ঢাকা, মঙ্গলবার 08 August 2017, ২৪ শ্রাবণ ১৪২8, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিশুদের জন্য ইন্টারনেট এখন যেন জাঙ্কফুড

ভারসাম্য গুণেই টিকে আছে সৃষ্টি জগত। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান সবই ভারসাম্যের পক্ষে। প্রান্তিক কিংবা চরম ভাবনা বা কর্মে যে কোন কল্যাণ নেই, সে কথা সৃষ্টির শুরুতেই বলে দিয়েছে ধর্ম। এখন বিশ্ব নেতাদের কণ্ঠেও শোনা যায় তেমন কথা। তবে প্রশ্ন জাগে, তারা যা বলেন তা কতটা বিশ্বাস করেন? তাদের স্ববিরোধী আচরণই এমন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে ভারসাম্য প্রশ্নে আজ নেতারা নয়, উঠে এসেছে শিশুরা।
বিবিসি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, শিশুরা যাতে অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় না কাটায় সেটা মা-বাবাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। এই পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের শিশু বিষয়ক কমিশনার অ্যান লংফিল্ড। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যেভাবে শিশুদের মনোযোগ এবং সময় কেড়ে নিচ্ছে তার সমালোচনা করে লংফিল্ড বলেন, গ্রীষ্মের ছুটিতে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বিরত রাখার দায়িত্বটা মা-বাবাকেই পালন করতে হবে। কারণ, শিশুরা মিষ্টি খাবারের মতোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রলোভনে পা দিয়ে বিপদে পড়েছে। অনলাইনে তাদের সময় কাটানোকে বাজে খাবারের (জাঙ্ক ফুড) সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। লংফিল্ড আরও বলেন, ‘ছেলে-মেয়েরা সারাক্ষণ জাঙ্কফুড খাবে, এটা আমাদের মা-বাবারা কেউ চান না। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের চাওয়া উচিত নয় যে, সন্তান বেশি বেশি সময় অনলাইনে কাটাক।’
যুক্তরাজ্যের শিশু বিষয়ক কমিশনার অ্যান লংফিল্ড শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপারে যে পরামর্শ দিয়েছেন তা ভেবে দেখার মতো। তিনি অনলাইনে শিশুদের সময় কাটানোকে জাঙ্ক ফুডের সাথে তুলনা করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের জন্য অভিভাবকদের সতর্ক করেছেন। আমরা জানি, ইন্টারনেট বিচিত্র বিষয়কে গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এসব বিষয়ের সিংহভাগই শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়। এমন অনেক বিষয় আছে যা নোংরা এবং অপ্রয়োজনীয়, এগুলো বড়দের জন্যও উপযুক্ত নয়। কৌতূহলী শিশুমনে এর প্রভাব যে মন্দ হবে তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। অফকম নামের একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা গত বছর জানায়, যুক্তরাজ্যে ইন্টারনেটে শিশুদের অবসর সময় কাটানোর জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেখানকার ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরা সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টার ইন্টারনেটে থাকে। বাংলাদেশের অবস্থা এর থেকে মোটেও ভালো নয়। আমাদের চারপাশের চিত্র ভয়াবহ। ইন্টারনেট ব্যবহারে সক্ষম পরিবারে দেখা যায় ছোট-বড় নির্বিশেষে প্রায় সবাই ইন্টারনেটে সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে একেবারে বেহিসেবী। অনেক শিশুকে দেখা যায় স্কুল, খাওয়া ও ঘুমের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টুকু ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকতে। অভিভাবকরা বিষয়টি দেখেও যেন দেখছেন না। হয়তো ভাবছেন, ডিজিটাল যুগে আমার সন্তান পিছিয়ে থাকবে কেন? কিন্তু বিষয়টি সন্তানের জন্য ভালো হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখার মতো জ্ঞান ও নৈতিক চেতনা থেকে অনেক অভিভাবকই দূরে অবস্থান করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে শিশুরা কি ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা মুঠোফোন ব্যবহার করবে না? চলতি বছরের শুরুর দিকে সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, কম্পিউটার বা মুঠোফোনের যান্ত্রিক পর্দায় চোখ রেখে কেউ সীমিত পরিমাণ সময় কাটালে সেটা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। এমন বক্তব্য থেকে উপলব্ধি করা যায়, যান্ত্রিক পর্দা থেকে উপকৃত হতে হলে সীমা বা শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিতে হবে, সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। আর সুস্থতার জন্য প্রয়োজন হবে সুস্থ বিষয়েরও। এতদূর এসে আমাদের আবার ফিরে যেতে হচ্ছে শুরুর বিষয় ‘ভারসাম্যে’। আসলে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ কোন কিছুই মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। ধর্ম-দর্শনও যুগে যুগে আমাদের সেই বার্তাই দিয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ