম কার্ড কিনে ইনস্টল করলেন। বাংলাদেশের সাথে চীনের স্থানীয় সময়ের ব্যবধান মিলাতে ২ ঘন্টা ঘড়িতে সময় বাড়িয়ে দিলাম। এখান থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে “মেটার্নিটি গেস্ট হাউজ” নামক সাউথ টাওয়ার, ডিই. এন বিল্ডিং নং ০৩, Jian Wu Ma Lu, Jian she street, yue Xiu District, Guangzoo তে এপার্টম্যান্টে ৭০৬ নং ফ্ল্যাটে। হালাল খাবার ও ভিজিটের সুবিধার্থে একজন বাংলাদেশী গাইডের সাহায্য নেয়া হয়েছিল। আমাদের এয়ারপোর্টে নিতে আসেন আমাদের দেশীয় গাইড জনাব এম.এম রহমান (রিমন)। তার সেল নাম্বারে কল দিলে তিনি এয়ারপোর্টের গেইট নং এ ০২ তে আমাদের অপেক্ষা করতে বলেন। সকাল ৮টার দিকে তিনি আমাদের নিতে এলেন। রিমন ভাই কে পেয়ে খুব ভাল লাগলো। তিনি খুব হাসি খুশি এবং মিশুক প্রকৃতরি লোক। চীনে সবচেয়ে বিড়ম্বনাকর হচ্ছে ভাষা। কেননা চীনারা তাদের মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কিছুই বুঝেনা, ইংরেজী বললে শুধু হাসে। এসব নিয়ে বেশ কিছু মজার অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে আলোচনা করবো। রিমন আমাদের সব পাসপোর্ট জমা নিয়ে বাস কাউন্টারে টিকেট কাটলেন। নির্দিষ্ট সময়ে বাস আসলো। আমরা মাত্র ৫ জন (গাইড সহ) বাসের মাঝে আরেকজন সহ মোট ৬ জন যাত্রী নিয়ে এ বিশাল এসি বাস গন্তব্যরে দিকে ছুটে চললো। গাড়ি ছাড়বে ১ জন যাত্রী নিয়েও নাকি তারা সময় মতো গাড়ি ছেড়ে দেয়। সময়ের প্রতি তাদের এমন নিষ্ঠা লক্ষ্যণীয়। প্রায় ৯৫,৯৬,৯৬০ বর্গ কিলোমিটারের এ বিশাল দেশে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের বসবাস। ২৩টি প্রদেশের একটি গোয়াংজু। সুন্দর পরিপাটি রাস্তাঘাট। বাইরে কোথাও কোন অনিয়ম বিশৃংখলা দেখলাম না। এতো মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকাই মনে হলো। প্রায় ১ ঘন্টা বাস ভ্রমণের পর আমরা নির্দিষ্ট এপার্টমেন্টের কাছে নেমে পড়লাম। তারপর শুরু হাঁটা। যখন তখন রিক্সা টেক্সি নেয়ার সুযোগ নেই। সবাই হাঁটছেন আর সাইকেল চালাচ্ছেন। সেখানে বাই সাইকেল রাখার নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। মোটর সাইকেল নিষিদ্ধ তবে সাইকেলে মটর লাগানো যাবে নির্দিষ্ট গতিতে চলতে। রাস্তা ঘাটে তেমন লোকজনের ভিড় নেই। গণপরিবহনের কোন সংকট বা সমস্যা নইে। আমাদের গাইড রিমন বৃহত্তর ঢাকার ময়মনসিংহের বাসিন্দা। তিনি ৪ বছর ধরে চীনে ব্যবসা করে আসছেন। বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও স্টুডেন্টদের নানাভাবে সহায়তা দেন। পরিশ্রমী মানুষটি নিজের কাজ নিজে করেন। আমরা ৪ রুম বিশিষ্ট এপার্টমেন্টে উঠলাম। আমরা ফ্রেশ হতে হতেই রিমন গরম পরটা ও ডিম ওমলেট ভাজির ব্যবস্থা করলেন। সেদিন ছিল জুমাবার। দুপুরে আমরা ক্যান্টনে “ছা’দ বিন আবি ওয়াক্কেস (রা:) মসজিদে জুমার নামায ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামরে মাতুল ও সাহাবাদের স্মৃতি ধন্য এলাকাটি পরিদর্শনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম। আমাদের গাইড জানালেন ওখানে দুপুরে চীনা মুসলমানরা ২ ঘন্টার জন্য বিশেষ খাবারের পশরা নিয়ে বসেন। সুতরাং আজ ওখানে খাবো। হালাল খাবারের কোন চিন্তা নেই। গোসল বিশ্রাম শেষে বেড়িয়ে পড়লাম জুমার উদ্দেশ্যে। পায়ে হেঁটে কয়কেটি মোড় পেরিয়ে পাতাল রেলে টিকেট করে আমরা চললাম একটি নির্দিষ্ট ট্রেনে সাব ওয়েতে। কি সুন্দর শৃংখলা। প্রতি মিনিট পর পর ট্রেন আসছে হাজার হাজার মানুষের আসা যাওয়ার দৃশ্য দেখে অবাক নয়নে চেয়ে থাকলাম। আর প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের দুর্বিষহ যানজটের দৃশ্য স্মৃতিপটে বারবার ভেসে আসছিল। আর ভাবছিলাম আমরা কবে যানজট থেকে মুক্তি পাবো। পরবর্তী সংখ্যায় “ছা’দ বিন আবি ওয়াক্কেস (রা:) মসজিদে জুমার নামাজ আদায় ও মাজার জিয়ারত নিয়ে বিস্তারিত লিখার আশা রাখি। 

-লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ