ঢাকা, শনিবার 29 July 2017, ১৪ শ্রাবণ ১৪২8, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভোলার এসপি মোকতারের নারী কনস্টেবল নিপীড়নের দায় কনস্টেবল মনিরের ঘাড়ে!

ইবরাহীম খলিল : ভোলা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোকতার হোসেনের বিরুদ্ধে তার অধীনস্থ নারী কনস্টবলদের নিপীড়নের অভিযোগ ওঠেছে। এ ঘটনা তদন্ত করে এসপির নারী নিপীড়নের দায় তার তৎকালীন অর্ডারলি কনস্টবল মনিরের ওপর চাপিয়ে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু নারী কেলেঙ্কারীর সঙ্গে জড়িত এসপি মোকতার হোসেন রয়েছেন বহাল তবিয়তে। কনস্টেবল মনির তদন্তের শুরুতে দোষ নিজের ঘাড়ে নিলেও চাকরি হারানোর পর তিনি আসল ঘটনা ফাঁস করে দিয়ে চাকরি ফেরত এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ন্যায় বিচারের আকুতি জানিয়ে আপিল আবেদন করেছেন।
চাকরিচ্যুত পুলিশ কনস্টেবল মনিরের বাড়ি ঝালকাঠী জেলার নলসিটি উপজেলার দক্ষিণ ডেবরা গ্রামে। তার সর্বশেষ কর্মস্থল বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ বিএমপি। বরগুনা জেলার স্মারক নং- বরঃজেলা/আর,ও /০৫-২০১৭/১২২১ তাং ০৬/৭/২০১৭ খ্রিঃ এবং বরগুনা জেলার আদেশ নং-৯৯০ তারিখ-০৫/৭/২০১৭ খ্রিঃ মোতাবেক বরগুনা জেলার সাবেক বরিশাল মেট্রোলিটন পুলিশের কনস্টবল/৬১৬(বরগুনা), ১৬২৭(বিএমপি) মোঃ মনির বিপি নম্বর- ৯২১১১৪৩৭১১। 
পুলিশ হেড কোয়ার্টারের নির্দেশনা হচ্ছে, জেলা পর্যায়ে কর্মরত নারী পুলিশদের থানা পদায়ন করার কথা। এছাড়া ইভটিজিং ও নারী নির্যাতন দমনসহ যাবতীয় গুরুতর অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এরপরও জেলা পুলিশ সুপারের মত দায়িত্বে থেকে মোকতার হোসেন নারী কনস্টেবল নিপীড়নের ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাবনায় পড়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪/০৭/২০১৬ ইং তারিখে ভোলা জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে মোকতার হোসেন যোগ দেওয়ার পর পুলিশ হেডকোয়র্টারের নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে জেলার থানাগুলো পরিদর্শন করেন এবং তার নজরে পড়া নারী কনস্টবলদের পুলিশ লাইনে বদলি করে আনেন এবং অর্ডারলি কনস্টেবল মনিরকে দিয়ে স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে পুলিশ সুপারের বাংলোয় একাকী আসার জন্য নানা প্রলোভন দেখান। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ সুপারের বাংলোয় গেলে নিজের পছন্দমত স্থানে ডিউটি নেওয়া যাবে, ইচ্ছে হলেই ছুটি না নিয়েও বাড়ি চলে যাওয়া যাবে। কিন্তু ওই নারী কনস্টেবলরা তার এসব প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কনস্টেবল মনির ও এসপি মোকতার এসব কথোপকথন রেকর্ড করেন। এরপর ১৫/০৮/২০১৬ইং তারিখে উইমেন্স পুলিশ নেটওয়ার্কের প্রধান ডিআইজি মিলি বিশ^াসের কাছে বিষয়টি জানালে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তা তদন্ত শুরু হয়। ঢাকা পুলিশ হেডকোয়ার্টাস স্মারক-৪৪.০১.৪৪৪.০৩০.০৪.০৪৫.১৬/১৯৫৫ তাং ১৭ আগস্ট ২০১৬ইং এবং বরিশাল ডিআইজি অফিস স্মারক নং (স্টেনো-২)/৫.২০১৬/১৩৭। এ ঘটনার পরদিন বরিশাল মেট্রো পলিটন পুলিশ বিএমপির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আকরাম হোসেন তদন্তের কাজে ভোলায় যান এবং এসপির নিপীড়নের শিকার কনস্টবলদের সঙ্গে কথা বলেন।
এই তদন্তের বিষয়ে কনস্টবল মনিরের বক্তব্য হচ্ছে, বিভাগীয় মামলাটি তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্ত পুলিশ সুপারকে ঘটনার সাথে জড়িত না রেখে একতরফা তাকে দোষী সাব্যস্থ করে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। রিপোর্টের ভিত্তিতে কনস্টবল মনিরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয় এবং গত ০৫/০৭/২০১৭ তারিখে ভোলার এসপির দায় সাবেক অর্ডারলি কনস্টবল  মনিরের ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।
১৫/০৭/২০১৭ ইং তারিখে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর করা দরখাস্তে চাকরিচ্যুত কনস্টবল মনির হোসেন লিখিত আবেদনে দাবি করেন, ভোলার পুলিশ সুপার মোকতার হোসেনের মৌখিক আদেশ পালন করার অপরাধে তাকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। মনির তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, পুলিশ সুপার বেশির ভাগ সময় তার সরকারি বাস ভবনে একাই থাকতেন। বেগম সাহেবার (এসপির স্ত্রীর) চাকুরীর সুবাদে ঢাকায় থাকতেন। তবে মাঝে-মধ্যে তিনি ভোলায় আসতেন। ২০১৬ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ভোলার এসপি অফিসের রিসিপশন শাখায় কর্মরত এক নারী কনস্টেবলকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এসপির বাংলোতে আনার কথা বললে কনেস্টবল মনির নারী কনস্টবলকে এসপির সরকারি বাসভবনে যাওয়ার কথা বলেন। এতে ওই নারী কনস্টবল সাড়া না দেওয়ায় এসপি মোকতারের নজর পড়ে আরেক নারী কনস্টবলের ওপর। এরই ধারাবাহিকতায় ০৫/০৮/২০১৬ তারিখে ওই নারী কনস্টবলকে এসপির সরকারি বাসভবনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে বলা হয় মনিরকে মোবাইলে কল দিয়ে ভবিষৎ ভাল করার কথা বলে পুলিশ সুপারের কথা শোনার জন্য তার বাসভবনে যাওয়ার অনুরোধ করেন । কিন্তু ওই নারী কনস্টবলও এসপির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা এসব মোবাইল ফোনের আলাপ আলোচনা রেকর্ড করে রাখেন। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর পর  ৪ জন নারী কনস্টলকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়।
তিন পৃষ্ঠার আবেদনে চাকরিচ্যুত কনস্টবল মনির দাবি করেন, নারী কনস্টবল যে অভিযোগ দিয়েছেন এর সম্পূর্ণ দায় এসপি মোকতার হোসেনের। কারণ তার মোবাইল দিয়ে এসপি নিজেও ওই সব নারী কনস্টবলের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসপির কথোপকথনের রেকর্ডও এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।  একথা একজন নারী কনস্টবল তার জবানবন্দীতেও জানিয়েছেন। 
মনির এও বলেছেন, পুলিশ সুপারের সম্মান যাতে ক্ষুণœ না হয় সেজন্য তদন্তের শুরুতে দুই নারী কনস্টবলকে দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল তাকে ছোটখাটো শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু পুলিশ সুপারের দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে চাকরিচ্যুত করাকে লঘু পাপে গুরু দ- হিসেবে উল্লেখ করেছেন কনস্টবল মনির।
আবেদনের শেষ প্রান্তে এসে মনির আবারো বলেছেন, বরগুনার পুলিশ সুপার প্রকৃত অপরাধী ভোলার পুলিশ সুপার মোকতার হোসেনের অপরাধ আড়াল করে অন্যায়ভাবে তাকে এক তরফা দোষী সাব্যস্থ করে চাকুরী থেকে অপসারণ করেছেন।
প্রসঙ্গত, কনস্টবল মনিরের আবেদনের কপি, নারী কনস্টবলের সঙ্গে কথোপকথনের রেকর্ড এবং এসপিমোকতার হোসেনের ফোনের রেকর্ড এবং নারী কনস্টবলদের কথোপকথনের  রেকর্ডও এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। এদিকে ভোলার বর্তমান পুলিশ সুপার মোকতার হোসেন এর আগে এডিশনাল এসপি থাকা অবস্থায় সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানেও তার অধীনস্থ নারী কনস্টবলকে নিজের সরকারি অফিসে ডেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক নারী কনস্টবলের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের আলাপের রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। রেকর্ডে দেখা যায় সুযোগ পেলেই মোকতার হোসেন নারী কনস্টবলকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতেন। আর ভোলায় একজন নারী কনস্টবলের সঙ্গে আলাপের রেকর্ডে দেখা যায় সেখানকার লোকজন তার কাছে ভাল না লাগলেও ওই এলাকার মেয়েদের তার কাছে খুব লাগে।
এবিষয়ে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি রদ বদলের কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা আকরাম হোসেন এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ