ঢাকা, রোববার 30 July 2017, ১৫ শ্রাবণ ১৪২8, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে না

এতদিন ধরে ফেসবুকে যেটি তুমুল জল্পনা কল্পনার বিষয় ছিল সেটি এখন এক শ্রেণীর দৈনিক পত্র পত্রিকা এমনকি এক শ্রেণীর টেলিভিশনেও জল্পনা কল্পনা এবং আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই জল্পনা কল্পনাটি হলো, ভারত এবং চীনের মধ্যে সত্যিই কি যুদ্ধ লেগে যাবে? অনেক অন লাইন নিউজ পোর্টাল এবং অনেক দৈনিক পত্রিকার অন লাইন সংস্করণ পড়ে মাঝে মাঝে মনে হয় চীন ভারতের যুদ্ধ এই বুঝি লেগে গেল। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন যে গত এক মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেল দেশ দুটি ‘স্ট্যান্ড অফ’ পজিশনে চলে গেছে। ডোকলাম অঞ্চলের একদিকে ভারত বিপুল সৈন্য সমাবেশ করেছে। অন্যদিকে গণচীনও সৈন্য সমাবেশ করতে শুরু করেছে। সৈন্য সমাবেশের পর দুই দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে বাক যুদ্ধ। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছেন যে, চীন যদি ভারতকে ১৯৬২ সালের ভারত ভেবে থাকে তাহলে তারা খুব বড় ভুল করবে। ১৯৬২ সালের পর এটি ২০১৭ সাল। মাঝখানে অর্ধ শতাব্দিরও বেশি পার হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে চীনের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, চীনও আজ ১৯৬২ সালের চীন নয়। নিজের সার্বভৌমত্ব স্বাধীনতা এবং ভৌগলিক অখ-তার জন্য চীন যা যা প্রয়োজন তাই করবে। চীনের একটি সরকারি পত্রিকা এতদূরও বলেছে যে, প্রয়োজনে পর্বতকে তার আপন জায়গা থেকে সরানো যেতে পারে। কিন্তু চীনের সৈন্যগণকে তাদের অবস্থান থেকে সরানো যাবে না। এই ধরণের গরম বাক্য বিনিময় হচ্ছে প্রতিদিন। উভয় দেশের তরফ থেকে এই ধরনের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ফলে স্বাভাবিকভাবে অনেক মানুষের ভেতর প্রশ্নের উদয় হয়েছে যে, তাহলে কি এই দুই এশিয়ান জায়ান্টের মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভারত চীন সীমান্ত বিরোধ বিশেষ করে ডোকলাম এলাকা নিয়ে বিরোধে যুদ্ধ অবশ্যাম্ভাবী বলে মনে করছে। এই যুদ্ধ লাগলে কার কপালে কি ঘটবে সেটিও বলে দেয়া হচ্ছে।
শুধু বাংলাদেশের ফেসবুক কেন, আন্তর্জাতিক অনেক নামকরা মিডিয়াতেও যুদ্ধের আশংকা করা হচ্ছে। সেই আশঙ্কা থেকেই তারা ভবিষ্যত যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে একটি হিসাব কষা শুরু করেছে। সেটি করতে গেলে অবধারিতভাবেই চীন ও ভারতের সামারিক শক্তির প্রশ্ন এসে পড়ে। তারপর এই দুই দেশের সামরিক শক্তির তুলনামূলক পর্যালোচনা এসে যায়। যুদ্ধ লাগবে কিনা সেটি নিয়ে আমার বিশ্লেষণ এবং মন্তব্য আরো কিছুটা পরে দেবো। তার আগে আসুন, চীন ও ভারতের সামরিক শক্তির তুলনামূলক পর্যালোচনা করা যাক। তাদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে একটি আইডিয়া নিতে গিয়ে আমি একাধিক সূত্রের তথ্য নিয়েছি। সূত্রগুলো হলো লন্ডনের ইন্টান্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ কর্তৃক প্রকাশিত মিলিটারি ব্যালান্স ২০১৬-২০১৭, ইন্টারনেট এবং সিপ্রি ইয়ার বুক।
প্রথমে ভারতের সামরিক শক্তি। ভারতের ভা-ারে রয়েছে ১০০টি পারমাণবিক বোমা। তাদের সৈন্য সংখ্যা ১৩ লক্ষ ২৫ হাজার। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে উল্লেখ করার মতো হলো দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। একটি হলো অগ্নি-৫। এর রেঞ্জ বা বোমা বহন ক্ষমতা ৮ হাজার কিলোমিটার। অপরটি হলো অগ্নি-৬। এর রেঞ্জ বা অস্ত্র বহন ক্ষমতা ১০ হাজার কিলোমিটার। ভারতের অস্ত্র ভা-ারে রয়েছে ৬ হাজার ৪০০টি ট্যাংক। তাদের আর্মার্ড ফাইটিং যানের সংখ্যা ৬ হাজার ৭০০। তাদের বহুমুখী রকেট উৎক্ষেপন সিস্টেমে রয়েছে ৩৭০টি রকেট। তাদের জঙ্গি বিমানের সংখ্যা ১৩৩৪ টি। তাদের এ্যাওয়াক বিমানের সংখ্যা ৬। এ্যাওয়াক বিমান হলো সেই ধরনের বিমান যেটি শত্রু পক্ষের রাডারে চোখকে ফাঁকি দিয়ে অনেক নিচু দিয়ে উড়ে যেতে পারে। তাদের জঙ্গি হেলিকপ্টারের সংখ্যা ৭০০। ভারতের বিমানবাহী জাহাজের সংখ্যা ২। সাবমেরিনের সংখ্যা ১৪। ডেস্ট্রয়ারের সংখ্যা ১০। ফ্রিগেটের সংখ্যা ১৪।
॥দুই॥
ওপরের এই তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে সামরিক দিক দিয়ে ভারত অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে ৪টি অথবা ৫টি দেশকে সামরিক শক্তির বিচারে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ মনে করা হতো। এসব দেশ হলো আমেরিকা, সোভিয়েট ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জাপান। জাপান এত শক্তিশালী ছিল যে পার্ল হারবারে তারা বিমান হামলা চালায়। এই ঘটনার পরেই আমেরিকা জাপানের হিরোসিমা এবং নাগাসিকি শহর দুইটির ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এই আণবিক বোমা নিক্ষেপের পরেই বিশ্ব যুদ্ধ থেমে যায়। সেদিন জার্মানি এবং জাপানও সামরিক দিক দিয়ে বিশ্ব শক্তি ছিলো। আজ অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। জার্মানি এবং জাপান অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে উত্থিত হয়েছে। কিন্তু তারা সামরিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার কোনো চেষ্টা করেনি। বরং সামরিক শক্তি হওয়ার জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো সেটি তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যয় করেছে। তাই এই দুটি দেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে রোল মডেল।
৫০ দশকের পর পৃথিবীতে নতুন দুইটি সামরিক শক্তির অভ্যুদয় ঘটেছে। এই দুটি শক্তি হলো গণচীন এবং ভারত। পুরাতন ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এদের তলে পড়ে গেছে। এখন পৃথিবীতে সবশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি হলো আমেরিকা, তার পর রাশিয়া (সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। রাশিয়া তার মধ্যে একটি।), তারপর গণচীন। তারপর ভারত। অর্থাৎ ভারত ৪র্থ বৃহত্তম সামরিক শক্তি।
কিছুক্ষণ আগে আমরা ভারতের সামরিক শক্তি সম্পর্কে কতগুলো তথ্য দিয়েছি। এখন চীনের সামরিক শক্তি সম্পর্কে কতগুলি তথ্য দেব। ভারতের মতই প্রতিটি সমরাস্ত্রের বিপরীতে চীনা সমরাস্ত্রের সংখ্যা দিচ্ছি। চীনের অস্ত্র ভা-ারে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা ২৫০। চীনের সৈন্য সংখ্যা ২২ লক্ষ ৫৫ হাজার। চীনের দুর পাল্লার দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উল্লেখযোগ্য। একটি হলো ডিএফ-৫। এটির রেঞ্জ বা অস্ত্র বহন ক্ষমতা হলো ১৫ হাজার কিলোমিটার। আরেকটি হলো ৩১-এ। এর রেঞ্জ বা বোমা বহন ক্ষমতা হলো ১২ হাজার কিলোমিটার। চীনের ট্যাংকের সংখ্যা ৯ হাজার ১০০। আর্মার্ড ফাইটিং যান ৪ হাজার ৮০০। বহুমুখী উৎক্ষেপণ রকেট সিস্টেমে ৩৭০টি রকেট। জঙ্গি বিমান ৩ হাজার ৩৮২। এ্যাওয়াক বিমান বা শত্রু পক্ষের রাডারকে ফাঁকি দিয়ে অনেক নিচু দিয়ে উড়ে যেতে সক্ষম বিমানের সংখ্যা ১২। জঙ্গি হেলিকপ্টার ৯২০। বিমানবাহী জাহাজ একটি। সাবমেরিন ৬৯। ডেষ্ট্রয়ার ২৭। ফ্রিগেট ৪৭।
ওপরে প্রদত্ত ভারত এবং চীনের সামরিক শক্তির তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, সামরিক শক্তিতে চীনের পাল্লা ভারি। তবে সামরিক শক্তি হিসাবে ভারতকেও হালকাভাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নাই।
সামরিক শক্তির হিসাব নিকাশ বাদ দিয়েও আমরা বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনা করতে পারি যে আদতেই ভারত এবং চীনের মধ্যে কোনো যুদ্ধ লাগবে কিনা। ইতো মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীন বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি এবং ভারত বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম সামরিক শক্তি। বিশ্বে এখন একটি মাত্র সামরিক পরাশক্তি রয়েছে। সেটি হলো আমেরিকা। সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া সামরিক পরাশক্তির মর্যাদা হারায়। তবে তারপর ২৬ বছর পার হয়ে গেছে। এই ২৬ বছরে রাশিয়া বিপুল সামরিক শক্তি অর্জন করেছে। তৎ সত্ত্বেও দেশটি আগের মতো পরাশক্তির মর্যাদা অর্জন করেছে বলে বিশ্বের মর্যাদাবান প্রতিরক্ষা জার্নালগুলো এখনও মনে করে না। চীনকে মিনি পরাশক্তি বলা হয়। ভারতকে আঞ্চলিক পরাশক্তি বলা হয়। এই পটভূমিতে বিচার করতে হবে যে তাদের মধ্যে যুদ্ধ লাগার আদতেই কোনো আশঙ্কা আছে কিনা?
॥তিন॥
প্রথমেই পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই যে, চীন ও ভারতের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ বাধার কোনো আশঙ্কা নাই। ‘সংগ্রামের’ পাঠকদের হয়তো মনে থাকার কথা যে, কিছুদিন আগে যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে, যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ আশঙ্কা করছিলেন যে, যে কোনো মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠবে, তখন আমি সংগ্রামেরই কলামে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলাম যে, আপাতত দুই দেশের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ বাধবে না। ঠিক সেই কথাটিরই পুনরাবৃত্তি করে বলছি যে, ভারত এবং চীনের মধ্যে অল-আউট ওয়ারের কোনো আশঙ্কা নেই। এখন প্রশ্ন হলো যে, তাদের মধ্যে লিমিটেড ওয়ার বা সীমাবদ্ধ যুদ্ধের কোনো আশঙ্কা আছে কিনা? এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য হলো এই যে, সীমাবদ্ধ যুদ্ধেরও কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ সীমাবদ্ধ যুদ্ধও অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি সীমা ছাড়িয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। আর সর্বাত্মক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার আগে উভয় দেশই বিবেচনা করবে যে তারা উভয়েই পরমাণু ক্ষমতা ধর দেশ। সুতারাং অলআউট ওয়ার হলে পরাজিত পক্ষ আণবিক বোমার ব্যবহার করতে পারে। এক পক্ষ এ্যাটম বোমা মারলে আরেক পক্ষও বসে থাকবে না। বিশ্বের তৃতীয় ও বৃহত্তম শক্তি যদি আণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে প্রথম ও দ্বিতীয় শক্তি কি দর্শকের গ্যালারিতে বসে বসে তামাশা দেখবে? তারা কি নিরপেক্ষ থাকবে? না নিরপক্ষে থাকতে পারবে? তারা যদি জড়িয়ে পড়ে তাহলে তো তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে। সুতরাং ডোকলাম নামক ভূটানের এক খন্ড জমিতে চীনের রাস্তা নির্মাণ নিয়ে সমগ্র বিশ্ব আণবিক যুদ্ধের অনল কুন্ডে নিক্ষিপ্ত হবে, এমন ধারণা করা সঠিক হবে বলে মনে করিনা।
এখন একটি দৃশ্য কল্পনা করুন, যেখানে চীনের বারংবার দাবি সত্ত্বেও ডোকলাম থেকে ভারত তার সৈন্য প্রত্যাহার করলো না, তখন চীনের পক্ষে করণীয় আর কি থাকবে? মুখ রক্ষার জন্য হলেও তো প্রথম গোলাটি তাকেই নিক্ষেপ করতে হবে। আর সে কারণেই ভারতে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা এব্যাপারে ঠোট সেলাই করে বসে আছেন। তারা কোনে গরম কথা বলছেন না। তারা উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা খোলা রাখছেন। সম্ভবত সে কারণে চীনের সংবাদ পত্র ছাড়া রাষ্ট্রীয় নেতারাও কিছু বলছেন না।
ভারত চীনের সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। আর সেটি হলো চড়াই, উৎরাই সঙ্কুল বনাঞ্চল ও পর্বত মালার অসমতল ক্ষেত্রে যুদ্ধ। তার ওপর আছে বৈরী প্রকৃতি যেটি বছরের ৫ থেকে ৬ মাস মাটি এবং পর্বতকে বরফ দিয়ে ঢেকে রাখে। সুতরাং প্রাথমিক ভাবে সেই যুদ্ধে চীনের প্রাধান্য থাকলেও সেটি হবে একটি দীর্ঘ স্থায়ী যুদ্ধ।
আরেকটি বিষয়। ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকে ভারতে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ নির্বাচন। অর্থাৎ আর পৌনে ২ বছরের মধ্যেই ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়ে যুদ্ধের কোনো ঝুঁকি নরেন্দ্র মোদি নেবেন না। কারণ সেই যুদ্ধে যে বিপুল ক্ষয় ক্ষতি হবে সেটি চীন পুষিয়ে উঠতে পারলেও ভারত পারবে না। যুদ্ধ যত কঠিন হোক, ভারত সেই যুদ্ধে কোনো অবস্থাতেই জয় লাভ করতে পারবে না। তেমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে নরেন্দ্র মোদি তার নিজের এবং দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকে ধ্বংস করবেন কেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ