ঢাকা, শনিবার 29 July 2017, ১৪ শ্রাবণ ১৪২8, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে

# ১৭ বছরে অর্ধশতাধিক বাঘ হত্যা
খুলনা অফিস : সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্ব হুমুকর মুখে। বন উজাড় ও শিকারি কর্তৃক বাঘ হত্যার ফলে এ প্রাণিটি আজ বিপন্নের পথে। সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘ রয়েছে। মানুষকে সচেতন ও বাঘ রক্ষা করার জন্য প্রতি বছর ২৯ জুলাই বাঘ দিবস পালন করা হয়। এবছর ৭ম বিশ্ব বাঘ দিবস। ২০১০ সালে জানুয়ারি মাসে থাইল্যান্ড’র হুয়ানে অনুষ্ঠিত হয় টাইগার রেঞ্জ দেশ সমূহের ‘এশিয়া মিনিষ্ট্রয়াল কনফারেন্স’। এখান থেকে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় যে, প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হবে। ওই সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়। সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষনে ৯দফা পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে বাঘের সংখা দ্বিগুণ করা।
সূত্র জানিয়েছে, বাঘ জাতীয় প্রাণি ও বীরত্বের প্রতীক। বাঘের আবাস স্থাল হচ্ছে সুন্দরবন। বন উজাড় ও শিকারিদের হাতে বাঘ হত্যার ঘটনাটি প্রাণি আজ বিপন্নের পথে। বিশ্বের ১৩টি দেশে বাঘের অস্তিত্ব বজায় রয়েছে। এ ১৩টি বাঘ সমৃদ্ধ দেশকে বলা হয় ‘টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি’।বাঘ সমৃদ্ধ দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, বার্মা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালায়শিয়া, ভিয়েতনাম, ভূটান, লাওস, নেপালও রাশিয়া। বাঘের ৯টি উপ-প্রজাতির মধ্যে বালিনীজ, জাভানীজ ও কাম্পিয়ান টাইগার বিশ্ব হতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বেঙ্গল, সাইবেরিয়ান, সুমাত্রান, সাউথ চায়না ও ইন্দো চায়না উপ-প্রজাতি টিকে আছে। সারা বিশ্বে প্রায় লাক্ষাধিক বাঘ ছিল। ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ৪ হাজার। আর সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি। বিশ্বের ১৩টি দেশের মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম।
২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্রপিং এর মাধ্যমে বাঘ গণনা করা হয়। এতে ১০৬টি বাঘের সন্ধান পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে আমেরিকার দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি অর্থায়নে বাঘ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যামেরার সাহায্যে গণনা করেন। খুলনা বিভাগীয় বণ্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত সংরক্ষণ বিভাগ এ প্রকল্পকে জনবল ও ৭০টি ডিজিটাল ক্যামেরা সরবরাহ করে। ওই বছরের ডিসেম্বরে কাজ শুরু এবং চলতি বছরের জুন মাসে এর কার্যক্রম শেষ হয়। সুন্দরবনের ৩টি অভ্যয়রণ্য এলাকায় গাছের সাথে ক্যামেরা বেঁধে এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বন সংরক্ষক কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মন্দিরা বলেন, এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘ রয়েছে। বাঘ প্রকল্পের গবেষণা কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মোজাহিদ বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। বাঘের প্রতিবেদন প্রকাশ করবে সরকার। তবে বাঘের সংখ্যা বাড়তে পারে। একটি সূত্র দাবি করেছে বাঘ গণনার নামে অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে।
সুন্দরবন গবেষক ও সরকারি পিসি কলেজের প্রাণি বিদ্যাবিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক শাহ আলম ফরাজি বলেন, চোরা শিকারি আর বনদস্যুরা তাদের পেশা পরিবর্তন করে বাঘ শিকার ও পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়ার কারনে সুন্দরবনে দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ২০০৬ সালের বাঘ শুমারিতে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেই শুমারিতে ৪শ’ ৫০টি বাঘ ছিল সুন্দরবনে। আর ২০১৫ সালের বাঘ শুমারিতে তা কমে একশ’ ৬টিতে এসে দাঁড়ালো। বাকি ২শ’ ৮০টি বাঘ গেল কই? তার উত্তর কিন্তু এখনো মেলেনি। তিনি আরো বলেন, সুন্দরবনে বাঘের জন্য নিরাপদ আবাস স্থল নেই, পর্যাপ্ত খাবার নেই, এ কারণে বাঘগুলো বার বার লোকালয়ে ফিরে আসছে। আর তখনই সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিরা বাঘ হত্যা করছে। আর এই চোরা শিকারিদের যে সিন্ডিকেট গুলো রয়েছে তাদের অনেকে বাঘের চামড়া ও হাড়গোড়সহ বিভিন্ন সময় র‌্যাব, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের হাতে গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁক-ফোকোর দিয়ে বের হয়ে তারা পুনরায় একই পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। তাই কঠোর আইনের মাধ্যমে এখনই যদি এ চোরা শিকারিদের ঠেকানো না যায় তবে অচিরেই সুন্দরবন থেকে বাঘ হারিয়ে যাবে।
১৭ বছরে অর্ধশতাধিক বাঘ হত্যা : গত ২০০১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বনজীবী, চোরা শিকারি ও বনদস্যুদের হাতে ৫২টি বাঘ মারা পড়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাট অংশে রয়েছে ১৯টি এবং বাকীগুলো খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। চোরা শিকারি আর বনদস্যুরা তাদের পেশা পরিবর্তন করে অধিক মুনাফার আশায় এখন বাঘের অঙ্গ-প্রতঙ্গ, চামড়া, হাড়, দাঁত, নখ পাচারে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে সুন্দরবনে ২০০৬ সালের বাঘ শুমারির পর ২০১৫ সালের বাঘ শুমারির প্রতিবেদনে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১০৬ এসে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবন ও লোকালয়ে বাঘের হামলায় ১শ’ ৮২ জন নিহত ও ৭৫ জন আহত হয়েছে বলে বন বিভাগ সূত্রে নিশ্চিত করেছে। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘের খাবার সংকট, পর্যাপ্ত নিরাপদ আবাসস্থল দিন দিন কমতে থাকায় বাঘ এখন লোকালয়ের দিকে বেশী ধাবিত হচ্ছে। আর এ কারণে চোরা শিকারিদের বাঘ মারতে সহজ হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন বাংলাদেশের অংশে রয়েছে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। ৪৫০টি নদ-নদী ও খাল এই সুন্দরবনকে জালের মতো করে ঘিরে রেখেছে। এখানে এক সময়ে সাড়ে ৪শ’ রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিচরণ করত। সিডর আইলার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশের বিরূপতা, চোরা শিকারীদের হামলা ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় জনরোষের শিকার হয়ে দিন দিন কমতে শুরু করেছে সুন্দরবনের রক্ষা কবজ হিসেবে খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
সম্প্রতি সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ-২০১৫’র ফলাফলে দেখা গেছে, সুন্দরবন বাংলাদেশের অংশে রয়েছে ১০৬টি বাঘ আর ভারত-বাংলাদেশ মিলে পুরো সুন্দরবন জুড়ে বাঘের সংখ্যা এখন মাত্র ১৭০টি। যা এর আগের শুমারী থেকে ২শ’ ৭০টি কম। তাই সুন্দরবন ও বনের রক্ষা কবজ হিসেবে খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঁচাতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে বলে মনে করেন সুন্দরবন বিশেজ্ঞরা।
বন বিভাগের হিসাব অনুযাযী ২০০১ সালের ২০ নবেম্বর শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী এলাকা থেকে ১টি স্ত্রী বাঘ ও একই বছরের ১২ ডিসেম্বর চাঁদপাই সদর রেঞ্জ এলাকায় ১টি পুরুষ বাঘ ও ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর একই রেঞ্জের বলেশ্বর নদীর পাড় সংলগ্ন ঘনসুন্দরী ও গরান বন থেকে বার্ধক্য জনিত কারনে জামতলার রানী নামে পরিচিত একটি স্ত্রী বাঘের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের জোংড়া টহল ফাঁড়ি এলাকায় ১টি পুরুষ বাঘকে দুষ্কৃতকারীরা গুলী করে হত্যা করে। ২০০৩ সালের ২৮ মে চাঁদপাই রেঞ্জের নলবুনিয়া গ্রামে, ১৯ অক্টোবর শরণখোলা রেঞ্জের চালিতাবুনিয়া গ্রামে, ২১ ডিসেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া গ্রামে ও ২০০৯ সালে ২ জুলাই শরণখোলা রেঞ্জের রাজাপুর গ্রামে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে স্থানীয় দুইজন বাসিন্দাকে আহত ও ৫টি গরু হত্যা করলে গণপিটুনিতে মারা যায় ৪টি বাঘ। ২০০৪ সালে ২৫ আগস্ট চরদুয়ানি এলাকার কাঁঠালতলা গ্রামের বেলায়েত তালুকদারের বাড়ি থেকে একটি বাঘের চামড়া ও ২০০৬ সালের ২ নবেম্বর শরণখোলার সোনাতলা গ্রামের নুরুজ্জামানের বাড়ি থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ২০০৭ সালের ২মে চাঁদপাই রেঞ্জের হাড়বাড়িয়া টহল ফাঁড়ির পুকুরপাড় থেকে ১টি মৃত পুরুষ বাঘ ও ১৬ নবেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারী স্টেশনের ঘাঘরামারী ক্যাম্প এলাকা থেকে সিডরের আঘাতে মারা যাওয়া ১টি পুরুষ বাঘকে উদ্ধার করা হয়। ২০১১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি শরণখোলার খাদা গ্রামের পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ৩টি বাঘের চামড়া ও হাড়গোড় ও ৮ ডিসেম্বর পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার তুষখালি বিআরটিসি বাস কাউন্টার এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১টি বাঘের চামড়া একটি মাথার খুলি ও ১৮ পিস হাড় উদ্ধার করা হয়। ২০১২ সালের ৬ নবেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারি গ্রামের পেটীকাটা বিলের ধান ক্ষেত থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি মোড়েলগঞ্জ নব্বই রশি বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে র‌্যাব ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে। এছাড়া ১২ মে শরণখোলা উপজেলার উত্তর সোনাতলা গ্রামের ঢালীর ঘোপ ছগির গরমীর ঘর ও পুকুর থেকে ১শ’ ৫৭ পিস বাঘের হাড় উদ্ধার করা হয়।
বন্যপ্রাণি সংরক্ষক খুলনা এর বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মদিনুল আহসান বলেন, সুন্দরবনে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লোকালয়ে বাঘ হানা দিয়েছে একশ’ বিশ বার। আর এই সময়ের মধ্যে বাঘের হামলায় জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল, চোরা শিকারীসহ ১শ’ ৮২ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে বাঘের হামলায় আরো ৭৫ জন আহত হয়েছে।
বাগেরহাট পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বলেন, সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট যে কোন অপরাধ দমনের জন্য তালিকা তৈরিসহ অপরাধীদের সনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য পুলিশ প্রশাসনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, সুন্দরবনের বাঘ ও সম্পদ রক্ষায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বনবিভাগও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্মার্ট টিম বনদস্যু ও চোরা শিকারীদের জন্য আতঙ্ক। এ কারণে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে একটিও বাঘ মারা যায়নি। তিনি বলেন, বিশ্ব বাঘ দিবস আজ ২৯ জুলাই। বাগেরহাটেই দিবসটি পালিত হবে। বাঘ রক্ষায় সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা এই জনপদের জনসাধারণকে সচেতন করতে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব, বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসতিয়াক আহমদ, প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মাদ সফিউল আলম চৌধুরীসহ কর্মকর্তারা বাগেরহাটে র‌্যালি ও আলোচনা সভা করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ