ঢাকা, মঙ্গলবার 01 August 2017, ১৭ শ্রাবণ ১৪২8, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আমার মা মাসুদা খানম

অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক : ১৮ শাওয়াল ১৪৩৮ হি: ১৩ জুলাই ২০১৭, ২৯ আষাঢ় ১৪২৪ ব: ছোট বোন খন্দকার জাহানারা রেনু মার শিয়রে বসে আল-কুরআন তেলাওয়াত করছিল, মেজ ভাইজান খন্দকার আব্দুল খালেক পাশে বসে দোয়া দরুদ পড়ছিলেন, এমন সময় পাশের মসজিদ থেকে সালাতুল মাগরিবের মধুর অথচ সকরুণ সুর ভেসে এলো। মা চোখ বুজলেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন ভেবে মেজো ভাইজান নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে ছুটে গেলেন কিন্তু মার সে ঘুম আর ভাংলো না। এদিকে আমিও টাঙ্গাইল দেওলা গোরস্থান জামে মসজিদ থেকে নামাজ আদায় শেষে বাসায় ফিরে জানতে পারলাম এই মাত্র মা আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দিয়ে এ নশ্বর মায়া জগৎ ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে পরলোকে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শুনে শোকে একেবারে পাথর হয়ে গেলাম। সেদিন আমি ও আমার স্ত্রী শাওয়াল মাসের নফল রোজা রেখেছিলাম। শুধু এক গ্লাস শরবত পান করে ইফতার করেছি। সেজ বউ মা কেয়া বার বার খাবার অনুরোধ করছিল কিন্তু ক্ষুধা কোথায় পালিয়ে গেছে ওকে বুঝাতে পারছিলাম না।
পরদিন বৃহস্পতিবার, মার পূর্ব অসিয়াত মতো আমাকেই তাঁর জানাজায় ইমামতি করতে হলো। কঠিন কবর দেশে মহান আল্লাহ্র নামে, রাসূল (সাঃ) এর দলে মাকে সপে দিলাম সকলে মিলে। সমবেত কন্ঠে আমরা উচ্চারণ করলাম- বিস্মিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ্ কবরে নেমে মাকে শেষ বারের মতো স্পর্শ করার একান্ত ইচ্ছে ছিল আমার কিন্তু আমার আগেই সে সুযোগটা লুফে নিয়েছে আমার ছোট ভাই খন্দকার আব্দুল মতিন ও অন্যান্য স্বজনেরা। আমার পরম স্নেহময়ী মায়ের দেহের উপর বাঁশের ফালি আড়াআড়ি করে ঢেকে দিচ্ছিলাম আর গভীর আবেগ নিয়ে মহান রবের যিকির করছিলাম। তারপর মিন্হাখালাকনাকুম, ওয়া ফিহা নূয়্যিদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম-তা-রা-তান্ উখরা বলে ভাই বন্ধু আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী মিলে চিরদিনের জন্য মাটির নিচে রেখে এলাম নিষ্ঠুর ভাবে। সারা জীবন মা আমাকে কত আদর সোহাগ, কত স্নেহ-মমতা কত ত্যাগ কোরবানী করেছেন তার তুলনা হতে পারে না। সেসব বর্ণনার কোন ভাষা নেই। মাঝে মাঝে মার মুখেই তো তাঁর অকৃত্রিম জান্নাতি ভালবাসার ইতিহাস শুনেছি। আজ আমার বয়স ৬৩ বছর অতিক্রম করেছে এ দীর্ঘ সময় মার মধুমাখা মিষ্টি ভরা কথা শুনেছি পবিত্র হাতের পরশ অনুভব করে ধন্য হয়েছি। কোন দিন মা আমাকে মার পিট করেননি, গালমন্দ বা কটু কথা বলেছেন বলেও মনে পড়ে না। অথচ আমি মাকে যে কত জ্বালাতন করেছি তার হিসেব নেই। শিশু বয়সে আমি খুবই একগুয়ে আর জেদি ছিলাম। দুষ্টের শিরোমনি ছিলাম। আমি ছিলাম জমজ ভাইয়ের একজন। আমার জমজ ভাই ২/১ দিন জীবিত ছিল। মনে হয় মা তার শোক ভুলতে আমাকে ডবল মায়া করতেন। মা আমাকে অনেকদিন লালন-পালনের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়েছেন। জন্মের ৭/৮ দিন পর আমার চোখ ফুটেছিল আর সে কয়েকদিনই মার চোখ থেকে নান আশংকায় অঝোরে পানি পড়ছিল, মার খানা-পিনা বন্ধ ছিল। এরপর আবার আমি এক প্রকার বিশ্রী চর্মরোগে আক্রান্ত হই-, সাত বছর যাবত ভুগতে থাকি। এ সাতটি বছর আমার চাইতে মা  অনেক বেশি কষ্ট করেছেন।  আমার রোগ মুক্তির জন্য মা প্রায়ই নফল রোজা রাখতেন, নফল নামাজ পড়তেন এবং দান সাদকা করতেন। নবম-দশম শ্রেণি থেকে আমি ছাত্র রাজনীতি ও পরবর্তী সময় ইসলামী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। এ সময় আমি নানা সমস্যার শিকার হই। আমার সমস্যার কথা শুনলেই  মার ঘুম হারাম হয়ে যেত চিন্তা ভাবনায় মা অস্থির হয়ে নানা আমল শুরু করতেন। আমি যখন মাকে দেখতে গ্রামের  বাড়ি যেতাম মা আমার পছন্দের খাবার ব্যবস্থা করতে পাগলপারা হতেন। মা রোগে শোকে বার্ধক্যে জর্জরিত হয়ে যখন বিছানায় পড়ে গেলেন তখন থেকে আমি তাঁর পছন্দের খাবার ব্যবস্থা করে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম। মার স্বভাব ছিল কারো সামনে তিনি খেতে চাইতেন না, লজ্জা পেতেন। আমি যখন মার কাছে গিয়েছি বারবার অনুরোধ করে নিজ হাতে মার মুখে খাবার তুলে দিয়েছি। ২/৪ চামিচ খেয়েই  তিনি আমাকে খেতে বাধ্য করতেন। নতুন জামা-কাপড় মা খুব পছন্দ করতেন কিন্তু ব্যবহার করতেন কম সবকিছু বাস্কবন্দী  করে রাখতেন, আবার সুযোগ পেলেই পুত্রবধূ- মেয়ে-নাতনী ও গরীব মহিলাদের দান করে খুব আনন্দ পেতেন। মাকে টাকা-পয়সা জোর করে দিতে হতো। বলতেন তোমার কতো প্রয়োজন! আমি টাকা পয়সা দিয়ে কী করবো?
মা খুব সুন্দরী ছিলেন, উচা-লম্বা, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং, সুন্দর স্বাস্থ্য, মাথা ভরা লম্বা-ঘন-কালো চুল, ডাগর ডাগর চোখ, মায়াবী মুখ মন্ডল, সব মিলে দারুণ আর্কষণীয়। মা অনেক বার বলেছেন যখন তিনি বউ হয়ে বর্গাতে বাবার ঘরে এলেন তখন মাকে দেখে আমার ফুফু আম্মারা ঠাট্টা-তামাসা করে বলতে লাগলেন সাদা হাতি এসেছে। আমার ৬ ফুফুআম্মা মাকে প্রায়ই সাদা হাতী বলে ক্ষ্যাপাতেন। বাবার কোন সহোদর ভাই ছিল না। যারা আমাদের বাড়ি দেখাশুনা করতেন তাদেরকেই আমরা চাচা বলে ডাকতাম তারাও আমাদেরকে ভালবাসতেন। মার মৃত্যুর খবরে তাঁরাও খুব কেঁদেছেন।
মা বাবার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত চমৎকার। মা-বাবাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। একান্ত ভক্তি ভরে বাবার যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজ আদেশের অপেক্ষা না করেই করে দিতেন। অপর পক্ষে বাবা নিজ হাতে সবকাজ করতে পছন্দ করতেন মাকে বিরক্ত করতেন না।
একবার মা দুর্ঘটনার শিকার হন, ফলে তার একটি পা অপারেশন করতে হয়। এরপর থেকেই মার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। সর্বশেষ যখন মাকে সখীপুরে দেখতে যাই তখন মা একেবারে জরা-জীর্ণ-কাঙ্কাল সার হয়ে পড়েছেন, জ্ঞান বোধ কমে গেছে, স্মরণ শক্তি বিলুপ্ত হয়েছে, চোখের দৃষ্টি প্রায়ই নিভে গেছে, কণ্টস্বর অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে গেছে সহজে মা আমাকে চিনতে পারলেন না। আমি যখন মাকে কালেমা তাইয়্যেবা তালকিন দিচ্ছিলাম তখন তিনি আমাকে চিনে ফেলেন এবং হঠাৎ বলে ওঠেন তওবা, তওবা আমি আরবী ও বাংলায় তাকে তওবা পড়াই তিনি আমার ডান হাতখানা তাঁর দুর্বল কম্পিত হাত দ্বারা শক্ত করে চেপে ধরে রাখেন। এরপর অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে মা চোখ বুজলেন। অনেকক্ষণ পরে দেখি তিনি অপলক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাঁকিয়ে আছেন। বল্লাম মা কী দেখছেন? কোন জবাব পেলাম না। বিদায়ের সময় মার হাত ধরে ক্ষমা চাইলাম মা একটু হেসে মাথা নেড়ে তাঁর সম্মতি জানালেন, আমার মাথায় হাত বুলানোর চেষ্টা করলেন। কথা বলতে পারছিলেন না, তবু আমি ছালাম দিলাম, এবার তিনি অনুচ্চ স্বরে ওয়া আলাইকুম আস্সালাম বল্লেন- আমার হৃদয়টা যেন দোয়ায় ভরে গেল। সেই বিদায়ই শেষ বিদায়।
মা জীবনের শেষ দিনগুলো আমার একমাত্র বোন খন্দকার জাহানারা রেণুর কাছে কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। রেনু দিনরাত মার সেবা যত্ন করে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বোনের সাথে সখীপুরে বসবাসরত আমার ভাইয়ের স্ত্রীরা, ভাইয়েরা ও তাদের সন্তানেরা সেবা দানে সদা তৎপর ছিল। এত সেবা যত্নের পরও মার তৃপ্তি ছিল না, মা বার বার বাড়ি যাব বলে তাদেরকে বিরক্ত করতেন। আমাদের বর্গা গ্রামের বাড়িটি মার নিজ হাতে গড়া ছিল, ওখানে মার অনেক স্মৃতি ছিল- সেই বাড়ি মা কখনও ভুলতেন না, কোন স্থানে গিয়ে মার মন বসতো না, আল্লাহ্র ইবাদত-বন্দেগী থেকে মুক্ত হলেই তিনি বাড়ি যাব-বাড়ি যাব, বাড়িতে আমার অনেক কাজ, বলতে থাকতেন।
১৪ জুলাই ২০১৭ সকাল ১০ টার দিকে মা বাড়ি এলেন সাদা কফিন পড়ে খাটিয়ায় চড়ে। নীরব নিথর দেহ। দলে দলে পাড়া প্রতিবেশী মার ভক্তেরা চোখের জলে সিক্ত হয়ে ছুটে এলেন মাকে এক নজর দেখতে তাদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যেতে লাগল। আমার ফুফাতো ভাই মৌঃ বদরউদ-দোজা- উপস্থিত সকলকে নিয়ে মহান আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলে আকুল ব্যাকুল হয়ে মার ও সকলের পাপ মুক্তি ও জান্নাতুল ফেরদাউস পাওয়ার প্রার্থনা করলেন। তারপর মা আসল বাড়ির দিকে যাত্রা করলেন। মার এ যাত্রা শুভ হোক সফল হোক। জান্নাতে যেন আবার মায়ের পাশে একত্র হতে পারি- রাব্বির হাম্হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সগিরা। আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ