ঢাকা, মঙ্গলবার 08 August 2017, ২৪ শ্রাবণ ১৪২8, ১৪ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় মাইক্রোতে বেড়েছে নিষিদ্ধ কালো গ্লাস ও স্টিকারের ব্যবহার

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগরীতে হঠাৎ করে আশঙ্কাজনক হারে  বেড়েছে মাইক্রোতে নিষিদ্ধ কালো গ্লাস ও বিভিন্ন কালারের স্টিকারের ব্যবহার। ফলে হত্যা, গুম, অপহরণ, মাদকদ্রব্য বহনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে এটা ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ।
অভিযোগ রয়েছে, কিলিং মিশনে অংশ নেয়া খুনিরা নির্বিঘেœ পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে মোটরসাইকেল ও কালো গ্লাসের মাইক্রো। ফলে খুনিরা রয়ে যায় ধরা ছোয়ার বাইরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ এপ্রিল ২০১৪ মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ (১৯৮৮ সালের ২৭ নম্বর আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ৫৩ ধারা ক্ষমতাবলে এবং আমদানি ও রফতানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৫০ এর ৩ ধারা মতে ২৭ মার্চ ২০০৬ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত এসআর নং ৫৪ আইন অনুযায়ী মাইক্রোবাসে কালো, রঙিন, মার্কারি, অস্বচ্ছ গ্লাস ব্যবহার নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যা এখনও বলবৎ। তবে এ আইনে গাড়িতে কালো কাঁচের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব), সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিবৃন্দের ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। এ ছাড়া যেসব গাড়ির সামনের উইন্ডশেড, দুই পাশের জানালা ও পিছনের কাঁচ ফ্যাক্টরিতে নির্মিত অবস্থায় সংযোজন করা হয়েছে (বিল্ট-ইন) সেগুলোর ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না। অথচ আইন থাকলেও নেই আইনের প্রয়োগ। আর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা।
সচেতন মহলের অভিমত, অধিকাংশ হত্যা, অপহরণ, নারী কেলেঙ্কারি, গুমের মতো অপরাধ করা হচ্ছে মাইক্রোতে কালো গ্লাস ব্যবহার করে। এর ফলে গাড়ির ভেতরে কে আছে তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাদের মতে, বাইরে থেকে ভিতরের কিছু দেখা না যাওয়ায় সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী-সন্ত্রাসীরা। এছাড়া কালো গ্লাস ওয়ালা মাইক্রোতে বহন করা হচ্ছে ফেন্সিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য। পাশাপাশি এ রকম মাইক্রো নিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ বেশ পুরনো। অস্ত্র সরবরাহ কাজে নিরাপদ বাহন হিসেবে কালো গ্লাস ওয়ালা মাইক্রো অপরাধী-সন্ত্রাসীদের কাছে বেশ পছন্দের বলে সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বেশীর ভাগ রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি আর প্রশাসনের কর্মকর্তারা নানা রকম ঝামেলা এড়াতে কালো গ্লাসের গাড়ি ব্যবহার করছেন। এ কারণে পুলিশও এক্ষেত্রে অনেক নমনীয়। আর এসব সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নমনীয় আচরণের সুযোগ নিয়ে ঘটাচ্ছে বড় বড় অপরাধ। মাইক্রোতে কালো গ্লাসের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ট্রাফক বিভাগও বেশ উদাসীন। কারণ লোকবল সঙ্কট থাকায় তারা অন্যান্য ঝামেলা সামলাতেই ব্যস্ত থাকেন বলে দাবি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার।
কালো গ্লাস মাইক্রোর চালক হাবিল মিয়া বলেন, আমরা ড্রাইভার মালিকের গোলাম। তবে কালো গ্লাস থাকলে আর কিছু হোক বা না হোক বর্তমানে প্রেম আর নষ্টামি ভাল চলে। কখনও মালিক তার বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে, কখনও ছেলে তার বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে। এ সকল নষ্টামির দর্শক মাত্র আমরা। তিনি বলেন, আমার এই ২৭ বছরের গাড়ি চালনার অভিজ্ঞতায় কালো গ্লাস লাগিয়ে মালিকদের অনেক অনৈতিক কর্মকান্ডের স্বাক্ষী আমি। কালো গ্লাস যখন বন্ধ হয়েছিল তখন মালিক পক্ষের এ সকল অপকর্ম অনেকাংশে বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও এখন কি কারনে প্রশাসন নিরব রয়েছে জানি না।
শাহজাহান নামের একজন গাড়ির মালিক বলেন, তার গাড়িতে বিল্ট-ইন গ্লাস লাগানো ছিল। তিনি ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ২০১৪ সালে সাদা গ্লাস লাগিয়েছেন। তার মতো অনেকেই পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু আইন আইনের জায়গায় আছে, প্রয়োগ নেই। আর মাঝে আমরা টাকা খরচ করে কালো গ্লাস খুলে ফেলেছি। প্রশাসন গরম গরম সকল আইন খুব ভাল করে তদারকি করে। কিন্তু কিছুদিন পর সব অবৈধতা বৈধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, কালো গ্লাসের যে শুধু খারাপ দিকে রয়েছে তা নয় এর ভাল দিকও আছে। যেমন রৌদ্রের তাপ থেকে নিরাপদে থাকা যায়। অনেক সময় মহিলাদের পর্দার জন্যও কালো গ্লাস লাগিয়ে থাকে। নগরীতে গাড়ির কালো গ্লাস পরিবর্তনকারী একাধিক দোকান মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেক দিন কালো গ্লাস বা স্টিকার লাগানো বন্ধ ছিল, দাম ও কম ছিল। তবে বর্তমানে কালো স্টিকার ও কালো গ্লাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ সকল কালো গ্লাস বর্তমানে একটি বিশেষ দলের নেতারাই বেশি লাগাচ্ছেন।
আর্ফিন মটরসের মালিক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আইন প্রণয়নের পর কালো স্টিকার আর কালো গ্লাস পরিবর্তনে হিড়িক লেগেছিল। আমরা সাধারণত স্টিকার উঠাতে টাকা নেই না। সেই সময় এত গাড়ির কালো স্টিকার উঠিয়েছি যে সিরিয়াল পড়ে যেত গাড়ির। পরে আমরা স্টিকার খুলতে টাকাও নিয়েছি। তখন কালো স্টিকারের দাম কমে গিয়েছিল। এখন আবার স্টিকার লাগানোর হিড়িক পড়েছে তাই দামও বেড়ে গেছে।
সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কি পরিমাণ কালো গাড়ি বেড়েছে আমাদের কাছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে স্টিকার ব্যবহৃত গাড়ি হলে ১৫১ ধারায় মামলা হতে পারে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান। তবে যেসব গাড়ির সামনের উইন্ডশেড, দুই পাশের জানালা ও পিছনের কাঁচ ফ্যাক্টরিতে নির্মিত অবস্থায় সংযোজন করা হয়েছে (বিল্ট-ইন) সেগুলোর ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না।
বাংলাদেশ রোড় ট্রাসর্পোট অথরিটি’র (বিআরটিএ) সহকারী পরিচালক এ,এস, এম কামরুল হাসান বলেন, আমি বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানলাম। এ সকল কালো গ্লাস বা স্টিকারওয়ালা গাড়ি বিশেষ ব্যক্তি ছাড়া রাস্তায় চলাচল সম্পূর্ণ নিষেধ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কালো গ্লাস স্থগিত নয়, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অতি সত্ত্বর আমরা এদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যেমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, মাইক্রোতে কালো গ্লাসের ব্যবহার বেড়েছে বলে শুনেছি। অতি সত্ত্বর এ সকল মাইক্রোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ