ঢাকা, মঙ্গলবার 01 August 2017, ১৭ শ্রাবণ ১৪২8, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কালানতানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন

দীর্ঘদিন পাঠকদের সামনে হাজির হতে পারিনি বলে দুঃখিত। প্রায় এক মাস ২০ দিন সৌদি আরব সফর শেষে অভ্যাগত অতিথি হিসাবে মালয়েশিয়ায় একটি সম্মেলনে যোগদান করে গত ২৪ জুলাই দেশে ফিরে এসেছি। রাত ৯:৫৫টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমার অবতরণের কথা ছিল। কিন্তু অবতরণ করেছি রাত প্রায় পৌণে বারোটায়। ঐদিন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের ঐ বিমানটি ছাড়তে আধা ঘণ্টা দেরি করেছিল। শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে এসে নির্ধারিত সময়ে বিমানটি নামতে পারেনি; রানওয়ে তখন পানিতে নিমজ্জিত ছিল। ফলে প্রায় পৌণে একঘণ্টা বিমানটি আকাশে চক্কর দেয়া অবস্থায় ছিল। তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির ধারা কমে যাবার পর বিমান নেমেছে এবং বাসায় আসার পথে খিলক্ষেত-ডুমনি-ইছাপুরা রাস্তার যে অবস্থা দেখেছি তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। পরদিন ঢাকা শহরের যে অবস্থা লক্ষ্য করেছি এবং মাসাধিক কালের যে অবস্থার কথা শুনেছি তা ভয়াবহ। জলাবদ্ধতায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তারা না পারছে প্রতিবাদ করতে, না পারছে প্রতিকারের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সাহায্য কামনা করতে। আমি ৫৫ বছর ধরে ঢাকা শহরে আছি, এর আগে কখনো এই ভয়াবহ অবস্থা দেখিনি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতায় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আমাদের ক্ষোভের একটি অংশ ছিল। এখন পাকিস্তানীরা নেই। ক্ষোভ আমরা কার বিরুদ্ধে প্রকাশ করবো? আমি মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কথা বলছিলাম। চলতি মাসের ২০ তারিখ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার কালানতান রাজ্য সরকার ও ঐ দেশের আমল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে মুসলিম দেশ ও নির্বাচিত দাওয়া প্রতিষ্ঠানসমূহের একটি আঞ্চলিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সম্মেলনের দু’টি অংশ ছিল। একটি ছিল এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চলের মুসলিম পন্ডিত ও বিদ্যানুরাগীদের ঐক্য ও কার্যক্রম সংক্রান্ত এবং অন্যটি ছিল এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনসমূহের দাওয়া ও তরবিয়ত সংক্রান্ত তৎপরতার অগ্রগতি এবং সমন্বয়ের সমস্যাবলী সংক্রান্ত। এতে বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, ফিলিস্তিন প্রভৃতিসহ বিশ্বের ৩৯ দেশের শতাধিক ইসলামী দলের ২৪৫ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। তিনদিনে তারা নির্ধারিত ইস্যুগুলোর উপর বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। খোলা অধিবেশনে কালানতানের কোটাভারু স্টেডিয়াম ও তার আশপাশ এলাকা মালয়েশিয়ান ইলামী পার্টির লাখ লাখ নেতা কর্মী এবং অভ্যাগত বিদেশী অতিথিদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য এখানে বসার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা ছিল। পুরা অনুষ্ঠান জুড়ে ছাত্র/ছাত্রী ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের আনাগোনা ছিল নজর কাড়ার মতো।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কালানতান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী উস্তাদ দাতো হাজী আহমদ বিন ইয়াকুব স্বাগত ভাষণ দেন। তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আন নাহলের ৯৬ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন যার অর্থ হচ্ছে, “তোমাদের কাছে যা আছে তা ফুরিয়ে যায় আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা অফুরন্ত। যারা সবর অবলম্বন করে আমরা তাদের আমলের চাইতেও শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তাদের দান করবো।” মুখ্যমন্ত্রী আহমদ বিন ইয়াকুব মুসলিম প-িত ও বিদ্যানুরাগী এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামী এনজিওসমূহের নেতা নেত্রী এবং কর্মীদের খেদমতে খালক-এর প্রতি মনোনিবেশ এবং একনিষ্ঠভাবে নিজ নিজ এলাকায় ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হবার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বব্যাপী ইহুদী-খৃস্টান ও নাস্তিক্যবাদী শক্তির ইসলাম বিরোধী তৎপরতা এবং বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ বিভিন্নমুখী নির্যাতন চালানোর কথা উল্লেখ করে মুসলমানদের শুধু পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন না করে ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম ভাইবোনদের রক্ষা করার আন্দোলনে সোচ্চার হবার পরামর্শ দেন।
মালয়েশিয়ান ইসলাম পার্টি (Pas)-এর মুর্শিদে আম এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর মুসলিম স্কলারস এর ডেপুটি চীফ দাতো সেরি তুরান গুরু হাজী আবদুল হাদী আওয়াং এশীয় অঞ্চলে ঐক্যবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম দেশসমূহের ইসলামী দল ও আন্দোলনসমূহ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করবে। তিনি এমনকি মুসলিম দেশসমূহের সেক্যুলার সরকার ও দলগুলো কর্তৃক ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের নিন্দা জানান এবং আন্দোলন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ঐক্যের আহ্বান জানান। তার মতে মুসলিম উম্মাহ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে তাহলে বৈরী শক্তিসমূহ ইসলামের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এক্ষেত্রে তিনি আলেম-ওলামাদের ঐক্যের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেন যাতে করে সাধারণ মুসলমানরা তাদের রোলমডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
সেমিনার, ওয়ার্কসপ ও মুক্ত অধিবেশনের স্টাইলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি সকলের জন্যই ছিল আকর্ষণীয়। ষোলটি অধিবেশনে বিভক্ত এই সম্মেলনে মালয়েশিয়ান ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা ছাড়াও তুরস্কের সাদাত পার্টির প্রধান তেমেল কারামুল্লাহ ওগলু, পাকিস্তানের জনাব আবদুল গাফফার আজীজ, তাজিকিস্তানের জনাব মহিউদ্দিন কাবিরী, পূর্বতিমুরের নাসিরুদ্দীন সোলাইমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এতে Global Challenges and the Quties of Muslim Ummah এবং Dawa Activities in Bangladesh : Progress and Potentialities শীর্ষক দুটি বিষয় আমার জন্যও নির্ধারিত ছিল এবং আমি যথাসাধ্য বিষয় দুটো উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। সমাপ্তি অধিবেশনে খ্যাতনামা মুসলিম দায়ী জাকির নায়েকের বক্তব্য পেশ করার কথা ছিল। কিন্তু অনিবার্য কারণে তার পরিবর্তে তার একজন প্রতিনিধি এতে বক্তব্য রাখেন।
সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে এশীয় অঞ্চলে ইসলামী দাওয়া ও তরবিয়তি তৎপরতার সমন্বয় ও তার সমস্যাবলী চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন এবং তাকে কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস এর ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে কালানতান রাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান, ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এশীয় অঞ্চলের ইসলামী চিন্তাবিদ ও উলেমাদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং এই লক্ষ্যে International Union for Muslim Scholars এর সাম্প্রতিক উদ্যোগকে সমর্থন প্রদান প্রভৃতি।
মালয়েশিয়ার কালানতান রাজ্য আমার কাছে একটি বিস্ময় বলে মনে হয়েছে। এটি একটি রোলমডেলও। গত ৩৭ বছর ধরে এখানে ইসলামিক পার্টির সরকার বলবৎ রয়েছে। প্রতি ৫ বছর পর পর সেখানে নির্বাচন হয় এবং প্রত্যেক বারই এই দলকে ক্ষমতায় বসায়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে কারোর কোনো অভিযোগ নেই। সামগ্রিকভাবে মালয়েশিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬৫ ভাগ হলেও কালানতানে শতকরা ৯১ ভাগ। এখানকার জনসাধারণ ভদ্র, ন¤্র এবং তাদের আচরণে ইসলামী আদব লক্ষ্যণীয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ