ঢাকা, বৃহস্পতিবার 03 August 2017, ১৯ শ্রাবণ ১৪২8, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বায়ারের দেয়া শর্ত পূরণে ব্যর্থতায় হাতছাড়া হতে পারে ইইউ’র বাজার

 

এইচ এম আকতার : দেশের তৈরি পোশাক খাতে রানা প্লাজার ক্ষত এখনও শুকায়নি। ক্ষত শুকাতে বায়ারের দেয়া শর্ত পূরণ করতে পারেনি কারখানা মালিকরা। তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্ত পূরণে ব্যর্থতায় নতুন করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ইইউর বাজার হাতছাড়া হওয়ার। রানা প্লাজা ধসের পাঁচ বছর পরও অধিকাংশ কারখানা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। আর এ কারণে এক ধরনের অস্বস্তিতে রয়েছে বিদেশী ক্রেতারা। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ হারাতে পারে ইউরোপের বাজার, যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি কানাডাভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য গ্লোব এন্ড মেইলের’ এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ধস এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় শিল্প বিপর্যয়। ৮ তলা বিশিষ্ট ওই ভবন ধসে পড়ে এক হাজার একশ পোশাক শ্রমিক নিহত হয়। আহত হয় আরো আড়াই হাজার শ্রমিক। যাদের মধ্যে মারাত্মকভাবে আহত হয় অনেকে। বিশ্ববাসী বাংলাদেশের ওই দুর্ঘটনার জন্য বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সম্প্রতি ওই শিল্প বিপর্যয় আবার সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। কারণ ওই দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পরও কারখানাগুলোর মালিক ও সরকার শ্রমিকদের নিরাত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

রানা প্লাজার ওই দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন, কারখানাগুলো যদি শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে তাহলে তারা বাংলাদেশ থেকে কোনো পোশাক কিনবে না। এরপর শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুইটি চুক্তি করেছিল তারা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশে বিল্ডিং এন্ড ফায়ার সেফটির সাথে এ দুইটি চুক্তি করে।

ইউরোপ ও আমেরিকার দুই শতাধিক পোশাক আমদানিকারক কোম্পানির সমন্বয়ে করা ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, যেসব কারখানা বিদেশে পোশাক সরবরাহ করে থাকে সেগুলোর কর্মপরিবেশ, ভবন কাঠামো ও অগ্নি নিরাপত্তাসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্বেও চুক্তি দুইটির অনেক কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ রপ্তানিকারক কারখানায় শ্রমিকদের কাজ করার পরিবেশ এখনো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বিষয় নিশ্চিত না করে কারখানা মালিক ও সরকার শ্রমিক সংগঠনের নেতা কর্মীদের আটক ও তাদের হয়রানি করছে।

চুক্তিতে সই করা ইউরোপ ও আমেরিকার ওই দুইশ কোম্পানি বলেছিল, যে কারখানাগুলো এই নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় আসবে না তারা এসব কোম্পানির কাছে তাদের পোশাক বিক্রি করতে পারবেনা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিল্ডিংয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায় এখনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। তাই ক্রেতারা এখনো অস্বস্তিতে রয়েছে।

এ কারণে অ্যাকর্ডে স্বাক্ষরকারীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কারখানাগুলোর পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়নি। তাই পরিদর্শনের জন্য আরো তিন বছর সময় দরকার।

গত বছর পোশাক শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল উল্লেখ করে কানাডার সংবাদ মাধ্যম দ্য গ্লোব এন্ড মেইলের ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত বছর কয়েক ডজন কর্মীকে রফতানি করা হয়। শ্রমিকদের যে স্বাধীনতা রয়েছে সে বিষয়ে কারখানাগুলোর ধারণা থাকতে হবে। আর শ্রমিকদের এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে অ্যাকর্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়,এখনও বাংলাদেশে কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারে না। আধিকারের কথা বললে তাদের গুম খুন হতে হয়। তারা বছরের পর বছর অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।

শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার বিচার এখনও হয়নি। এখনও কয়েকজন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। রানা প্লাজায় আহতরা তাদের ক্ষতিপূরণ পায়নি। তারা এখনও চিকিৎসা বঞ্চিত রয়েছে। তাদের কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও তা এখনও সম্পন্ন করতে পারেনি বাংলাদেশ।

তবে ক্রেতাদের অন্য জোট অ্যালায়েন্স বলেছে যে, কারখানা পরিদর্শন ও প্রতিকার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে তাদের আর কোন পরিকল্পনা নেই।

অ্যাকার্ডে রব ওয়েজ বলেন, বাংলাদেশে অ্যাকর্ডের অধীনে ১ হাজার ৮৪৯টি কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৫৩৪টি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে, বাকি আছে আরো ৩১৫টি কারখানা। এগুলোর মধ্যে ৪শ’টির বেশি কারখানায় ৯০ শতাংশের বেশি সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। সংস্কার কাজ যেন পুরোপুরি শেষ করা যায় সে বিষয়ে আমাদের অবশ্যই তৎপর থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ৬৫ শতাংশ কারখানা শতভাগ কাজ শেষ করেছে। ৬৯৯টি কারখানা বিদ্যুৎ নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্কার করেছে, ২০৯টি কারখানা অবকাঠামোগত সংস্কার শেষ করেছে আর অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে ৯২টি কারখানা। এছাড়া সব ধরনের সংস্কারকাজ শেষ করার সাফল্য অর্জন করেছে সাতটি কারখানা।

রব ওয়েজ আরো বলেন, আমরা এখনো দেখছি অনেক কারখানায় বড় ধরনের সংস্কার কাজ শেষ হয়নি। যেসব পোশাক কারখানার সংস্কার ব্যয় নির্বাহ করার সক্ষমতা নেই তাদের সংস্কার কাজে এখন থেকে অ্যাকর্ড অর্থ সহায়তা দেবে।

২০১৮ সালের জুন মাসে বাংলাদেশে অ্যাকর্ডের কার্যক্রমের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মেয়াদ বাড়াতে সংস্থাটি ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা এতে রাজি নয়।

এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় কমছে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ব্রেক্সিট, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন, ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী টাকা, ইউরোর অবমূল্যায়ন ও পোশাকের মূল্য কমে যাওয়ায় পোশাক রফতানি কমে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে ডলারের বিপরীতে টাকাকে অবমূল্যায়িত করাসহ প্রণোদনার দাবি জানান তিনি।

পোশাক রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে এলেও সম্ভাবনাময় আরো অনেক খাত আছে, যেগুলোর রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, নানা অনিশ্চয়তার কারণে গত অর্থবছরের রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। পোশাকনির্ভর রফতানি খাত হওয়ায় প্রবৃদ্ধির এ অবস্থা। পোশাক খাতে আরো হাই ভ্যালু পণ্য তৈরিসহ রফতানি খাতে আরো বৈচিত্র্য আনতে হবে। খুব দ্রুত বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের নীতিসহায়তাও প্রয়োজন।

রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয় জানিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুই ধরনের প্রভাবেই পোশাকসহ সার্বিক রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো বড় বাজারগুলোয় চাহিদার ঘাটতি যেমন এর কারণ, তেমনি ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়াও এজন্য দায়ী।

 তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, বৈশ্বিভাবেই রপ্তানি চিত্র খারাপ্। যেমন ২০১৬ সালে ভারতে রপ্তানি আয় কমেছে ২ শতাংশ। আর চীনে সাড়ে ৭ ও শ্রীলঙ্কায় ১ শতাংশ কমেছে। এর কারণ হচ্ছে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে চাহিদা কমেছে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ। এর আগেও ২০১৪ সালের তুলনায় ১৫ সালে চাহিদা কমেছিল ৮ শতাংশ।

তবে প্রতিযোগী কিছু দেশে রপ্তানি বেড়েছে। যেমন ভিয়েতনামে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এছাড়া কম্বোডিয়ায়ও বেড়েছে।

গেলো ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছে রপ্তানি আয়ে। সবশেষ অর্থবছরে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪শ ৮৩ কোটি ডলার। বছর ব্যবধানে যা বেড়েছে মাত্র দেড় শতাংশের কিছু বেশি। বৈদেশীক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাত রপ্তানি। যা গেলো অর্থবছরের শুরু থেকেই ছিল অস্বস্তির মধ্যে। মূলত পোশাক খাত নির্ভর আমাদের রফতানি আয় হওয়ার কারনেই রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পোশাক খাতে রফতানি আয় কম হওয়াতে ১৫ বছরের মধ্যে সব চেয়ে কম আয় হয়েছে।

মোট অঙ্ক ধরলে, আয় এসেছে তিন হাজার ৪শ ৮৩ কোটি ডলার। যা এর আগের অর্থবছরের চেয়ে মাত্র ৫৮ কোটি বা দেড় শতাংশের কিছু বেশি। অথচ, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭শ কোটি। অর্থাৎ, আয় কম হয়েছে প্রায় ছয় শতাংশ। কিন্তু কেনো? 

পোশাক খাতে যুক্তরাষ্ট্রে ৩% রফতানি কমে তা দাঁড়িয়েছেন, ৫ হাজার ৮৪৬ কোটি ডলার। একইভাবে যুক্তরাজ্যে রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এসময় রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ৫৬৯ কোটি ডলার। ইতিবাচক ছিল জার্মানি বাজারে। এসময় জার্মানিতে রফতানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আয় হয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি ডলার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ