ঢাকা, মঙ্গলবার 01 August 2017, ১৭ শ্রাবণ ১৪২8, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিনিয়োগ পরিবেশ নেই ভারসাম্যহীন অর্থনীতি

এইচ এম আকতার : সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা বেশি। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকাতে যেমনি বেড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি তেমনি বেড়েছে অর্থপাচারও। এতে করে দেশের অর্থনীতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। অবস্থার পরিবর্তন না হলে তারল্য সংকট দেখে দিবে ব্যাংকিং খাতে। যাতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

জানা গেছে, ব্যাংকে আমানতের সুদ হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসায় সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। এতে করে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা প্রত্যাহার করে সঞ্চয়পত্র ক্রয় করছে। অবস্থা নিয়ন্ত্রণে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেয়া হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আমানতের সুদ হার কম আর বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকার কারণে গত ১০ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। বলা হয়েছে, আমদানি-রফতানিতে আন্ডার ভয়েস এবং ওভার ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধানত এই অর্থ পাচার করা হয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. এম এম আকাশ বলেন, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দেশের ছয় লাখ কোটিরও বেশি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। এন্টি মানিলন্ডারিং আইন এবং দুদক, এনবিআর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক থাকা সত্ত্বে¡ও অর্থ পাচার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। চলতি প্রস্তাবিত ২০১৭-২০১৮ সালের বাজেটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারে অতিরিক্ত করারোপের কারণে অর্থ পাচার রেকর্ড ছাড়াতে পারে বলেও অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। 

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত (২০১৬-১৭) অর্থবছরের মে শেষে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছিল ৪৬ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। যেখানে তার আগের অর্থবছরের পুরো সময়ে নিট বিনিয়োগ ছিল ৩৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অচিরেই সঞ্চয়সুদ হার বিদ্যমান বাজার সুদহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হতে পারে। এর আগে অর্থমন্ত্রী সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানোর ঘোষনা দিলেও সমালোচনারমুখে তা আর কমানো হয়নি। 

দেশের ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ২৫টির আমানতের সুদহার বর্তমানে ৫ শতাংশের নিচে। আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় উদ্বেগজনক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। 

তিনি বলেন, আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সরকারের ঋণ গ্রহণের অতীতের সব রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। তবে এটি সরকারের ব্যয় বাড়াবে। কারণ জনগণকে অতিরিক্ত সুদ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনতে হচ্ছে। 

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকে আমানত না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনছে। আবার ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবাহ বাড়ছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। 

বিনিয়োগসঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানা হতে পারে এমন ঈঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবিরও। গত ২৬ জুলাই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গবর্নর বলেছিলেন, জাতীয় সঞ্চয় স্কীমের সঞ্চয়পত্রগুলোর বাজার সুদহারের সঙ্গে সংগতিহীন উচ্চ মুনাফা হার সরকারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ভার সৃষ্টি করবে। তাই সঞ্চয়পত্রের সুদ হার একটি বিধিবদ্ধ ও যৌক্তিক হারের মধ্যে আনার প্রচেষ্টা চলছে। 

সঞ্চয়পত্র মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেয়া যেতে পারে। অথবা আউটলেটগুলোতে ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের সংযুক্তি থাকতে পারে। যাতে ১ জনে অধিক কিনছেন কি না তা সনাক্ত করা সম্ভব হয়। 

বর্তমানে চার ধরণের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এসব সঞ্চয়পত্রে সর্বনিম্ন সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ শতাংশ সুদ দেয়া হয়। অন্যদিকে ব্যাংকে আমানতে মেয়াদ ভেদে ৪ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যায়। 

জানা গেছে, ব্যাংক আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্র কিনতে ব্যাংকগুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কেবল গত পাঁচ বছরেই ১ লাখ ৩১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার। চলতি জুলাই মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নেয়া ঋণে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। যদিও ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে ৯১ দিন মেয়াদি এবং ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ সুদে পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাংকঋণ নিতে পারত সরকার। সঞ্চয়পত্র থেকে চাহিদার অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ায় ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ তো নিচ্ছেই না, উল্টো ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আগের বকেয়া থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বিভিন্ন ব্যাংককে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। অথচ এক বছর আগে অর্থাৎ্ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। 

সঞ্চয়পত্র স্কিম থেকে সরকারের লক্ষ্যচ্যুতির কারণেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত। তিনি বলেন, সমাজের বিশেষ শ্রেণীর মানুষের উপকারের জন্য সঞ্চয়পত্র প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সব শ্রেণীর মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। দুর্নীতি ও কালো টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে দুর্নীতিবাজরা উপকৃত হচ্ছে। ফলে ঘাটতি বাজেট পূরণের নিয়ামক সঞ্চয়পত্রে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এটি রোধ করতে হলে সঞ্চয়পত্র কেনায় বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। এতে করে অর্থনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়বে দেশের বিনিয়োগে। এতে করে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হতে পাবে। প্রভাব পড়বে বিনিয়োগেও। 

সূত্রমতে, আমদানিকারকদের একটি বড় সিন্ডিকেট কয়েক বছর ধরেই আমদানির নামে অর্থ পাচার করছে। অল্প কিছু জরিমানা দিয়ে পারও পেয়ে যাচ্ছে তারা। অর্থ পাচারে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য বেশি দেখাচ্ছে, অন্যদিকে ঘোষণার সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণেও মিল থাকছে না। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও মংলা শুল্ক গোয়েন্দার কায়িক পরীক্ষায় মিলেছে খালি কনটেইনার। 

এভাবে দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে। জিএফআইয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু ২০১৩ সালেই অবৈধভাবে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে ৯৬৬ কোটি ডলারের বেশি। আর ২০১৪ সালে পরিমাণটা ১ হাজার কোটি ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন বা মিস ইনভয়েসিং ছাড়াও দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে জিএফআই। 

সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ট্রেড মিস প্রাইসিংয়ের মাধ্যমেই অর্থ পাচারের ঘটনা বেশি ঘটছে। মোট পাচারের ৮০ শতাংশই হচ্ছে ট্রেড মিস প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে। এছাড়া বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ট্রান্সফার মিস প্রাইসিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ পাচার হচ্ছে। এ বছরের প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য বিষয়ের মধ্যে আছে বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ সে দেশের এফডিআই ও ওডিআইয়ের তুলনায়ও বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ থাকলে এত বেশি পরিমানে অর্থ বিদেশের পাচার হওয়ার কথা নয়। একইভাবে যদি ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদ হার বেশি হতো তাহলেও পাচার কিছুটা কমতো। ঝুঁকিপূর্ণ খাতে মানুষ বিনিয়োগ করতো না। এতে করে দেশে যুবক আর ডেসটিনির মত হায় হায় কোম্পানির সৃষ্টি হতো না। 

একইভাবে সঞ্চয়পত্র বিসিয়োগও আশঙ্কাজনক হারে বাড়তো না। সরকার পাচার রোধে নানা আইন করলেও পাচারকারিদের সনাক্ত কিংবা বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এ কারণেই দেশের প্রতি নিয়ত পাচার বাড়ছে। বিনিয়োগের জন্য গ্যাস বিদ্যুৎ পানির দাবি জানিয়ে আসলেও তা না পাওয়ার কারণেই বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছে না উদ্যোক্তারা। তাই বিকল্প বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে নিরাপদ মনে করছে সঞ্চয়পত্র ক্রয়। আশঙ্কাজনক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়ার কারণে একদিকে জাতীয় ব্যয় বাড়ছে অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ