ঢাকা, মঙ্গলবার 08 August 2017, ২৪ শ্রাবণ ১৪২8, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মরিয়া মাদক সিন্ডিকেট

সংগ্রাম রিপোর্টার : রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত স্বাধীনতার সময় আটকে পড়া ঊর্দুভাষীদের (পাকিস্তানী/ অবাঙ্গালি/ বিহারী) জেনেভা ক্যাম্প পরিচালনার জন্য এডহক কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেতে আগ্রহী তিন জনের মধ্যে দুইজনের বিরুদ্ধে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ গুরুতর অভিযোগের মামলা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা-বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টেও এর প্রমাণ মিলেছে।
জানা গেছে, বিহারী ক্যাম্পের সাবেক চেয়ারম্যান এসকে গোলাম জিলানী গত ১৭ জানুয়ারি মাদকসহ গ্রেফতার হন। এরপর জামিনে মুক্ত হলেও আর বিহারী ক্যাম্পে আসতে পারেননি। এরপর থেকে বিহারী ক্যাম্প মূলত অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। এরপর এই বিহারী ক্যাম্পের পরিচালনায় এডহক কমিটি গঠনের জন্য তিনজন ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। এরা হলেন মো: ওয়াসি আলম বশির, এস এম সীমা কারেশি এবং মো: তাহের আহমেদ তাহেরী ওরফে টিপু তাহেরী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, ঢাকা শহরে ইয়াবাসহ মাদক সরবরাহের হটস্পট মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। এখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদক আসে এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে চলে যায়। এজন্য জেনেভা ক্যাম্পকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্টরা নাম দিয়েছে হটস্পট। তেজগাঁও ডিসি অফিস থেকে পাঠানো রিপোর্টেও এই জায়গাটিকে হটস্পট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার অধিবাসীর ঘিঞ্জি এরিয়াকে তাই মাদক ব্যবসার জন্য নিরাপদ মনে করা হয়। মাদক ব্যবসার অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান বরখাস্ত হলে পরবর্তী চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য টার্গেট করে মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য মোট তিন জন আবেদন করেছেন। এরমধ্যে দুইজন অর্থাৎ মো: ওয়াসি আলম বশির এবং এস এম সীমা কোরাইশির বিরুদ্ধে স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদেও রিপোর্টেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। গত ১৮ জুলাই রাজধানীর মতিঝিলের ঘরোয়া হোটেলে মাদক সম্রাট মো. নাদিম পচিশের সঙ্গে চেয়ারম্যান প্রার্থী ওয়াসি আলম বশিরের মিটিং করার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং আইন শৃঙ্খলাবাহিনী তাকে গ্রেফতারে তৎপর হয়ে ওঠে।
এরপরও তিনি বিহারী ক্যাম্পের এডহক কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিয়ে সুপারিশ করাচ্ছেন। এ বিষয়ে ওয়াসি আলম বশিরের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, কমিটির বিষয়ে তিনি কোনেব তদবির করছেন না। এমনকি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও তিনি যান না। আর নাদিম পাচিশ নামের কাউকে চিনেন না। অবশ্য নাদিম পাচিশের সঙ্গে মিটিং করার ছবি দৈনিক সংগ্রামের কাছে রয়েছে। আর তার বিরুদ্ধে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৮ম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থা থেকেই তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। জেনেভা ক্যাম্পে চেয়ারম্যান না থাকলেও ক্যাম্পের ভেতর তিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন।
চেয়ারম্যান পদের জন্য আবেদন করা আরেক প্রার্থী এসএম সীমা কোরাইশির বিরুদ্ধে ক্যাম্পে মাদকব্যবসাসহ নানা অসামাজিক ও অনৈতিক কাজের অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদকের পাশাপাশি দাঙ্গা-হাঙ্গামা অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় অনেকগুলো মামলা এবং সাধারণ ডায়েরি রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলার নম্বর হলো- মোহাম্মদপুর থানা মামলা নম্বর -১৫- তারিখ ০৪/০১/২০০৯ইং, মামলা নম্বর-১৬ তারিখ ০৪/০১/২০০৯ইং মামলা নম্বর-১৮, তারিখ ০৭/১২/২০০৩ ইং সি আর মামলা -৫১০ তারিখ ০৮/০১/২০০১, মামলা নম্বর ৩১১, তারিখ ২৬/০৬/২০১২ ইং মামলা নম্বর ৩১৫তারিখ ২৭/০৬/২০১২ ইং। এসবের তথ্য প্রমাণ রয়েছে দৈনিক সংগ্রামের কাছে। এস এম সীমা কারেশিও নানা ভাবে এডহক কমিটির চেয়ারম্যানের পদ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি পদটি ভাগানোর জন্য নানা জায়গায় তদবির করে চলেছেন। এবিষয়ে সীমা কারেশির মোবাইলে বার বার ফোন করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
চেয়ারম্যানের পদ পেতে আগ্রহী আরেক প্রার্থী মো.তাহের আহমেদ তাহেরী ওরফে মো. টিপু তাহেরী দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে মাদকের কোন অভিযোগ নেই। জেনেভা ক্যাম্পের তরুণ যুবকদের নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার জীবনের ওপর হুমকি আসছে। মাদক বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য একাধিক পুরষ্কার পেয়েছেন বলেও দাবি তার।
এদিকে গত ১৭ জানুয়ারি চেয়ারম্যান এস জিলানী মাদকসহ গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে জেনেভা ক্যাম্প মূলত অভিভাবক শূন্য হয়ে যায়। এ সুযোগে ক্যাম্প অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়। অবাধে চলছে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড। ক্যাম্পের লোকজন মনে করেন, আগের চেয়ারম্যান এস কে জিলানী নিজেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া অনৈতিকভাবে অর্থবিত্ত হাতিয়ে নিয়ে বিত্তশালী হয়ে ওঠায় ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করতেন। তিনি মাদকসহ গ্রেফতারের পর জামিন পেলেও তাকে আর ক্যাম্পে স্থান দেওয়া হয়নি। এরপর থেকে জেনেভা ক্যাম্পের প্রায় ৫০ হাজার অধিবাসী একজন ভাল অভিভাবকের আশায় আছেন।
বাসিন্দারা বলেছেন, ক্যাম্পে যারাই নেতৃস্থানীয় তারাই নিজ নিজ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার জন্য। আর এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের শিকার হন সাধারণ বাসিন্দারা। প্রায়ই অপরাধীদের দ্বন্দ্ব আর সঙ্ঘাতের খেসারত দিতে হয় নিরপরাধ বাসিন্দাদের।
তারা মনে করেন, আবারো কোন চিহ্নিত অপরাধী বা কোন মাদক ব্যবসায়ী জেনেভা ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্বে না আসুক। কোন ভাল মানুষ দায়িত্বে না আসলে এখানকার যুব সমাজ বিপথে চলে যাবে। জড়িয়ে পড়বে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে।
জেনেভা ক্যাম্পের এডহক কমিটির বিষয়ে ঢাকা জেলার এডিসি সার্বিক মজিবর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, জেনেভা ক্যাম্পের কমিটি করে দেওয়ার জন্য আলাদা কমিটি করে দেওয়া আছে। কমিটি যাচাই বাছাই করে যথাসময়ে কমিটি দিয়ে দিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ