ঢাকা, শনিবার 29 July 2017, ১৪ শ্রাবণ ১৪২8, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণভবন এখন কাশিমবাজার কুঠি এবং সুধা ভবন ষড়যন্ত্রের আস্তানা

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ গতকাল শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা প্রতিনিয়ত মানুষের সাথে তামাশা করে যাচ্ছে। দেশের মানুষ বাস্তবে ভোটারবিহীন সরকারের উন্নয়নের গালভরা বুলির বহিঃপ্রকাশ এখন চারিদিকে দেখতে পাচ্ছে। সুফল তো নয়, কুফলের দুর্ভোগে মানুষের নাকাল অবস্থা। রিজভী বলেন, জনগণ খুব দুঃখে বেদনায় প্রশ্ন করছেন। আমরা বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমেও দেখতে পাচ্ছি যে, এই ইডেন কলেজ, শান্তিনগর, পল্টন, বিজয় নগর, মালিবাগ এই এলাকাগুলো কোনো নদীর তীরে অবস্থিত কিনা- এটি ছাত্রদের প্রশ্ন ও মানুষের প্রশ্ন। একথাগুলো রসিকতা হলেও প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের প্রতি মানুষের ধারণা এরকমভাবে ফুটে উঠেছে। কেবল রাজধানীর মানুষই দুভোর্গে নেই, সারা দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো এখন তছনছ হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতি জনগণের স্বার্থ বিরোধী মন্তব্য করে রুহুল কবির রিজভী, তারা (সরকার) বলছেন যে, মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এবারে ঋণ প্রবাহ গতবারের চাইতে কমানো হয়েছে। এই যে কমিয়ে দেয়া- এতে কর্মসংস্থান হবে না, বাঁধাগ্রস্থ হবে, বেকার বাড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পরে মুদ্রাস্ফীতি কমে না- এটা একটি ভ্রান্তনীতি। এটা সরকারের প্রেসকিপশন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক এই কাজটি করছেন। অর্থ্যাৎ দেশের প্রকৃত অর্থনীতিকে চাঙা করা নয়, বরং সেটাকে আরো তিমিরের দিকে ঠেলে দেয়া- এটাই হচ্ছে মূল কাজ। এবার যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে, এটি গণবিরোধী ও জনগণের স্বার্থ বিরোধী।

চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের এই মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। গত জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও মে পর্যন্ত সময়ে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ১৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ ছিল। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে এই লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

লুটেরাদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে অভিযোগ করেন বিএনপি সরকারের সময়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রুহুল কবির রিজভী বলেন, বড়লোকদের ও লুটেরাদেরকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। আমি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলাম। আমরা এক-সময় জানতাম, খেলাপি ঋণ রিসিডিউল করা হত, এখন রিস্ট্রাকচারিং করা হচ্ছে। ৫০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নিয়েছেন, তাদের রিস্ট্যাকচারিং করা হয়। অর্থাৎ ক্ষমতার জোরে টাকা নিচ্ছেন, তারা এই রিস্ট্রাকচারিং সুবিধা পাবেন। এই টাকার কী হবে, এই টাকা তো পাঁচার হয়ে যাচ্ছে।

লন্ডনে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সফর নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনার মধ্যে ক্ষমতাসীনদের ‘অশুভ পরিকল্পনা’ দেখছেন বিএনপি নেতা রিজভী। তিনি বলেন, লন্ডনে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে আওয়ামী নেতারা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করায় সরকার কোনো অশুভ পরিকল্পনা আঁটছে কিনা তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ ওরা (আওয়ামী লীগ নেতারা) যখন কাউকে অভিযোগ করবে, বুঝতে হবে যে তারা কারো বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্তমূলক কিছু করছেন। তারা যখন উদ্ভট অভিযোগ করেন তখন বুঝতে হবে তা সুদূরপ্রসারী চক্রান্তেরই অংশ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো গোপন ফন্দি আটার সেটি বহিঃপ্রকাশ। আগামী সাধারণ নির্বাচনে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে আওয়ামী লীগ নেতারা নীলনকশা এঁকে চলেছে মন্তব্য করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব বলেন, তাই শ্যামলীর গণভবন এখন কাশিমবাজার কুঠি এবং সুধা ভবন এখন জগৎশেঠ ও ঘষেটি বেগমদের ষড়যন্ত্রের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা গাড়ি পুড়িয়ে ছিল দাবি করে রিজভী বলেন, বিরোধী দলকে দমন করতেই তারা গাড়ি পুড়িয়ে সেই দোষ বিএনপিসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এখন তারা মনগড়আ মামলা করে তার বিচার করছে। যার সাথে সত্যের লেশমাত্র উপস্থিত নেই। তিনি বলেন, ঘটনা ঘটার পরপরই হাতেনাতে ধরা পড়েছে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা তাদের অভ্যন্তরীণ কনফারেন্সে মুখ ফসকে বলেছিলেন-‘পুলিশই তো গাড়ী পোড়াই’। বিহঙ্গ গাড়ী ও বিআরটিসি বাসে আগুন লাগানোর ঘটনাটি ছিল বিস্ময়কর, গাড়ীর অভিমূখ ছিল একদিকে আর পোড়ানো হয়েছে অনেক দুরে অন্যদিকে। এ বিষয়গুলি আমরা বারবার তুলে ধরেছি। আওয়ামী নেতা ও বিহঙ্গ পরিবহনের মালিকের বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য স্বয়ং বরিশালের জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। জঘন্য অন্যায় কখনোই আড়াল করা যায় না। 

ইউনূস সেন্টারের ‘সোশ্যাল বিজনেস ডে’র আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে পুলিশের অনুমতি না দেওয়ার পেছনে সরকারের স্বৈরতন্ত্রের হিংস্র রূপের প্রতিফলন ঘটেছে উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, এ ঘটনায় ‘ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ’ ঘটেছে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাধা দেওয়া স্বৈরতন্ত্রেরই হিংস্র রূপ। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

গতকাল সকালে সাভারের জিরাবোতে সামাজিক কনভেনশন সেন্টারে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করার কথা ছিল। মূল বক্তা হিসেবে তাতে উপস্থিত থাকার কথা ছিল জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব টমাস গাসের। কিন্তু পুলিশের অনুমতি না মেলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইউনুস সেন্টার এক বিবৃতিতে সম্মেলন বাতিলের কথা জানায়। তার আগে পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ইউনূস সেন্টারের আবেদন তারা হাতে পেয়েছেন ২৩ জুলাই। এত অল্প সময়ে প্রস্তুতি ছাড়া এত বড় আয়োজনের অনুমতি দেওয়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। মূল সম্মেলন বাতিল হলেও ইতোমধ্যে ঢাকায় চলে আসা অতিথিদের নিয়ে শুক্রবার সকালে একটি অনুষ্ঠানে মিলিত হয়েছে ইউনূস সেন্টার। ঢাকার একটি হোটেল থেকে ওই অনুষ্ঠান তারা ফেইসবুকে লাইভও করছে।

সরকারের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অনুমতি না দেয়ায় এই সিদ্ধান্ত মঙ্গল বয়ে আনবে না। বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এমনিতেই আছে, এর ফলে তা আরও গভীর হবে বলে আমরা মনে করি। রিজভী অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘ভোটারবিহীন একতরফা’ নির্বাচনের পর থেকে সরকারি দল ও তাদের মিত্ররা ছাড়া কাউকে প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও বাধা দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ