ঢাকা, শনিবার 29 July 2017, ১৪ শ্রাবণ ১৪২8, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান কমছে

এইচ এম আকতার: ধারাবাহিক উৎপাদন বাড়লেও কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্যের রফতানি কমছে। একদিকে সবজি ও ফলের সব থেকে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় শাকসবজি রফতানি প্রায় বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে দেশে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চিংড়ির রফতানি স্থবির হয়ে পড়েছে। এ দুই খাতে রফতানি কমায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। 

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৬-১৭) সবজি ও ফল রফতানি খাতে আয় হয়েছে আট কোটি ৪০ লাখ ডলারের। কিন্তু এর আগের অর্থবছরে (২০১৫-১৬) এ খাতে রফতানি আয় ছিল ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। অর্থাৎ ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ রফতানি কমেছে, যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এছাড়া ২০১৪-১৫ ও তার আগের বছর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যথাক্রমে ১৪ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ সবজি ও ফল রফতানি হয়েছিল। সেই হিসেবে রফতানি কমেছে অর্ধেকেরও বেশি।

চিংড়ি রফতানি কমে যাওয়ায় কমেছে হিমায়িত মৎস্য রফতানি আয়। বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণে মাছ রফতানি হয় তার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই চিংড়ি। ইপিবির তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের হিমায়িত মাছ রফানিতে আয় হয়েছে ৫২ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগের বছর (২০১৫-১৬) অর্থবছরের তুলনায় এক দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। ওই অর্থবছরে এ খাতের পণ্য রফতানিতে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। শেষ অর্থবছর শুধু চিংড়ি রফতানিতে আয় হয়েছে ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার।

তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছর ধরে মাছ রফতানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। যেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬৩ কোটি ডলারের মাছ রফতানি হয়। পরের দুই অর্থবছরে সেটি কমে যথাক্রমে ৫৬ ও ৫৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

মৎস্য অধিদফতরের হিসাব মতে- দেশের বর্তমান মোট জনসংখ্যার এগারো শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ পৌনে দু’ কোটিরও বেশি মানুষ মৎস্য খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এর মধ্যে নারী রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ। পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। দেশে নদ-নদী, খাল-বিল, প্লাবনভূমি, কাপ্তাই লেক ও সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ খালসহ মুক্ত জলাশয় রয়েছে ৩৯ লাখ ১০ হাজার হেক্টর। পুকুর, বাঁওড় ও চিংড়িঘেরসহ বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ হচ্ছে ৭ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর। সামুদ্রিক জলসীমা রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এবং এর সঙ্গে রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল। মৎস্য খাতের জন্য এত বিশাল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় তা অবহেলিত ছিল। 

মৎস্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে দেশে মৎস্য উৎপাদন ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৫৪ লাখ মেট্রিক টন। অথচ ওই সময়ে দেশে মাছের চাহিদা ছিল দ্বিগুণের কাছাকাছি। এ ঘাটতি পূরণ হতো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা মাছের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নানা ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করে। শুরু হয় নানামুখী গবেষণা। যা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে মৎস্য অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মীরা। এ খাতের সঙ্গে জড়িতসহ সাধারণ মানুষকেও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর কর্মকান্ডে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। গত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর মৎস্য খাতে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ হারে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছিল মোট ১৬ লাখ ৬১ হাজার ৩৮৪ মেট্রিক টন। পরের বছর এর উৎপাদন ৭ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৫৭ মেট্রিক টনে। ২০০১-০২ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে ১৮ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টনে পৌঁছে। এভাবে প্রতিবছর মাছের উৎপাদন ক্রমে বেড়ে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৮ লাখ ৯৯ হাজার ১৯৮ মেট্রিক টন, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩০ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৭ মেট্রিক টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮২ মেট্রিক টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৪ লাখ ১০ হাজার ২৫৪ মেট্রিক টন এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ১১৫ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রবৃদ্ধির এ ক্রমধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২০-২১ সালের মধ্যে মৎস্য উৎপাদন ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ মেট্রিক টনের লক্ষ্যমাত্রা সহজেই অর্জিত হবে। ওই সময়ে বর্ধিত জনগোষ্ঠীর মৎস্য চাহিদা হবে ৪৫ দশমিক ২৮ লাখ মেট্রিক টন। বাড়তি মাছ হবে রফতানি খাতের অন্যতম সম্পদ।

২০১৪ এর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার মতে- দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২২ দশমিক ৬০ শতাংশ হচ্ছে মৎস্য খাতের অবদান। দেশের রফতানি আয়ের দু’ শতাংশের বেশি আসে মৎস্য খাত থেকে। মানুষের খাদ্যের প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগ যোগান আসে মাছ থেকে। নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও মৎস্য খাতের রয়েছে ব্যাপক অবদান।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি আমিন উলাহ বলেন, হিমায়িত খাদ্যের রফতানি কমে যাওয়ার মূল কারণ চিংড়ির উৎপাদন হ্রাস। মূলত প্রাকৃতিক কারণেই চিংড়ি উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। এছাড়া কয়েক বছর ধরে ইলিশ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সামগ্রিকভাবে হিমায়িত খাদ্য রফতানিকে প্রভাবিত করছে।

তিনি জানান, দেশে প্রায় পৌনে তিন লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। এখন চিংড়ির বার্ষিক উৎপাদন দুই লাখ ৩০ হাজার টন। চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ প্রক্রিয়াকরণের জন্য সারা দেশে ৭০টি কারখানা আছে। আর হিমায়িত খাদ্য বিশ্বের ৬০টি দেশে রফতানি হয়।

অপরদিকে সবজি ও ফল রফতানি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিগত সময় মানের বিষয়ে সরকারের কড়াকড়ি আরোপ করার প্রভাব বলে মনে করেন অনেকে। এখন শর্তগুলো কিছুটা শিথিল হওয়ায় গত মাস থেকে কিছু মৌসুমি ফল রফতানি হচ্ছে বলে জানান রফতানিকারকরা।

তারা বলেছেন, সবজি ও ফল রফতানির সব থেকে বড় বাজার ইইউ। সেখান থেকেই রফতানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আয় হয়। তবে সরকারের তরফ থেকে মানের কিছু বিধিনিষেধ জারি করায় দেশ থেকে রফতানি কমে যায়।

একইভাবে সারা দেশে খাদ্য শস্য উৎপাদন হয়ে থাকে, প্রায় ৩ কোটি মেট্রিটন। দেশে চাহিদা রয়েছে এর চেয়ে কিছুটা কম। এরকম পরিসংখ্যান দেখিয়ে সরকার ২০১৫ সালে এক লাখ টন চাল রফতানিও করে। যদিও ঐ বছরই চিকুন চাল আমদানি করেছিল। সরকার প্রচার করছে খাদ্যে দেশ স্বঃসম্পন।

অথচ এ বছর বন্যার অজুহাত দেখিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানি করছে। কিন্তু পরিকল্পনা সচিব বলছেন ,বন্যায় মাত্র তিন লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে। তাহলে এত চাল কেন আমদানি করা হলো। পরি সংখ্যানের ধাঁধায় জনগন বার বার ধোকা খাচ্ছে। পরিসংখ্যানের মারপেচ ব্যবসায়ীরা বার বার অর্থ লোপাট করছে।

 খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত মার্চের পর থেকে কেবল ‘চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের’ মাধ্যমে উৎপাদিত সবজি ইউরোপে রফতানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। চুক্তিবদ্ধ চাষের মাধ্যমে একটি ক্রেতা কমিশন উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য নেওয়ার আগে তার নির্দিষ্ট মান যাচাই করবে। এরপর তা রফতানির যোগ্য হলে অনুমতি দেওয়া হবে। এছাড়া সবজি ও ফলের প্রতিটি চালান নিবিড়ভাবে পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে পিসি দেওয়া হবে। যাতে কোনো ধরনের রোগবালাই না থাকে।

তবে এর প্রভাবে রফতানি কমার সঙ্গে বাজার হারাচ্ছে দেশ এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল এন্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের পণ্য না থাকায় ভারতসহ কয়েকটি দেশ ইইউ’র বাজার ধরে নেবে। এতে গত ৩০ বছর ধরে যে বাজার তৈরি হয়েছে সেটি হুমকির মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বললেই তো করা যায় না। এর জন্য অনেক টাকা-পয়সার ব্যাপার। ভবিষ্যতে এমনটা করা সম্ভব। তবে হঠাৎ করে এমন শর্ত দেওয়া ঠিক হয়নি।

 বাংলাদেশ এক্সপোটার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিজিএমইর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, রফতানি আয় কমেছে এটি নেতিবাচক। তবে এ বছর রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। কিছু সংকটের সমাধান করতে পারলে এই প্রবৃদ্ধি আরো বাড়ত। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরপরও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্ববাজারে কমলেও আমাদের দেশে কমছে না। পাশাপাশি ডলারসহ বিভিন্ন মুদ্রার দাম টাকার বিপরীতে কমে গেছে। এর ফলে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেছে। 

তিনি বলেন, বড় কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ছে বলেই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কারখানা অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানান্তর করতে হবে অনেক কারখানা। এ ব্যাপারে আমরা সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ঋণের দাবি জানিয়েছি। এই কারখানাগুলো আবার সচল হলে এই প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি হবে বলেও তিনি মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ