ঢাকা, মঙ্গলবার 01 August 2017, ১৭ শ্রাবণ ১৪২8, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভাইরাল হেপাটাইটিস

অধ্যাপক ডা. জিএম ফারুক : মি. এক্স বিদেশযাত্রী। মেডিক্যাল চেকআপ করাতে যেয়ে জানলেন, তার হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ। তার বিদেশ যাত্রা নিষিদ্ধ। অনেক আশা-আকাক্সক্ষার সমাপ্তি ঘটে এভাবেই। হ্যাঁ, অত্যন্ত বিপজ্জনক এক সংক্রামক রোগ হেপাটাইটিস ‘বি’, যা হয়ে থাকে ভাইরাস থেকে। ক্ষতি করে লিভার বা যকৃতের। হেপাটাইটিস ‘বি’ একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে সংক্রমিত হয়। ভাইরাস-সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত, লালা, যোনিপথের রস ও বীর্য অন্য ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করলে রোগ সংক্রমণ ঘটে। একজনের দেহ থেকে অন্যের দেহে সহজে সংক্রামিত হয় বিশেষভাবে যৌনসঙ্গমের সময়। এ জন্য হেপাটাইটিস ‘বি’ একটি যৌনসংক্রামক রোগ হিসেবে পরিচিত।
পুরুষ সমকামীদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। এ ছাড়াও ভাইরাস-সংক্রামিত মায়ের গর্ভাবস্থা এবং প্রসবের সময় শিশু ‘বি’ ভাইরাস-সংক্রমণের শিকার হয়। বহুগামী নারী-পুরুষের মধ্যেও ‘বি’ ভাইরাস-সংক্রমণ দেখা যায়। সংক্রামিত ব্যক্তির ব্যবহৃত রেজর, টুথব্রাশ ইত্যাদি দ্বারাও এ ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে। বর্তমানের যৌনসংক্রামিত মারাত্মক মরণব্যাধি এইডস থেকেও এটি ৫০-১০০ গুণ বেশি সংক্রামক।
ভাইরাসটি দেহে ঢোকার ছয় মাস পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ করে থাকে। প্রথমে ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন- জ্বর, শরীর ব্যথা, শীতভাব ও ক্ষুধামন্দা। পরবর্তীকালে দেখা দেয় বমিভাব, বমি, কালচে প্র¯্রাব, পেট ব্যথা ও জন্ডিস। কারো কারো চর্মে উদ্ভেদ, গিরায় গিরায় ব্যথা বা আর্থ্রাইটিস দেখা দিতে পারে। অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। একিউট অবস্থায় রোগযন্ত্রণা খুব বেশি হতে পারে, এমনকি মৃত্যু ঘটতে পারে। ক্রনিক অবস্থায় রোগ দীর্ঘায়িত হয়ে পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে দেখা যায়। বর্তমানে লিভার বা যকৃত ক্যান্সারের অন্যতম কারণ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস।
হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর বিশ্বের ছয় লাখ ৮৬ হাজার লোক মারা যায়। বর্তমানে আফ্রিকা ও এশিয়ায় এর প্রাদুর্ভাব বেশি। তাইওয়ানে এর প্রাদুর্ভাব কম। বিশ্ব সমীক্ষায় দেখা যায়, নবজাতক শিশুরা সবচেয়ে বেশি সংক্রামিত হয়, ৮০-৯০ শতাংশ। শিশুদের মধ্যে এর হার ৩০-৫০ শতাংশ। আর যুবকদের মধ্যে সংক্রমণ হার ২০-৩০ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করে। ১৯৮০ সালে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে এ ভাইরাস চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়। ১৯৭০ সালে ভাইরাসটি সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। অন্য একটি তথ্যে দেখা যায়, ১৯৬৬ সালে ভাইরাসটি চিহ্নিত হয়। ১৯৮৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এর ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংখ্যা পাঁচটি- ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই’। এর মধ্যে ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস যকৃত ক্যান্সারের জন্য দায়ী।
হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাস দ্বারাও যকৃত সংক্রমিত হয়। এটি মূলত আরএনএ ভাইরাস। সংক্রমিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে বা সংক্রমিত মানুষের সাথে সরাসরি সংস্পর্শে ঘটে সংক্রমণ। ঘনবসতি, বস্তি বা ভিড়ভাট্টায়, যেখানে অস্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানকার মল দ্বারা সংক্রমিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে মুখপথে ভাইরাসটি শরীরে ঢোকে। সুপ্ত অবস্থায় থাকে দুই থেকে চার সপ্তাহ। তারপর জ্বর, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব, বমি ও জন্ডিস দেখা দেয়। দুই থেকে চার সপ্তাহে নিরাময় হয়। এটি সম্পূর্ণ একিউট রোগ। সাধারণত বর্ষাকালে বেশি হয়।
হেপাটাইটিস ‘এ’ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন রয়েছে। এ ভাইরাস প্রতিরোধে প্রয়োজন নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর মল ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।
হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাস সংক্রমিত মানুষের সংখ্যাও অনেক। এক হিসাবে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর তিন লাখ ৫০ হাজারের বেশি লোক মারা যায় হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত হয়ে। সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্যের মধ্যমে এর সংক্রমণ ঘটে থাকে। যৌন মিলনেও এর সংক্রমণ ঘটতে পারে। হেপাটাইটিস ‘সি’ যকৃত ক্যান্সার ঘটাতে পারে। এর জন্য কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। নিরাপদ রক্ত গ্রহণ ও নিরাপদ যৌন মিলন এর প্রতিরোধ করতে পারে।
হেপাটাইটিস ‘ডি’ ভাইরাস সংক্রমণ ঘটায় হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত ব্যক্তিদের। হেপাটাইটিস ‘বি’ থাকলেই কেবল ‘ডি’ ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাতে পারে। রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্য ও যৌন মিলনের মাধ্যমে এর সংক্রমণ ঘটে থাকে।
হেপাটাইটিস ‘ই’ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। প্রতি বছর দুই কোটি লোক পৃথিবীজুড়ে হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। ৭০ হাজারের বেশি লোক ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। হেপাটাইটিস ‘ই’ সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। কখনো তা যকৃতকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।
একমাত্র চীন এর ভ্যাকসিন ব্যবহার করে। বিশ্বব্যাপী এখনো এর প্রাপ্তি সহজ নয়। মল দ্বারা দূষিত পানি পানে এর সংক্রমণ ঘটে থাকে। শেলফিস খেয়েও অনেকে এর দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন-ব্যবস্থা এ ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে।
হেপাটাইটিস ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। বিজ্ঞ চিকিৎসক তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দ্বারা রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা করে থাকেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ‘বি’ ভাইরাস ও ‘সি’ ভাইরাসের জন্য কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা এখনো উদ্ভাবিত হয়নি। পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় এখন চিকিৎসা পরিচালিত হচ্ছে। আধুনিক এলোপ্যাথি চিকিৎসায় নিশ্চিত ব্যবস্থা না থাকলেও এর ব্যয়বহুল চিকিৎসা চলছে। অন্য দিকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়ও এর নিশ্চিত কোনো গবেষণা নেই। অথচ অনেকে এসব রোগীর চিকিৎসা করার দাবি করছেন। বাণিজ্যিক প্রলোভনে অনেক রোগী প্রতারিত হচ্ছেন। হারবাল ওষুধ দ্বারাও চিকিৎসার দাবি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো ক্লিনিক্যাল সমীক্ষা দেখা যায় না।
হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ নিয়েই চিন্তার বিষয়। কারণ ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস লিভারের ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। তাই এসব রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পুষ্টিব্যবস্থাপনা বাড়াতে হবে। সবুজ শাকসবজি ও ফলফলাদি বেশি বেশি খেতে হবে। বিশেষভাবে ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। সার্বিকভাবে চিকিৎসক তার রোগীকে ভালো রাখার চেষ্টা করবেন।
মনে রাখতে হবে, বি ভাইরাস ডিএনএ পজিটিভ না হলে চিকিৎসার কোন প্রয়োজন নাই। ডিএনএ পজিটিভ হলে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় ভাল থাকা যায়। একজন দক্ষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিতে হবে। কোনভাবেই মিথ্যা প্রচারনায় বিভ্রান্ত না হয়ে সঠিকভাবে চিকিৎসা গ্রহণে রোগীরা ভাল থাকতে পারে।
# উত্তরদাতা : নির্বাহী পরিচালিক বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যান্সার সোসাইটি।
প্রশ্ন পাঠাতে এসএমএস করুন : ০১৭৪৭১২৯৫৪৭
ফেসবুক : wwwfacebook.com/drgmfaronq

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ