ঢাকা, বুধবার 09 August 2017, ২৫ শ্রাবণ ১৪২8, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

১০ দিনে দুদকের হটলাইনে কড়া নেড়েছে লাখের বেশি অভিযোগ আমলে মাত্র ২৭৫

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : দুর্নীতি আর অনিয়ম নিয়ে জনমনে কত ক্ষোভ , তার একটি পরিসংখ্যানেই ক্ষোভের চিত্রটি জানান দেয় খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের ( দুদক ) একটি ‘হটলাইন’ উদ্যোগে । ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটতে শুরু করেছে দুদকের ওই উদ্যোগের ফলেই । দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন দুর্নীতি আর অনিয়মের যত অভিযোগ আসছে , তা পরখ করতে গিয়েই বেসামাল অবস্থা দুদকের । আর অভিযোগের ধরন দেখে তারাও বেহুঁশ হওয়ার অবস্থায় । যে সব অভিযোগ আর অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে , তাতে করে দুদকেরও চোখ কপালে ওঠার উপক্রম । সংস্থাটির কর্ণধাররা বলছেন , এত অভিযোগ- এত অনিয়ম ? এত ক্ষোভ জনমনে চাপা ছিল ? তাদের দাবি , ওই উদ্যোগের ফলে জনমনের চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে । তারাও খুশি-অভিযোগগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে । তফশিল মোতাবেক যে সব অভিযোগ আমলে নেয়া যায় , সেগুলো নিয়ে তারা কাজও করছেন ।

দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য জানাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ১০৬ হটলাইনে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি ফোন কল এসেছে। এর মধ্য থেকে প্রায় ২৭৫ অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুসন্ধানযোগ্য অভিযোগগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গত ২৭ জুলাই দুদকের এই হটলাইন চালু হয়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ১০ কর্মদিবসে হটলাইনে ফোন কলের সংখ্যা ১ লাখ ১২ হাজারে পৌঁছায়। দুদক সূত্র জানিয়েছে, যেকোনো নম্বর থেকে এই হটলাইনে বিনা মূল্যে সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কল করা যায়। একাধিক ব্যক্তি একই সঙ্গে অভিযোগ জানাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর নাম ও পরিচয় গোপন রাখা হয়। অভিযোগকারী চাইলে তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়।

প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজারের মতো ফোন এসেছে এই হটলাইনে। তবে সংস্থাটির তথ্যমতে, হটলাইনে ব্যক্তিগত বিষয়ে অভিযোগ জানাতে কল বেশি এসেছে। এর মধ্যে দুদকের আওতাবহির্ভূত অভিযোগের সংখ্যাই বেশি। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর বক্তব্য শুনে তাকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির অভিযোগটি জানিয়ে দেয় দুদক।

দুদক কর্তৃপক্ষ মনে করছে, হটলাইনের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হবে। দ্রুত দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে। দুর্নীতির ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অথবা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে ,এমন অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া যাবে। দুর্নীতির ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি এবং কমিশনের প্রতি জন-আস্থা সৃষ্টি হবে।

একে জনগণের সঙ্গে দুদকের সেতুবন্ধন হিসেবে মনে করছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘সমাজে যে দুর্নীতি চলছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুদকের আওতাবহির্ভূত কল এলেও আমরা অভিযোগকারীকে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। এতে করে ওই সব প্রতিষ্ঠানকেও সতর্ক করে দেয়া যায়।’

দুদকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হটলাইনে তথ্য পেলেই সেটিকে অভিযোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। অভিযোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেই অনুসন্ধান চালাবে না দুদক। অভিযোগ কেন্দ্র থেকে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সেগুলো দুদকের সেলে পাঠানো হয়। সেখানে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, অভিযোগটি অনুসন্ধানযোগ্য কি না। কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানযোগ্য হলে ১৫ দিনের মধ্যে অভিযান শুরু করা হয়। তাৎক্ষণিক কোনো দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সে ব্যাপারে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালানো হয়। এ জন্য একজন পরিচালকের নেতৃত্বে দুদকের পৃথক তিনটি দল সর্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। এসব দলের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে পুলিশ সদস্যরা যুক্ত থাকেন।

দুদক জানিয়েছে, ভূমি অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ, কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), পল্লী বিদ্যুৎ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য, নারী নির্যাতন, পাসপোর্ট অফিস, রেলওয়ে, ঘুষ লেনদেন, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়া, হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলা ও অনুপস্থিতি, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষা ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়।

অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে জানিয়ে সংস্থাটির মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, “যেসব অভিযোগ কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে পড়বে এবং অনুসন্ধানযোগ্য হবে, সেই সব অভিযোগ আমলে নেয়া হবে। এরপর অনুসন্ধানে অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা হবে।”

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ২৭ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ‘হটলাইন অভিযোগ কেন্দ্র’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ওই দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফোন আসা শুরু হয়।

দুদকের সিস্টেম অ্যানালিস্ট রাজীব হাসান বলেন, “অফিস চলাকালীন সপ্তাহের পাঁচদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত হটলাইনের আসা কল রিসিভ করা হয়। বাকি সময়ে যেসব কল আসবে সেগুলো স্বংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়ে থাকে। 

প্রণব জানান, যেসব কল রিসিভ করে দুদকের কর্মকর্তারা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, সেই সব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূমি সংক্রান্ত। এছাড়া উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ, কাবিখা সংক্রান্ত, পল্লী বিদ্যুৎ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য, নারী নির্যাতন, পাসপোর্ট অফিস সংক্রান্ত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। অন্যদিকে রেলওয়ে সংক্রান্ত, ঘুষ লেনদেন, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়া, হাসপাতালে চিকিৎকদের অবহেলা ও অনুপস্থিতি, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষা ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের জনসংযোগ অফিস জানায়, গত ২৭ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৪৯টি অভিযোগ নোট করা হয়। এরপর ৩১ জুলাই ৪০টি, ১ অগাস্ট ২৪টি, ২ অগাস্ট ৫৫টি, ৩ অগাস্ট ১২টি, ৬ থেকে ৭ অগাস্ট ৪৫টি এবং ৮ অগাস্ট ৫০টি অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে কমিশনে দালিখ করা হয়।

হটলাইনের মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বিনা পয়সায় ফোন করে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দুদকে জানানো যাচ্ছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের ৩১৬ নম্বর কক্ষে খোলা এই ‘অভিযোগ কেন্দ্রে’ পাঁচটি ডেস্ক রয়েছে। হটলাইনে একসঙ্গে পাঁচজন ব্যক্তির ফোন রিসিভ করা যায়। দুদকের সহকারী পরিচালক সেলিনা আখতার মনির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দুই ঘণ্টা করে অভিযোগ গ্রহণের দায়িত্ব পালন করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ