ঢাকা, মঙ্গলবার 08 August 2017, ২৪ শ্রাবণ ১৪২8, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রায়ের কিছু শব্দ প্রত্যাহারে আবেদনের সিদ্ধান্ত

স্টাফ রিপোর্টার : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে ব্যবহার করা কয়েকটি শব্দ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন মন্ত্রীসভার সদস্যরা। আর এসব শব্দ এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার বা বাতিল) করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে সরকারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার বৈঠকের নিয়মিত আলোচনা শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিয়মিত আলোচনা শেষে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গটি উঠে আসে। এরপর দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠকে উপস্থিত ৪০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রায়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

ষোড়শ সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ রায় নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা। মন্ত্রীসভার বৈঠকের পর অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় আইনমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের কপি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান। দুই ঘণ্টাব্যাপী এটা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় নিয়ে জনসম্মুখে কথা বলে রায়ের বিষয়ে জনমত গড়ে তোলার জন্য মন্ত্রীপরিষদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আলোচনা শেষে রায়ের ভেতরের ‘অসঙ্গতি’ ও ‘আপত্তিকর’ শব্দের বিষয়ে এগুলো এক্সপাঞ্জ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার বিষয়ে একমত হন মন্ত্রীসভার সদস্যরা।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতা ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। অবশ্য বৈঠকে অংশ নেয়া মন্ত্রীসভার বেশ কয়েকজন সদস্যও গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে মন্ত্রীপরিষদের নিয়মিত বৈঠক শেষে প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা হয়। উপস্থিত সবাই রায়ের বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ রায়ে ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদের সবাই। তিনি আরো বলেন, ওই অনির্ধারিত বৈঠকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক রায়ের কপি উত্থাপন করেন। তিনি রায়ের বিভিন্ন পয়েন্ট উল্লেখ করে বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে অপ্রাসঙ্গিক অনেক কিছু আনা হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় ছিল না। যেমন পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংশোধনীও টেনে আনা হয়েছে। এমনকি ২০১৪ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটাকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলা হয়েছে। 

মন্ত্রীসভার এক সদস্য জানান, বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সবার সামনে তুলে ধরেন। এরপর তিনি মন্ত্রীসভাকে জানান, রায়টিতে অনেক ‘আপত্তিকর’ শব্দ রয়েছে। 

এ সময় মন্ত্রীসভার একজন সিনিয়র সদস্য আইনমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, আপত্তিকর শব্দগুলোর মধ্যে কী কী রয়েছে? জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, এখানে সংসদকে ‘ইম্ম্যাচিউরড (অপরিপক্ব), জনগণের প্রতিনিধিত্বহীন এবং প্রশ্নবিদ্ধ’ বলা হয়েছে। 

রায়ের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রীরা আলোচনায় বলেন, সংসদ যদি ‘ইমম্যাচিউর্ড’ হয় তাহলে রাষ্ট্রপতিও ‘ইম্ম্যাচিউর্ড।’ আর রাষ্ট্রপতি যে প্রধান বিচারপতিকে শপথবাক্য পাঠ করিয়ে প্রধান বিচারপতি করেছেন তিনি কি ‘ইম্ম্যাচিউর্ড’ হতে পারেন।

আলোচনার একপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ রায় থেকে সংসদ সম্পর্কে লেখা এসব শব্দ বাদ দিতে সরকারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেন মন্ত্রীসভার সদস্যরা।

এ বিষয়ে মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, রায়ের আপত্তিকর বিষয়গুলো জনগণের জানার অধিকার আছে, তাই এগুলো জনগণকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।

রায়ের বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে দু’-একদিনের মধ্যে আইনমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করবেন বলেও জানান মুজিবুল হক। শ্রম প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, মন্ত্রীদের সবার বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রায়ের বিষয়টি অনুধাবন করে জনগণ যেন বিভ্রান্ত না হয় তা বোঝাতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১ আগস্ট প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ নির্বাচনের পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি তুলে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করা হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়; যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধানে ছিল।

সংবিধানে এই সংশোধনী হওয়ায় মৌল কাঠামোতে পরিবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করবে- এমন যুক্তিতে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নবেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। ওই রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নবেম্বর রুল জারি করেন। গত বছরের ১০ মার্চ মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৫ মে তা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন আদালত।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর ওইদিনই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ার পর এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।

সাত শহরে মিশন স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন : এর আগে বিশ্বের সাতটি শহরে নতুন করে সাতটি বাংলাদেশ মিশন স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রীসভা। যে সাতটি শহরে মিশন চালু হবে, সেগুলো হলো আফগানিস্তানের কাবুল, সুদানের খার্তুম, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটাউন, কানাডার টরোন্টো, ভারতের চেন্নাই, রোমানিয়ার বুখারেস্ট ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনি।

মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকের পরে মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে সভার এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে চালু হওয়া ১৭টি শহরে বাংলাদেশ মিশন স্থাপনের বিষয়ে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈঠকে নজরুল ইনস্টিটিউট আইন ২০০০-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ