ঢাকা, বৃহস্পতিবার 03 August 2017, ১৯ শ্রাবণ ১৪২8, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৫৭ ধারার মামলায় জামিন পেলেন খুলনার সাংবাদিক আব্দুল লতিফ

 

খুলনা অফিস : তথ্য ও প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার মামলায় খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রবাহের ডুমুরিয়া প্রতিনিধি আব্দুল লতিফ মোড়লের অন্তবর্তীকালীন জামিন দেয়া হয়েছে। খুলনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত ‘খ’ অঞ্চলের বিচারক নুসরাত জাবিন শুনানি শেষে বুধবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তার এ জামিন মঞ্জুর আদেশ দেন। সাংবাদিক আব্দুল লতিফের পক্ষে তার আইনজীবী ১০ হাজার টাকার বন্ড জমা দেন আদালতে। আদেশে বলা হয়, এ মামলার চার্জশিট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত তার জামিন বহাল থাকবে। ৩১ জুলাই রাত আড়াইটার দিকে তাকে ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের বাসা থেকে থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। আর মঙ্গলবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

সাংবাদিক আব্দুল লতিফের পক্ষের আইনজীবী মতিয়ার রহমান মোল্লা বলেন, বুধবার আব্দুল লতিফকে আদালতে হাজির করা হয়নি। তার অনুপস্থিতিতে শুনানির শেষে জামিন আদেশ নেয়া হয়েছে। এ আদেশের কপি কারাগারে যাওয়ার পরই তিনি মুক্ত হবেন।

এদিকে বুধবার সকালে ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের দক্ষিু ডুমুরিয়ার ঝিলেরডাঙ্গা খাঁ পাড়ার বাসিন্দা জুলফিকারের বাড়িতে গেলে তার ভাইজি আফসানার সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘জ্যান্ত ছাগলের চেয়ে মরা ছাগলের কত শক্তি! জীবিত অবস্থায় ছাগলের জন্য ওষুধ পাওয়াই ছিল দায়। রোগাক্রান্ত ছোট্ট একটি ছাগল বাড়িতে আনার দিনই রাতে মরে গেল। জ্যান্ত ছাগল দেখতে প্রতিবেশিরাও আসেনি। চাচারও খোঁজ নেয়নি। মরার পর তা হলো আলোচিত খবর। মরা ছাগল ফেললাম পাশের এই খালে। পরদিন জানলাম, ওই ছাগল নিয়ে লিখে সাংবাদিক জেলে গেল।’ 

আফসানা মরা ছাগলের তুলে রাখা একটি ছবি দেখান। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ছাগল মরার এ খবর সাংবাদিকরে দিলো কে? ছাগল পাওয়ার খবরতো তারা দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বাড়ির এই বিলের পাশ দিয়ে যাওয়া ওই খালেই পরদিন সকালে ছাগলটি ফেলে দেয়া হয়। এর আগে ছাগল মরার খবর পেয়ে পশু অফিস থেকে লোকজন এসে দেখে যায়।’

ডুমুরিয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘রোগাক্রান্ত ছাগলটিকে এখান থেকেই ওষুধ খাইয়ে দেয়া হয়েছিল। ২৯ জুলাই রাতে সেটি মারা যায়। ৩০ জুলাই সকালে ভ্যাটেরেনারি চিকিৎসক সেখানে যান এবং মরা ছাগলটি দেখে আসেন। এরপর জুলফিকারের পরিবারের লোকজন ছাগলটিকে পাশের খালে ফেলে দেয়। যদিও ছাগলটিকে মাটি চাপা দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।’

ডুমুরিয়ার ভ্যানচালক আতিয়ার রহমান বলেন, ‘এক ছাগল নিয়ে এত বড় ঘটনা হতে পারে ভাবাই যায় না। বিশ্বজুড়েই আজ মরা ছাগল ও লতিফ সাংবাদিক নিয়ে আলোচনা!’

স্থানীয় বাসিন্দা মিল্টন শেখ বলেন, ‘ছাগল নিয়ে নিজেদের মধ্যে এমন কান্ড হওয়া অনুচিৎ।’ তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানান।

ডুমুরিয়ার সাংবাদিক এম এ এরশাদ বলেন, ‘লতিফের গ্রেফতার হওয়া উপজেলাবাসী মেনে নিতে পারছে না। লতিফের পক্ষে প্রতিবাদ ও নিন্দা কর্মসূচি পালনের প্রক্রিয়া চলছে। লতিফকে রাতে থানায় নেয়ার পর সকালে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে থানায় যান। কিন্তু পুলিশ সেখানে কলাপসিবল গেট আটকে রেখে সাক্ষাতে বাধা দেয়। নাস্তা পর্যন্ত করাতে দিতে চায়নি।’

বাদি সুব্রত ফৌজদার বলেন, ‘ছাগলের মৃত্যুতো বড় বিষয় নয়। ওই স্ট্যাটাসের সঙ্গে মন্ত্রীর একটি ছবি দেয়া হয়েছে। মৃত ছাগলের ছবি দেয়া যেত। ছাগলের মালিকের ছবি দেয়া যেত। কিন্তু মন্ত্রীর ছবি কেন? এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে আমি মামলা দায়ের করেছি।’

তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেছেন, ‘আমি ডুমুরিয়ায় ছাগল ও হাঁস মুরগি বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলাম। টোকেন হিসেবে একটি ছাগল বিতরণও করেছি। তবে যে ছাগলটি বিতরণ করেছি, সেই ছাগলটি মরে নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর এই ছাগল নিয়ে দেয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে আমার কোনও সম্পর্ক নাই। যিনি মামলা করেছেন তিনিও একজন সাংবাদিক।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি স্ট্যাটাসটি দেখিনি। খবরটিও দেখিনি। তাই আমার মানহানি হয়েছে কী হয় নাই, তা বলতে পারবো না। যে ক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করেছে তাকে জিজ্ঞেস করেন।’

বাদি আপনার সঙ্গে কথা বলার পর মামলা করেছেন, বাদীর এই দাবির জবাবে তিনি বলেন,‘ আমার সঙ্গে কথা বলে তিনি মামলা করেননি। আমার সঙ্গে এনিয়ে তার কোনও কথা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘পরে আমি ডুমুরিয়া থানার ওসির কাছ থেকে জেনেছি, ওই অনুষ্ঠানের কোনও ছবি না দিয়ে আমার একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে ছাগল মরার নিউজটি দেয়া হয়েছে। নিউজ করলে তো অনুষ্ঠানের ছবি দিয়ে নিউজ করবে। ইন্টেনশনালি হেয় করার জন্য এটা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা সাংবাদিক তাদেরও মানুষকে একটু মর্যাদা দিতে হবে। পরস্পরের মধ্যে আস্থা ও শ্রদ্ধা থাকতে হবে। আমরা আপনাদের থেকে ভিন্ন নই। আপনারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখেন, সমালোচনা করবেন তবেই না আমরা পারফেক্ট হবো।’

এ ঘটনা নিয়ে গতকাল খুলনা তথা সারাদেশব্যাপী ফেসবুক, টুইটার ও ম্যাসেঞ্জারে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। চলছে নানা প্রতিক্রিয়া। স্থানীয় আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। তারা এই মামলাটিকে কেন্দ্র করে নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই এই ঘটনায় মামলার বাদিকে অতি উৎসাহী বলে আখ্যায়িত করেছেন। এঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানান। সবমিলিয়ে প্রতিমন্ত্রী এই মামলাকে নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন।

‘আমার মুছে ফেলা পোস্ট সংরক্ষণ করে

কেউ মামলা করবে চিন্তাও করিনি’

‘প্রতিমন্ত্রীর সকালে বিতরণ করা ছাগল রাতে মৃত্যু’-ফেসবুকে এই পোস্ট দিয়ে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মামলায় গ্রেফতার খুলনার সংবাদিক আবদুল লতিফ মোড়ল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে খুলনা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এত ছোট একটি ঘটনা থেকে এত কিছু হবে বুঝতে পারিনি। বিতর্ক শুরুর পরই পোস্টটি মুছে ফেলেছিলাম। কেউ সেটা সংরক্ষণ করে মামলা করবে চিন্তাও করতে পারিনি।’ তার পক্ষে লেখালেখির জন্য লতিফ কারাগার থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ