ঢাকা, সোমবার 31 July 2017, ১৬ শ্রাবণ ১৪২8, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি ধরা হয় না অথবা রেহাই পায়

* উন্নয়ন প্রকল্পের টাকার শতকরা ৪০ ভাগের কাজ হয়, ৬০ ভাগের হদিস থাকে না -প্রধান বিচারপতি

* দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, যারা ক্ষমতায় আছে, তারাই দুর্নীতি করে -অর্থমন্ত্রী

সাদেকুর রহমান : দুর্নীতি নিয়ে প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক পিলে চমকানো বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সুধী সমাজসহ সর্বমহলে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। একই সাথে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষটির অস্তিত্ব ও ব্যাপকতার কথা জানা সত্ত্বেও দায়িত্বশীলরা কেন তা নির্মূলের ব্যাপারে উদ্যোগী হচ্ছেন না। ক্ষমতাবানরা যদি দুর্নীতির ‘নাটের গুরু’ হয়ে থাকেন, তাদের কেন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীর বদনাম কেন দেশের সৎ, ভালো ও নিরীহ রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, কৃষক-শ্রমিককে বইতে হবে। বহুমাত্রিক দুর্নীতির রাহুগ্রাসে যেমন জনজীবন বিষিয়ে উঠেছে, দুর্নীতিকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন এমন লোকের সংখ্যাও সমাজে নেহায়েৎ কম নয়। বক্তৃতাবাজি বাদ দিয়ে দাীয়ত্বশীলরা দুর্নীতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করছেন অর্থর্নীতিবিদ, সমাজচিন্তকসহ সকলেই। 

প্রসঙ্গত, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্পের একশ’ টাকার মধ্যে ৪০ টাকার কাজ হয় আর বাকি ৬০ টাকার কোনো হদিস থাকে না। গত ১৭ মে (বুধবার) দিবাগত রাতে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজে বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, জেলা পর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে বেশি র্দ্নুীতি করছে। এদের নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। 

গত বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হটলাইন ‘১০৬’-এর কার্যক্রম উদ্বোধনকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, দুর্নীতি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। যাদের ক্ষমতা আছে তারাই দুর্নীতি করে। যদি এতে সবাই অংশ না নেয় তাহলে দুর্নীতি হয় কীভাবে। পরোক্ষভাবে আমরা সবাই দুর্নীতিতে জড়িত। সবাই যদি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত না থাকত তাহলে দুর্নীতি হতো না। মন্ত্রী বলেন, খুব তাড়াতাড়ি এই দুর্নীতি শুধরে ফেলা সম্ভব নয়। তবে আশা করা যায়, আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে তা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। এ সময় মুহিত আরো বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির সংস্কৃতি ছিল না। এটা একটি গোপনীয়তার মধ্যে ছিল। একটু শরমের বিষয় ছিল। এখন আর তা নেই। অনেক সময় বাধ্য হয়ে আমাদের দুর্নীতিতে জড়িত হতে হয়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে অর্থমন্ত্রীর বৃহস্পতিবারের বক্তব্যটি পর্যবেক্ষকমহলের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে এ জন্য যে, তার আমলে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক তথা সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিসহ দেশে বড় বড় কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেও এর কোনোটায়ই তিনি সন্তোষজনক সমাধানে তো আসতে পারেননি, বরং হুঁশজ্ঞানহীন কথা বলে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। ২০১০ সালে শেয়ারাবাজারে কেলেঙ্কারির পর তিনি লুটেরাদের পক্ষাবলম্বন করে বলেছিলেন, ‘ শেয়ার মার্কেটে কোনো ইনভেস্টর নেই, সব জুয়াড়ি, ফটকাবাজ,’ ‘অ্যাই অ্যাম একদম ফেডাপ...।’ আর গণমাধ্যমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘অল আর রাবিশ।’ ২০১০ সালের ১৭ আগস্ট অর্থমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ট্রানজিটের বিরোধিতা যারা করে তারা ননসেন্স। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়ম সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি সম্পর্কে ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চার হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি বড় ঘটনা নয়।’ উল্টো হলমার্ককে আরো ঋণ দেয়ার পক্ষে ওকালতি করেন তিনি। এছাড়া ২০১৩ সালে দেশের গার্মেন্টস শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ নির্মম ট্র্যাজেডি রানা প্লাজা ধস সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি রানা প্লাজা ধসের পর ৩ মে দিল্লি সফর করে বলেন, সাভারের ভবন ধস ‘ তেমন কিছু নয়’। ২০১৫ সালে বেতন বৃদ্ধি ও পদমর্যাদার দাবিতে আন্দোলরত পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের কঠোর সমালোচনা করে মুহিত বলেন, ‘ দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জ্ঞানের অভাবে আন্দোলন করছে। তাঁদের এ কর্মবিরতির কোনো যৌক্তিকতা (জাস্টিফিকেশন) নেই। তারা জানেই না নতুন পে স্কেলে তাদের জন্য কী আছে, কী নেই। না জেনেই আন্দোলন করছে।’ এ রকম আরো অনেক বিতর্কিত মন্তব্যকারী অর্থমন্ত্রী যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তখন তা কৌতূহলের জন্ম দেয় বৈকি!

অর্থমন্ত্রীর দুর্নীতি বিষয়ক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ গণমাধ্যমকে বলেন, যাদের হাতে ক্ষমতা তারাই দুর্নীতি করে’- শুধু এমন বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজ কারা তা স্পষ্ট করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে হবে। তারা আরো বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়। এসব টাকার বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়ে যায়। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এছাড়া সরকারি বড় বড় প্রকল্পগুলোতে বড় দুর্নীতির শঙ্কা তো অর্থমন্ত্রী কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে পরিষ্কার করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গণমাধ্যমকে বলেন, যারা ক্ষমতাবান, তারা দুর্নীতিবাজ এটা অত্যন্ত একটি সরল সমীকরণ। সবক্ষেত্রে এটি সত্য নয়। সমাজে অনেক ক্ষমতাবান লোক আছেন, এমনকি মন্ত্রী পর্যায়েও অনেক আছেন, যারা দুর্নীতি করেন না। তাই ঢালাওভাবে সবাইকে দুর্নীতিবাজ বলা ঠিক হয়নি। এতে করে বড় দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া দুর্নীতি বন্ধ হোক, এটা তিনি (অর্থমন্ত্রী) নিজেও চান না। না হলে অর্থমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তিনি কোনো পদক্ষেপ নিলেন না কেন? তিনিও তো একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা মন্ত্রী। তার মানে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতিবাজদের প্রতি সহনশীল। এটাও কিন্তু এক ধরনের দুর্নীতি। এ সমীকরণে তিনি নিজেও একজন দুর্নীতিবাজ হয়ে যাচ্ছেন। তাই গণহারে সবাইকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দেয়ার বক্তব্য সমর্থন করি না। কারণ এ সমাজে বেশিরভাগ মানুষ সৎ। কিছু মানুষ অসৎ আছে। বাস্তবতা হল, দুর্নীতির কথা বললেও দুর্নীতি প্রতিহতের কোনো অঙ্গীকার নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম এ তসলিম বলেন, এ বক্তব্যের মাধ্যমে পুরো দেশকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করলেন অর্থমন্ত্রী। অথচ তিনি এখনও বহুল আলোচিত সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি ও বেসিক ব্যাংকে লুটপাটকারীদের পুরোপুরি বিচারের আওতায় আনতে পারেননি। তাদের বিরুদ্ধে জোরালা কোনো বক্তব্য বা অবস্থানও নেই তার। উল্টো সবাইকে গণহারে দুর্নীতিবাজ বলছেন। এতে সুনির্দিষ্ট এবং নানাভাবে প্রমাণিত শীর্ষ দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাবে। তার মতে, দুর্নীতি দমনে দেশে নতুন আইনের প্রয়োজন নেই। কারণ এগুলো এক ধরনের ‘আইওয়াশ’। দেশে প্রচলিত আইনের বাস্তবায়ন হয় না। পুরনো সব আইন কার্যকর করা হোক। তাহলে দুর্নীতিসহ সব অপকর্ম বন্ধ হয়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছুটা সত্যতা রয়েছে। কারণ যাদের হাতে ক্ষমতা নেই, তারা দুর্নীতি করতে পারে না। তবে প্রশ্ন হল, ক্ষমতা কাদের হাতে। এটি স্পষ্ট হলে উত্তর পাওয়াটা নিশ্চয় কঠিন হবে না। তিনি বলেন, আসলে রক্ষকরাই ভক্ষক। তাই সরকার যদি মেরুদন্ড শক্ত করে না দাঁড়ায় তাহলে সবই কথার কথা বলে প্রতীয়মাণ হবে। বাস্তবে কিছুই হবে না। আর তা দুর্নীতি দমনের নামে এক ধরনের তামাশা বলে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে আর্থিক খাতে বেশি লুটপাট হচ্ছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তরা এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। সাধারণ একজন ব্যবসায়ী সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণই পান না। কারণ সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ক্ষমতার জোর লাগে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, পত্রিকাতে প্রতিদিনই বড় দুর্নীতির খবর ছাপা হয়। এসব খবরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের ধরা হয় না। তিনি মনে করেন, পত্রিকার খবর ছাড়াও প্রতিদিনই নামে-বেনামে শত শত চিঠি যায় দুদকে (দুর্নীতি দমন কমিশন)। প্রশ্ন হল, সেগুলোর কতটা তদন্ত হয়।

দুর্নীতির সাথে বসবাস : দুর্নীতি জনজীবনে কী পরিমাণ বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হল-চ্ট্টগ্রাম এলাকায় কয়েক দফা পাহাড় ধসে প্রায় পৌণে দু’শ’ মানুষের মৃত্যু এবং ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ হাওরের হাজার কোটি টাকার ফসলহানি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, আয়কর অফিস কিংবা বিআরটিএর মতো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান- সর্বত্র দুর্নীতি অক্টোপাসের মতো বিরাজ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) অনেকেই ‘দুর্নীতির আঁতুড়ঘর’ আখ্যা দিয়ে থাকে। থানায় জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করতে গেলেও নাগরিকদের পয়সা গুণতে হচ্ছে। 

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও ভূমি সেবায় উদ্বেগজনক হারে দুর্নীতি বেড়েছে বলে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক জরিপে অংশ নেয়া উত্তরদাতাদের ৯৩ শতাংশের ধারণা, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ খাত বা প্রতিষ্ঠান হলো- রাজনৈতিক দল ও পুলিশ। আর ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন এর পরের খাতই হলো বিচার ব্যবস্থা। অন্যদিকে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি খাতে দুর্নীতি খুবই গুরুতর সমস্যা। এছাড়া চলতি অর্থবছরের বাজেটকেও ‘দুর্নীতি-বান্ধব’ বলছে টিআইবি। সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, সাধারণ মানুষের করের অর্থে দুর্নীতিগ্রস্ত, জালিয়াতিতে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন ব্যাংকিং খাতের অনৈতিক পুনর্মূলধনীকরণ, সীমিত মধ্যম ও ক্ষুদ্র আয়ের করদাতাদের ওপর বৈষম্যমূলক করারোপ, কালো টাকা বৈধতার অসাংবিধানিক সুযোগের ধারাবাহিকতা, মেগা প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাহীন বাজেট দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করবে। 

বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচক বা সিপিআই-২০১৬’ এ বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দু’ধাপ এগিয়ে এখন ১৫ নম্বরে হলেও দুর্নীতি ভয়াবহ পর্যায়েই রয়েছে। টিআই’র রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০১ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। এর ২০০৬ সালে তৃতীয়, ২০০৭ সালে সপ্তম ও ২০১৫ সালে ছিল ১৩ তম অবস্থানে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অবশ্য বলছে এবারের দুধাপ উন্নতির খুব একটা গুরুত্ব নেই কারণ তালিকায় যেমন দেশের সংখ্যা বেড়েছে আবার কিছু দেশ আগের চেয়ে খারাপ করেছে। সর্বশেষ ধারণা সূচকে তাই র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি হলেও বাংলাদেশ বরং যে অবস্থানে ছিল সেখানেই রয়েগেছে বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড: ইফতেখারুজ্জামান। আর টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশর স্কোর দুই বাড়ছে-কমছে এটা বড় বিষয় নয়। কারণ দুর্নীতির ক্ষেত্রে আমরা একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি। দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের কঠিন সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। 

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশে দুর্নীতির জয় হয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান। ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস (ডিএসসিই) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) যৌথ আয়োজনে গত ৬ মে রাজধানীর বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নীতি ও দুর্নীতির লড়াই উন্নয়নের পথে বড় বাধা। যেখানে নীতির জয় হয়, সেখানে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। আর দুর্নীতির জয় হলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আমার মনে হয় বাংলাদেশে দুর্নীতির জয় হয়েছে।

দুনীর্তি করেননা ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না এমন ব্যক্তি এবং টিআইবির মতো দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো বলছে, সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতি দমন যেকোনো সরকারের এক নম্বর এজেন্ডা হওয়া উচিত। কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা ও সরকারি কর্মচারিদের দফায় দফায় বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। এর জন্য ব্যক্তিগত নৈতিক মূল্যবোধের পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি। সরকার তো কখনো চাকরি ও নাগরিক সেবা পেতে কোনো রকম ঘুষ লেনদেন করাকে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য ঘোষণা করছে না। তাছাড়া কোনো দফতরের বড় কর্তা যদি দুর্নীতিবাজ হন তবে তার অধীনস্থরা কখনোই এর বিপরীত ¯্রােতে চলতে পারেন না বা চলার সাহস পান না। প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রীর মতো দায়ীত্বশীল ব্যক্তিরাও আন্তরিকভাবে নিজ নিজ দফতর বা ক্ষেত্রকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে চাইলে সেটা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

টাকা পাচারের কারণ ও দুর্নীতি : চলতি বছরের পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ১০ বছরে পাচার হয়েছে ৩ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা (৪ হাজার ৪৬১ কোটি ৫৩ হাজার মার্কিন ডলার), যা দেশের বর্তমান মোট জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। জিএফআই তাদের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ২০০৫-২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৪৯টি দেশের অর্থ পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, দুর্নীতি তথা আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারিও বেড়েছে যার চিত্র জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিদেশে অর্থ পাচার অনেক পুরনো। আগের পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রতি বছরই অর্থ পাচারের পরিমাণ বাড়ছে। এজন্য এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশ্বে সর্বাধিক নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশে: বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চারলেন রাস্তা নির্মাণে ব্যয় বেশি। এর পেছনে অন্যতম কারণ দুর্নীতি ও প্রতিযোগিতাহীন টেন্ডার বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গত ২০ জুন রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নিজস্ব কার্যালয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এ তথ্য জানিয়ে বলেন, দেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকলে এ ধরনের প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। আর যদি দুর্নীতি অনেক বেশি থাকে তাহলে এমনটি হয়। বাংলাদেশে উচ্চমূল্যে অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নে (মহাসড়ক নির্মাণ) ব্যয় অনেক বেশি। বাংলাদেশে চারলেন রাস্তার জন্য আড়াই মিলিয়ন থেকে প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কিলোমিটার প্রতি খরচ হচ্ছে। সেখানে ভারতে এই খরচ ১ দশমিক ১ থেকে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। চীনে হচ্ছে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। আর ইউরোপে হচ্ছে সাড়ে ৩ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রংপর-হাটিকুমরুল চারলেন প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, ঢাকা-সিলেট চারলেনে ৭ মিলিয়ন ডলার, ঢাকা-মাওয়ায় ১১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চারলেন প্রকল্পে আড়াই মিলিয়ন ডলার।

 মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতির দৃষ্টান্ত মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভার : পর্যবেক্ষকমহলের কাছে ত্রুটিপূর্ণ নকশা, দফায় দফায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বিদেশী অভিজ্ঞ ঠিকাদারের সাথে দেশীয় আনাড়ী ঠিকাদার নিয়োগ সহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সমার্থক হয়ে উঠেছে রাজধানীর মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভার প্রকল্পটি। সমালোচকরা বলছেন, বর্তমান সরকারের আমলে নেয়া মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি হওয়ার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এ প্রকল্পটি। প্রায় পাঁচ বছর ধরে ফ্রি স্টাইলে চলছে মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ। প্রকল্প এলাকায় ফ্লাইওভারটি একটি বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। পানিবদ্ধতা সৃষ্টি ছাড়াও গত মার্চ মাসে গার্ডার পড়ে একজন নিহত হয়। পঙ্গু হয় আরও দুজন। 

নগরবাসীর চলাচল সহজ ও যানজটমুক্ত করতে ২০১২ সালে শুরু হয় ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মালিবাগ-মগবাজার-শান্তিনগর-সাতরাস্তা ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ। সে সময় ফ্লাইওভারের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সরকারের সঙ্গে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি অনুযায়ী এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। তবে ঠিকাদার ও তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে তিন দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের। তৃতীয় দফা সময় বাড়িয়ে বলা হয়েছিল চলতি বছরের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। মেয়াদ বাড়ার পাশাপাশি মেগা এ প্রকল্পের ব্যয়ও প্রায় ৫৮ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে এক হাজার ২১৯ কোটি টাকা। 

গত বছর ৩০ জুন তেজগাঁও শিল্প এলাকার সাত রাস্তা থেকে রমনার হলিফ্যামিলি পর্যন্ত ফ্লাইওভারের ২ দশমিক ১১ কিলোমিটার অংশ চালু করা হয়। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলামটর থেকে মৌচাকমুখী অপর অংশও চালু করা হয়। ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও নাভানার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ‘সিমপেক্স নাভানা জেভি’ এবং চীনা প্রতিষ্ঠান দ্য নাম্বার ফোর মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন ওভারসিজ কোম্পানি (এমসিসিসি) ও এ দেশীয় অনভিজ্ঞ তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. এএসএম আমানউল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভার দেখলে বোঝা যায় উন্নয়নের নামে বছরের পর বছর কাজ চললেও সেখানে কোনো মনিটরিং করা হয়নি। শুরু থেকেই এই প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতি ছিল বলেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের খেয়াল খুশি মতো বেপরোয়াভাবে কাজ করেছে। তিনি বলেন, মৌচাক-মালিবাগ-মগবাজারসহ আশপাশের ৩০ লাখ মানুষকে বছরের পর বছর ধরে ভোগান্তিতে রেখেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকশন। এজন্য তাদেরকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে। 

পাউবো’র ৩ হাজার ৭ শ’ কোটি টাকার প্রকল্পে লুটপাট : পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তে দুর্নীতি যেন অঘোষিত নীতি। এবার হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ সংস্কার, মেরামত ও খনন কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেন। সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত ৩টি কমিটি তদন্ত শুরু করে। সম্প্রতি হাওর এলাকায় আকস্মীক বন্যায় দেশের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ৩ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৯০টি উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সকল প্রকল্পের দুর্নীতি ক্ষতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া সারাদেশে ১২৮টি বাঁধ সংস্কার প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি দেখতে দুদকের দুইটি টিম মাঠে কাজ শুরু করে। 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো মন্ত্রণালয়ের এক অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত ৫১টি প্রকল্পের মধ্যে বেশিরভাগ প্রকল্পের কাজ তিন বছরেও সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়নি। অপরদিকে সারাদেশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নদীভাঙন ঠেকাতে নদীর তীর সংরক্ষণের কাজে প্রতিবছর অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) দেয়া মোট বাজেটের ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় এ খাতে। বাঁধ ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম-দুর্নীতি দেখা দিয়েছে তা খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে হাওরের ২৮টি বাঁধ নির্মাণের জন্য ১১৬টি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত দুই বছরে ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে তিন প্রকৌশলীর সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ১১৬টি প্যাকেজের কাজে ঠিকাদাররা কোথাও ২০ ভাগের বেশি কাজ করেনি। অথচ গত দুই বছরে তারা ২৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীর ছোট বালিয়াতলী ও ফেরি ঘাট রক্ষা প্রকল্প, মুন্সীগঞ্জ শহররক্ষা প্রকল্প, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা শহর রক্ষা প্রকল্প, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর শহর রক্ষা প্রকল্প, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প (নতুন ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) প্রকল্প, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বামতীর ভাঙনরোধ এবং বেড়া উপজেলার নগরবাড়ী হইতে কাজীরহাট পর্যন্ত যমুনা নদীর ডানতীর ভাঙনরোধ প্রকল্প এবং কুষ্টিয়ার গড়াই নদী খননসহ শতাধিক প্রকল্পে চলছে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি।

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পেও দুর্নীতি : ঢাকা মহানগরীতে ১৭টি সরকারি হাইস্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটির নামকরণ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে। এমন প্রকল্পের কাজেও ভর করে অনিয়ম-দুর্নীতি। নির্মাণকাজ করা হয় এমন নি¤œমানের যে, কাজ শেষ হওয়ার পর পরই ভেঙে পড়ে সীমানাপ্রাচীর, এমনকি দরজা-জানালাও। খসে পড়ে পলেস্তরা। ভুল ডিজাইনে তৈরি হয়েছে স্কুলের প্রাচীরও। টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন হয় পদে পদে। আর এমন সব ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে এসেছে খোদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) তদন্ত প্রতিবেদনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৬টি কারিগরিসহ ৮৪টি প্রকল্প চালু আছে। প্রায় ৫ হাজার ৩৭১ কোটি টাকার এসব প্রকল্প মাউশি, ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন), ব্যানবেইস (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ স্কাউটস এবং ইইডি (শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর) বাস্তবায়ন করছে। জানা গেছে, অফিস খরচের নামে প্রকল্প থেকে অর্থ নেয়া সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম মাউশি। প্রকল্পগুলোর তদারককারী পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার স্টেশনারিসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে সংস্থাটির নিজস্ব বাজেট থেকে প্রতিমাসে আলাদা খরচ বরাদ্দ আছে। তা সত্ত্বেও এ শাখা খরচের নামে প্রত্যেক প্রকল্প থেকে বছরে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকে। প্রকল্পের বিবিধ খরচের খাত থেকে ওই টাকা আসে। এমন একটি প্রকল্পের নাম টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট-২ (টিকিউআই-২)। গেল অর্থবছরে এ প্রকল্প থেকে আনুষঙ্গিক/বিবিধ খাত থেকে ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা দেয়া হয়। ১১ জুন প্রকল্প দফতরে পাঠানো হিসাবের রিটার্ন পেপারে দেখা যায়, বরাদ্দকৃত উল্লিখিত অর্থের মধ্যে মাত্র ৬৫৫ টাকা অবশিষ্ট আছে। বাকি অর্থ স্টেশনারি, সাবান, স্যাভলন, ঝাড়–, বাল্ব, বালতি ইত্যাদি কিনে শেষ করা হয়।

 সৌরশক্তি প্রকল্পে লোপাট ৮৯ কোটি টাকা : প্রতিটি সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) প্রায় ২০ হাজার টাকা করে কেনা হয়েছিল। ৪৫ হাজার ২০৩টি কিনতে ব্যয় হয় ৮৮ কোটি ৮৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। নিম্নমানের হওয়ায় তার মধ্যে সাত হাজার ৪৯৪টি এসএইচএস অকেজো হয়ে স্টোরে পড়ে আছে। চাহিদার অতিরিক্ত ওই সোলার সিস্টেমগুলো কিনতে ব্যয় হয় সর্বমোট ১৮ কোটি ১২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। কিন্তু অকেজো এসএইচএসগুলোর বর্তমান বাজার মূল্য মাত্র ৯০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এভাবে প্রকল্পের ১৭ কোটি ২২ লাখ টাকা পানিতে গেছে। বাকি সোলার সিস্টেমগুলোও স্থাপনের ছয় মাসের মাথায় নষ্ট হয়। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীন পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে (পিডিবিএফ) সোলার হোম সিস্টেম কেনার নামে বিভিন্ন ধাপে এভাবেই প্রায় ৮৯ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। পিডিবিএফের সৌরশক্তি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটি মনে করে, পিডিবিএফের সৌরশক্তি প্রকল্প মৃতপ্রায়। ফাউন্ডেশনের স্বার্থেই অবিলম্বে প্রকল্পটি বন্ধ করা প্রয়োজন।

পিডিবিএফ সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালের আগস্টে সৌরশক্তি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। ওই বছরের ৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির ২৭তম বোর্ড সভায় সৌরশক্তি প্রকল্পের কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি সৌরশক্তি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে কমিটি করা হয়। কমিটি ১১ বছরের বেশি সময়ের এ প্রকল্পের ব্যয়বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, সর্বমোট ৪৫ হাজার ২০৩টি সোলার হোম সিস্টেম কেনার জন্য বিধি অনুযায়ী পিডিবিএফের পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে অনুমোদন নেয়া হয়নি। এ ছাড়া পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ (পিপিআর-২০০৮) অনুসরণ করা হয়নি। এতে প্রকল্পের ৮৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মালপত্র কেনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি মূল্য লেগেছে। বেশি মূল্যে মালপত্র কেনার কারণে প্রকল্পের প্রায় ২২ কোটি ২১ লাখ ২১ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সোলার মালপত্রের প্রকৃত চাহিদা অপেক্ষা অনেক বেশি সোলার সিস্টেম সরবরাহ করায় প্রায় ১৭ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ