ঢাকা, বুধবার 09 August 2017, ২৫ শ্রাবণ ১৪২8, ১৫ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পাকিস্তানে সঙ্কট বাড়লো

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : ১৯৪৭ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে পাকিস্তানে সামরিক রাজনৈতিক সঙ্কট কখনও কাটেনি। পাকিস্তানের নির্বাচিত কোনো সরকারই তাদের পাঁচ বছরের শাসনকাল পুরো করতে পারেনি। প্রধানত সামরিক হস্তক্ষেপে বা শীর্ষ আদালতের রায়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। পাকিস্তানে একটি কথা বহুল প্রচলিত। আর তা হলো : সেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী, তারপর সুপ্রীম কোর্ট আর সর্বশেষ গণমাধ্যম । আর গত সপ্তাহে সেখানকার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে ‘অসততার’ অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী থাকার অযোগ্য ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট। সে অভিযোগ মাথায় নিয়েই নওয়াজ শরীফ পদত্যাগ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত আশার কথা এই যে, পাকিস্তানে এখনও সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেনি। করবে কিনা, তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। নওয়াজ শরীফ সুপ্রীম কোর্টের এই রায়ের রিভিউ চাইতে পারেন। কিন্তু তা গ্রাহ্য করা না-করা আদালতের এখতিয়ার।
ইতোমধ্যে আদালত পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ‘জাতীয় জবাবদিহিতা ব্যুরো’কে (এনএবি)  নওয়াজ শরীফ ও তার পরিবারের কতিপয় সদস্য ও অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। একই আদেশে আদালত অর্থমন্ত্রী ইসহাক দারকে সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। নওয়াজ শরীফ অত্যন্ত নীরবে এই রায় মেনে নিয়েছেন। তিনি শুধু বলেছেন, পাকিস্তানে শুধু তিনি ছাড়া আর সব লোকই সৎ? আর সময় হলে তিনি আরও কিছু বলবেন। যে মামলায় নওয়াজ শরীফকে পদত্যাগ করতে হলো সেটার নাম পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি। তাতে শরীফ পরিবারের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১০ হাজার দিরহাম। এই বিনিয়োগ ছিল সংযুক্ত আরব আমীরাত ভিত্তিক একটি অফশোর কোম্পানিতে। সেটাও শরীফের নামে নয়, তার ছেলের নামে। নির্বাচনের আগে সেটা তিনি ঘোষণা করেননি। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে পাকিস্তানের আরও অনেক প্রভাবশালীরই নাম রয়েছে। কিন্তু দডি-ত হয়েছেন শুধু শরীফ পরিবার। অন্যদের ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে এটা ঠিক যে, রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব যারা পালন করেন, তাদের কাছ থেকে অধিকতর সতর্কতাই কাম্য।
ইসলামাবাদে এই রাজনৈতিক গোলযোগ তখনই শুরু হলো, যখন ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন গত এক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকেই তাদের মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়িয়েছে এবং পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। আর ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বলে বলীয়ান হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক ঘৃণা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১০ মাস ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। এই সময়ে প্রায় প্রতিদিন কাশ্মীর সীমান্তে দু’দেশের মধ্যে গোলাবিনিময় হয়েছে। নওয়াজ শরীফের সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্যতার কারণে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেননি।
নওয়াজ শরীফ রাজনীতিতে আসেন ’৮০’র দশকে, সামরিক শাসক জিয়া-উল হকের আমলে। তার পারিবারিক ব্যবসা, শিল্পকারখানা তো ছিলই। সেগুলোকে নওয়াজ পরিবার আরও বাড়িয়ে তোলেন। আর পাকিস্তানে দুর্নীতি মহামারীর মতো বিস্তৃত। এই দুর্নীতি ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি তা আছে সামরিক বাহিনীতেও। পাকিস্তানের ৭০ বছরের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই সামরিক বাহিনী প্রায় অর্ধেক সময় দেশ শাসন করেছে। আর এই সেনাবাহিনী সব সময় রাজনীতিকদের দুর্নীতিবাজ অভিহিত করে তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। ১৯৯৯ সালে নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছিলেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। আর ক্ষমতা দখল করে রাজনীতিকদের শায়েস্তা করার জন্য তিনি গঠন করেছিলেন জাতীয় জবাবদিহিতা ব্যুরো বা এনএবি। এ যাত্রায় শরীফের অনুসারীরা অভিযোগ করেছেন যে, সুপ্রীম কোর্ট নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে ত্বরিৎ ব্যবস্থা নিলেও পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে আর যাদের নাম আছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
খুব স্বাভাবিকভাবেই শরীফের অনুপস্থিতিতে তার রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) দুর্বল হয়ে পড়েছে, যদিও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তার দলই এখনও ক্ষমতায় রয়েছে। তবে কতদিন থাকবে, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ২০১৩ সালের নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হয়ে নওয়াজ শরীফ সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। কিন্তু সেনাবাহিনী মার্কিন মৌন সমর্থনে সে উদ্যোগ ভন্ডুল করে দেয়। একই সঙ্গে তারা দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।  নওয়াজ শরীফ চেয়েছিলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে। সে উদ্যোগ নস্যাৎ করে দেয় সেনাবাহিনী।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সাবেক মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিক্রম জে. সিং নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন যে, নওয়াজ শরীফের পদত্যাগের অর্থ হলো পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে আরও বেশি ক্ষমতা। কারণ পাকিস্তানে সেনাবাহিনীই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কোনো কোনো মার্কিন সংবাদপত্র লিখেছে যে, নওয়াজ শরীফকে অযোগ্য ঘোষণা করে আদালত যে রায় দিয়েছেন, তার পেছনে সেনাবাহিনীর ইন্ধন রয়েছে। গত এপ্রিলে সুপ্রীম কোর্ট নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য একটি যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করে। কিন্তু এ নিয়ে বিচারপতিদের মধ্যেই মতভেদ ছিল। তবে আদালত ঐ তদন্ত দলে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী ও আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর  প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জেআইটি রিপোর্টে শরীফ ও তার পরিবারের আয়ে অসঙ্গতি আছে বলে উল্লেখ করা হয়। লন্ডনভিত্তিক ফিনানশিয়াল টাইমস লিখেছে, ধারণা করা হয় যে, জেআইটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল প্রধানত সামরিক গোয়েন্দাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে।
তথাকথিত পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পার্টি। তিনি রাজনীতিতে আসার পর থেকেই এ কথা ব্যাপকভাবে চালু আছে যে, ইমরান খান সেনাবাহিনীর প্ররোচনায়ই তার রাজনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে থাকেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) বিপুল বিজয় লাভ করে। কিন্তু ব্যাপক কারচুবির অভিযোগ এনে ইমরান খান সে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ২০১৪ সালের আগস্টে ইমরান খানের সমর্থকরা ইসলামাবাদের কেন্দ্রস্থল  দখল করে নেন। তারা কিছু সময়ের জন্য পাকিস্তানের সরকারি টেলিভিশন কেন্দ্রও দখলে নিয়ে নেন। এটাও ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, ঐ গোলযোগ তৈরির পেছনেও সামরিক গোয়েন্দাদের হাত ছিল। সেনাবাহিনী চাইছিল তাদের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নেয়ার জন্য। তখন শরীফ সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরও বাড়ানোরই সিদ্ধান্ত নেন। ‘সন্ত্রাসবাদে’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিলিটারি পুলিশকে আরও ক্ষমতা দেয়া হয়। গোপন সামরিক আদালত স্থাপনেরও অনুমতি দেয়া হয়, যারা ‘সন্ত্রাসবাদে’র কারণে বেসামরিক ব্যক্তিদেরও সাজা দিতে পারে।
পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি যখন সামনে এলো, তখর ইমরান খান সেনাবাহিনীর প্ররোচনায়ই ফের ২০১৪ সালের মতো আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চালান। কিন্তু সরকার ইসলামাবাদে আন্দোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে সে আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যায়। তখন আদালতে বিচার হচ্ছেÑএই যুক্তি দিয়ে ইমরান খান তার আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। ইমরান খান ও এক শ্রেণীর সংবাদপত্র তখন বলতে শুরু করে যে, পাকিস্তানে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। তবে এই দাবি ছিল নিতান্তই অর্থহীন। কারণ পাকিস্তানে বড়লোকেরা হয় কর ফাঁকি দেয়, নয়তো করই দেয় না। বিপুলসংখ্যক মানুষ অতিদরিদ্র। রাষ্ট্রীয় বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় সামরিক খাতে। আর উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা ভারতের সঙ্গে শত্রুতা অব্যাহত রাখার পক্ষে।
ক্ষমতা ছাড়ার আগে শরীফ সেনাবাহিনীকে কার্যত সারা দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে দিয়েছেন। দেশের বৃহত্তম শহর করাচীর কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে আধা-সামরিক বাহিনীর হাতে। বালুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে এক দশক ধরে সেনা অভিযান চলছে। ২০১৪ সালে শরীফ পাকিস্তানি তালিবানদের সঙ্গে একটি শান্তি আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সামরিক বাহিনী উত্তর ওয়াজিরিস্তানের উপজাতীয়দের ওপর ব্যাপক অভিযান চালায়। ফলে তা ভন্ডুল হয়ে যায়। ২০১৬ সালের মার্চে সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে নওয়াজের ঘাঁটি পাঞ্জাবে ব্যাপক সেনা অভিযান পরিচালনা করে। এটা ছিল শরীফের ওপর একটা বড় আঘাত। কিন্তু তিনি পিছু হঠে বলেন, এই অভিযানের জন্য তার সরকার সেনাবাহিনীকে আগেই অনুমতি দিয়েছিল।
পাকিস্তান জাস্টিস প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে ৪৬৫ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশেরই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্যই এসব অভিযোগ আনা হয়। গত জুনে ফেসবুকে একটি মন্তব্য করায় ধর্ম অবমাননা আইনে এক ব্যক্তির মত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষমতাবানরা দরিদ্রদের মানুষই মনে করে না।
যাই হোক, সুপ্রীম কোর্ট আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে নওয়াজ, তার ছয় সন্তানের তিনজন, অর্থমন্ত্রী দারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এনএবিকে চার্জ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি এই প্রক্রিয়া তদারক করবেন। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পিএমএল-এন আপাতত ক্ষমতায় থাকছে। কিন্তু ভাঙনের শব্দ অস্পষ্ট নয়। কারণ নওয়াজের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নাসির আলী খান সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, তিনি আর রাজনীতি করবেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ