ঢাকা, মঙ্গলবার 08 August 2017, ২৪ শ্রাবণ ১৪২8, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হতভাগা সিদ্দিকুরের দু‘চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে ৭ পুলিশ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : আইনশৃঙ্খলা তথা জনগণের জানমাল সুরক্ষা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা হয়ে পড়ে বিপরীত। ফলে জানমাল হরণকারী হিসেবে অভিযুক্ত হয় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ।

পরীক্ষার সময়সূচির দাবিতে বিক্ষোভের সময় ‘পুলিশের টিয়ারশেলে’ তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমানের দুই চোখ জখম হওয়ার ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তদন্ত কমিটি দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে অবশেষে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই কমিটির প্রধান যুগ্ম-কমিশনার (অভিযান) মীর রেজাউল আলম গতকাল সোমবার সকালে ডিএমপি কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা আজ প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।” প্রতিবেদনটি ডিএমপি কমিশনার বরাবরে জমা দেয়া হলেও কমিশনার দেশের বাইরে। তিনি ফিরে এলেই প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানা গেছে ।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে রেজাউল আলম কিছু বলতে না চাইলেও কমিটির এক সদস্য বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের অসতর্কতা ও অপেশাদার আচরণের বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন তারা।

খুব কাছ থেকে ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেল সিদ্দিকুর রহমানের চোখে লাগে বলে তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। সূত্র জানায়, এ ঘটনায় পুলিশের সাত সদস্যের সম্পৃক্ততা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

কিন্তু কী শাস্তি দেয়া হবে? দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া? অন্য কোনোখানে বদলি? পদোন্নতি আটকে দেয়া? কিংবা পুলিশ বাহিনীতে কাজ করার অযোগ্য বিবেচনা করে চাকরি থেকে বাদ দেয়া?

কিন্তু কোনো শাস্তিই সিদ্দিকুরের ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না। তিনি এক চোখে দেখতে পাবেন না, চিকিৎসকরা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। আরেক চোখে দেখবেন কিনা সেটি জানতে আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা।

পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণার দাবিতে গত ২০ জুলাই শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় পুলিশ লাঠিপেটা করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। তখন সিদ্দিকুরের চোখে কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাত লাগে বলে আন্দোলকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। সিদ্দিকুরের চোখের জখম পুলিশের টিয়ার শেলের কারণে কি না বিষয়টি তদন্ত করতে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটি করা হয়।

আহত সিদ্দিকুরের চোখে প্রথম অস্ত্রোপচার হয় ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকরা প্রথম জানিয়েছিলেন তার দুই চোখে আর আলো ফিরবে না। পরে অবশ্য চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট হলেও অপর চোখে কিছুটা দেখতে পান। ভারতের চেন্নাইয়ে শংকর নেত্রালয়ে সিদ্দিকুরের চিকিৎসা চলছে।

যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনার দায় ছাত্রদের ওপরই চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, ছাত্রদের ছোড়া ফুলের টবের আঘাতে সিদ্দিকুরের চোখ জখম হয়েছে। দাবিটি যে হাস্যকর ছিল, তা বেরিয়ে এসেছে পুলিশের তদন্ত রিপোর্টেই।

৭ পুলিশকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন 

খুব কাছ থেকে ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেল সিদ্দিকুর রহমানের চোখে লাগে বলে তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। সূত্র জানায়, এ ঘটনায় পুলিশের সাত সদস্যের সম্পৃক্ততা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান গতকাল বিকেলে বলেন আজ সোমবার এই কমিটির প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনানেরর দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এ ঘটনায় যাঁদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাঁরা হলেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু জাফর আলী বিশ্বাস ও পরিদর্শক (অভিযান) আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া দাঙ্গা দমন বিভাগের (পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট-পিওএম) পাঁচ কনস্টেবলের নামও আছে।

কমিটির এক সদস্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাত সরকারি কলেজের পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণার দাবিতে গত ২০ জুলাই শাহবাগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। এ সময় সেখানে কর্তব্যরত দাঙ্গা দমন বিভাগের পাঁচ কনস্টেবল ছিলেন আক্রমণাত্মক। তাঁরা হঠাৎ করেই শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হন। তাঁদের একজন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি খুব কাছ থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়েন। এটি তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমানের চোখে লাগলে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলের কাছে শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আবু জাফর আলী বিশ্বাস ও পরিদর্শক (অভিযান) আবুল কালাম আজাদ থাকলেও তাঁরা পুলিশ সদস্যদের নিবৃত্ত করেননি। এমনকি তাঁরা পুলিশ সদস্যদের সঠিক নির্দেশনাও দেননি। পুলিশ সদস্যরা অপেশাদারসুলভ আচরণ করেন।

ডিএমপি সদর দপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, কমিটি তদন্তে জানতে পারে, খুব কাছ থেকে সিদ্দিকুরের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়েছিল। তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর পর্যালোচনা করে কমিটি দেখেছে যে এই কাঁদানে গ্যাসের উপকরণ চোখের জন্য ক্ষতিকারক ছিল।

অভিযোগ ওঠে , সেই সমাবেশে বিনা উসকানিতে পুলিশ খুব কাছ থেকে টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করলে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্দিকুর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর চোখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এরপর ঢাকায় তাঁর দুই চোখে অস্ত্রোপচার করা হলেও তাতে সুফল মেলেনি। তখন সিদ্দিকুরকে নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছিল। পুলিশের বড় কর্তারা তাঁকে দেখতে গেলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সান্ত¡না দিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, সিদ্দিকুরকে চাকরি দেবেন। সরকারি খরচেই চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতের চেন্নাইয়ে শংকর নেত্রালয়ে পাঠানো হলো।

সেখানে প্রথমে চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, সিদ্দিকুরের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ডান চোখে তিনি কখনো দেখতে পাবেন না। বাঁ চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ১ শতাংশ। তারপরও সেখানে তাঁর বাঁ চোখে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার হলো। গত শুক্রবার সিদ্দিকুরের অস্ত্রোপচার শেষে গত শনিবার তাঁর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক জাহিদ আহসানের বরাত দিয়ে সিদ্দিকুরের বন্ধু ও সহপাঠী শেখ ফরিদ জানান, অস্ত্রোপচারের পর সিদ্দিকুর চোখের এক পাশ থেকে আলোর উপস্থিতি টের পাচ্ছেন। তিনি কতটুকু দেখবেন বা আদৌ দেখবেন কি না, তা জানতে আরও চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগবে।

তদন্তে অভিযুক্তরা যা বললেন....

সিদ্দিকুর রহমানের চোখ হারানোর ঘটনায় যারা দায়ী-পুলিশের তদন্তে যে সাতজনের নাম এসেছে, তাদের জন্য পাঁচজন কনস্টেবল এবং দুইজন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে দুই পুলিশ পরিদর্শক শাহবাগ থানায় এবং পাঁচ কনস্টেবল পাবলিক অর্ডার ম্যানেজম্যান্টে (পিওএম) কর্মরত।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সংর্ঘষে পুশিশের চড়াও হওয়ার ঘটনায় শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু জাফর আলী বিশ্বাস ও পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়াও সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের বিভিন্ন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ভিডিও ফুটেজ যাচাই-বাছাই করে পুলিশের দাঙ্গা দমন বিভাগের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) পাঁচ কনস্টেবলের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি লক্ষ্য করা গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাফর আলী বিশ্বাস‘র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনের কথা আমি শুনেছি। তবে এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমাদের জেষ্ঠ্য কর্মকর্তারা রয়েছেন ওনারা অনেক মেধাবী। তারাই চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই ব্যবস্থা নেবেন।’

অপর পুলিশ কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম বলেন, ‘আজকে কোনো পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে আমার কোনো ভূমিকা ছিল কি না সে ব্যাপারে একটি তদন্ত চলছে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’

ওই দিনের ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একটি তদন্ত কমিটির প্রধান ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপস) মীর রেজাউল আলম। অপর সদস্যরা হলেন- ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আশরাফুল আলম। গতকাল এই কমিটিই তাদের প্রতিবেদন জমা দেন ।

অপর কমিটি রমনা বিভাগের পুলিশের আরেক অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) নাবিদ কামাল শৈবালকে প্রধান করে গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার দেয়ার কথা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ