ঢাকা, বৃহস্পতিবার 03 August 2017, ১৯ শ্রাবণ ১৪২8, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাধবদীতে অসাধু ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে পথশিশুরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে

মোঃ আল আমিন, মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা : অসাধু ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে মাধবদীর পথশিশুরা (টোকাই) নিজেরাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসাকে নিরাপদ করতে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে শহরসহ আশপাশের হাটবাজারগুলোতে পথশিশুদের নামানো হচ্ছে মাদক বিক্রিতে। এর ব্যাপকতা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে মাধবদীর সচেতন নাগরিক ও অভিভাবক মহল উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে রয়েছেন। এক তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পারিবারিক সমস্যা সহ নানা কারণে আয়ের আশায় অসহায় শিশুরা শিল্পাঞ্চলে আসছে বিভিন্ন কাজের খোঁজে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্রতা, পিতা মাতার বেকারত্ব, পিতা মাতার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, পিতা-মাতার মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদ, সংসার ত্যাগ, পিতা-মাতার বহু বিবাহ, শহরে অভিবাসন হওয়া, স্কুল থেকে অকালে ঝরে পড়া, পিতা-মাতার অসচেতনতা। শহরে মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে এদের অনেকেরই পরিচয় হয় পথশিশু (টোকাই) হিসেবে। আবার অনেকেই কম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিযুক্ত হয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। মাদক বহনকারী ও সেবনকারী হিসেবে মাধবদীতে অনেক শিশুই রয়েছে বলে জানা গেছে। মাদক ব্যবহারকারীরা মাদক বহনে নিরাপদ মনে করে এ সব পথশিশুদের ব্যবহার করে থাকে। গ্রাম পর্যায়ের এসব শিশুরা শিল্পাঞ্চল মাধবদীতে টেক্সটাইল পাওয়ারলুমে শ্রমিকের কাজ করা, ইটভাটার কাজে যাওয়া, নদীতে মাছ ধরা, কৃষি জমিতে কৃষকের (বদলী) কাজে যাওয়া, পিতা-মাতার কাজে সহায়তা করাসহ বিভিন্ন পরিশ্রমের কাজ করে আসছে। তবে আশঙ্কা হলো এখানকার ছোট মাধবদী আইসক্রীম ফ্যাক্টরী, শিতলাবাড়ী, আনন্দী, টাটা পাড়ার বৌবাজার, ফুলতলা, ভরিথপুর, বাসস্ট্যান্ড, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, দড়িপাড়া, আলগী, বিরামপুর, কালিবাড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় শতাধিক ভাঙ্গাড়ির দোকান রয়েছে আর এসব ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসাকে লাভবান করতে অবুঝ শিশুদের মাদক ব্যবহারে উৎসাহিত করে থাকে। কারণ হিসেবে জানা গেছে মাদকাসক্ত শিশুরা যে কোনো নোংরা জায়গা থেকে ভাঙ্গাড়ির মালামাল টোকাতে পারে। মাদক সেবনের ফলে তাদের নাকে দুর্গন্ধ কম লাগে। ফলে বেশি পরিমাণে ভাঙ্গাড়ি কুড়াতে পারে। মাধবদী শহরের ছোট মাধবদীর আইসক্রীম ফ্যাক্টরি এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী বলেন, ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ীরা তাদের দোকান ঘরে এ ধরণের ছেলেদেরকে রাতে থাকতেও দেয়। ড্যান্ডি নামক (এক ধরনের মাদক) এর জন্য পলিথিন এবং সলিউশন (আঠা) সরবরাহ করে থাকে। হাত-পা কেটে গেলে ব্যথা কম লাগে। আবার তাদের কুড়িয়ে আনা মালগুলো ওই মালিকের কাছে খুব কম পয়সায় দিয়ে থাকে। এ ধরনের শিশুরা ছোট খাট চুরি করতেও দ্বিধাবোধ করে না। প্রতিটি ভাঙ্গাড়ির দোকনে ৫/৭ জন শিশু থাকে। এ ধরনের শিশুর সংখ্যা মাধবদীতে দিন দিন বেড়েই চলেছে। তার দোকানে আগে দুইটা ছেলে ছিল। এখন আছে পাঁচটা। শহরের এক ভাঙ্গাড়ী দোকানের ১০/১২ বছরের এক পথ শিশু সে জানায়, তার মতো অনেক ছেলে এ এলাকায় আছে। যারা পুরিয়া (গাঁজা) বিক্রি করে। একশ’ টাকার গাঁজা কিনলে বিক্রি হয় তিনশ’ টাকায়। তবে মাঝে মাঝে ধরা পড়লে চালান (পুঁজি) শেষ হয়ে যায়। অন্তরালে তার মামা আছে, ধরা পড়লে ছাড়িয়ে আনে। মামার পুরিয়া/সবজি (গাঁজা), ট্যাবলেট (বাবা) (ইয়াবা), ডাল (ইঞ্চি) (ফেনসিডিল) সব ব্যবসা আছে। মামার নাম জানতে চাইলে নাম বলতে নিষেধ আছে বলে জানায় সে। এ এলাকায় আরো এক খালাও রয়েছে সেও এ কাজ করে। পুলিশ ধরলে মামারে ফোন করে জানাতে হয়। পরে মামাই সব ঠিক ঠাক করে নেয়। মাধবদী বাজার মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মাধবদী প্রেসক্লাবের সভাপতি আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন ভূইয়া বলেন, মাধবদীতে পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই সাথে বেড়ে যাচ্ছে শ্রমজীবী শিশু। এ ধরণের শিশুরাই সাধারণত মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে বা মার্কেটের পাশে এদেরকে প্রকাশ্যে সলিউশন (আঠা)’র নেশা করতে দেখা যায়। নেশাগ্রস্ত হওয়ার কারণে তারা ছোট খাট অপরাধ করছে। এভাবে আস্তে আস্তে বড় অপরাধের সাথে তারা জড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। তারপরও বলবো আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এদের রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট আবুল হাসনাত মাসুম বলেন, মাদক বিক্রি, পাচার ও মাদক ব্যবহারকারীদের উৎসাহিত বা সহযোগিতা করার জন্য দেশেরে প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের চোখকে ফাকি দিয়ে অপরাধমূলক কার্যটি বর্তমানে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাধবদীর মতো শিল্প শহরে এর ব্যাপকতা বিশেষ করে পথশিশুদের মাদকাসক্ত হওয়ার বিষয়টি চরম আকার ধারণ করেছে যা মোকাবিলায় প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপের প্রয়োজন। সর্বোপরী সচেতন মহলকে এ ব্যাপারে এখনি এগিয়ে আসতে হবে। মাধবদী থানার ওসি (তদন্ত) আবুল কালাম বলেন, মামলা ও অভিযোগের ভিত্তিত্বে মাদক দমনে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। তবে পথশিশুদের মাদক বহনের কাজে নিযুক্ত করা সংক্রান্ত কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। যদি এ ধরনের কোন মামলা বা তথ্য আমরা পাই তাহলে এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। যারা এ সব পথ শিশুদের মাদক বহন ও সেবনে উৎসাহিত করছে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাদক বিক্রেতারা যেন কোনো শিশুকে দিয়ে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা হবে। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শুনা গেলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ মাধবদীর আশেপাশে পরিলক্ষিত হয়না। বিভিন্ন এনজিও এ বিষয়ে কাজ করছে বলে শুনা গেলেও তাদেরকেও মাঠে কখনো দেখা যায়নি। এহেন পরিস্থিতে মাদকের এই ভয়াবহ ছোবল থেকে পথশিশু সহ শিল্পশহর মাধবদী ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার যুব সমাজকে রক্ষা করার জন্য মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহ প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ সহসাই বা অচিরেই শুরু হবে বলে এলাকার স্বচেতন মহল আশা করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ