ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 August 2017, ২৬ শ্রাবণ ১৪২8, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের সাথে বর্তমানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশলে বিপর্যস্ত রাজধানী

স্টাফ রিপোর্টার : বেসরকারি পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের সাথে বর্তমানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশলের কারণে বিকশিত রাজধানী আজ বিপর্যস্ত। এক পশলা বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে নাকাল অবস্থায় পড়তে হয়। তারা বলেন, মাত্র ৪০ মি.মি বৃষ্টিতে যেভাবে ঢাকা মহানগরী ব্যাপক পানিবদ্ধতার কবলে পড়েছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। ঢাকার পানিবদ্ধতা নিরসনে সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। 

গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি গোলটেবিল কক্ষে “বারংবার জলজটে জনদুর্ভোগ : প্রতিকারের উপায় কি?” শীর্ষক এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশকর্মীরা এ কথা বলেন। বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিনের সভাপতিত্বে সাংবাদিক সম্মেলনে মূল বক্তব্য রাখেন বাপা’র যুগ্মসম্পাদক ও নগরায়ন-সুশাসন কর্মসূচীর সদস্য সচিব স্থপতি ইকবাল হাবিব। এতে আরো বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বাপা’র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মহিদুল হক খান, নির্বাহী সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাপা’র যুগ্মসম্পাদক আলমগীর কবির ও হুমায়ন কবির সুমন উপস্থিত ছিলেন।

মুল বক্তব্যে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, চারদিকে নদীবেষ্টিত মহানগরী ঢাকার সমস্ত দেহজুড়ে ছড়িয়ে থাকা খাল-লেকসহ অন্যান্য পানির আধারগুলো দ্রুত বর্ধিষ্ণু শহরটিকে নিষ্কাশিত করছিল দীর্ঘদিন ধরে, বিকশিত করছিল এর জনজীবনকে। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীর চাপ, আর অতি মুনাফালোভী ভূমি দুর্বৃত্তদের প্রবল পরাক্রমের কাছে হারিয়ে গেছে এর অনেকটাই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত ব্যবস্থা আর উন্নয়নের নামে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ‘উন্নয়ন কৌশল’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ফলে খাল হয়েছে কালভার্ট, লেক হয়েছে বসতি, গাছ হয়েছে জ্বালানি। আজ তাই প্রতি বর্ষায় নগরবাসীর নাকাল অবস্থা। 

তিনি বলেন, পানিজটে শহরের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বিপর্যস্ত। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গেচুরে হয়েছে একাকার আর সেই সাথে পূতিময় দুর্গন্ধযুক্ত পয়ঃমিশ্রিত পানি উঠে আসছে রাস্তা ঘাটে, যখন তখন এক পশলা বৃষ্টিতেই। এখন নগরীতে খাবারের পানিসহ সব জলাধার আর লেকের পানিতে দূষণের মাত্রা এখন তাই অসহনীয় পর্যায়ে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যেও তা হুমকিস্বরূপ। এই প্রেক্ষাপটটি অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচিত, পর্যালোচিত। অনেক পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি আর সিদ্ধান্তও আছে এই অবস্থাটি ঘিরে। তারপরও অবস্থার অবনতি বৈ উন্নতি হয়নি, হচ্ছেও না। 

ইকবাল হাবিব এজন্য ‘ডেভলাপারদের’ মধ্যেকার বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব ও প্রতিপত্তি; সরকারের কার্যকর, সমন্বিত, সার্বিকতা ও সময় নির্ভর পদক্ষেপ গ্রহণে অনীহা; পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততার ও জবাবদিহিতার অভাব; দখলকৃত এসব খাল-নদী ইত্যাদি পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে কাঠামোগত ব্যর্থতা, সেই অর্থে দায়িত্বহীনতা, ইত্যাদি কার্যকারণের পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, যথাযথ নগর উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নে রয়েছে দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড। এখন তাই প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে করে এ ধরণের কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততাকে বাধ্যতামূলক করা যায় এবং তা পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কার্যকর হয়।

তিনি আরো বলেন, এবারের আগাম ও ঘন ঘন বর্ষণের প্রেক্ষাপটে নগরীর এই সমস্যা প্রায় জটিল ও সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। এখন মাঝারী বা হালকা মাঝারী বৃষ্টিপাতেই বিভিন্ন অঞ্চলের তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সৃষ্টি হচ্ছে জলজট, যানজট আর রেখে যাচ্ছে চলাচলের অনুপযুক্ত সড়ক কাঠামো। কখনও কখনও কোথাও কোথাও “স্থানিক” পানিবদ্ধতারও সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে জনদুর্ভোগের শিকার বিশাল জনগোষ্ঠির স্বার্থের কারণ ও প্রতিকার নির্ধারণে সমন্বিত ‘রোড ম্যাপ’ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজউককে দ্রুত ও কঠোর ভাবে ‘সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিকল্পিত পানির আধার, নি¤œাঞ্চল আর প্লাবন ভূমি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ; সি,এস, ম্যাপ অনুযায়ী প্রকৃতিগত খালগুলোর ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে একে সচল রাখার নিমিত্তে সকল দখল অপসারণ করে স্থায়ী সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণসহ পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন তিনি। 

ড. আকতার মাহমুদ বলেন, এবারের ঢাকা মহানগরীর পানিবদ্ধতা ও জনদূর্ভোগের ঘটনা সকল মহলকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। মাত্র ৪০ মি.মি বৃষ্টিতে যেভাবে ঢাকা মহানগরী ব্যাপক পানিবদ্ধতার কবলে পড়েছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, ১৯৬২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ মাষ্টার প্ল্যান নিয়ে পাঁচ বার ষ্টাডি হয়েছে, অনেক পরিকল্পনা হয়েছে। তবে এসবের বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, ঢাকার পানিবদ্ধতা নিরসনে সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এজন্য মহানগরীর বৃষ্টি পানি দ্রুত সরে যেতে নদী পথ পর্যন্ত ড্রেনেজের পুরো চ্যানেল যাতে বাধামুক্ত থাকে তা নিশ্চিত করা ও নিয়মিত তদারকি করতে হবে।

ডা. মো. আব্দুল মতিন বলেন, আমরা প্রায় দেড় যুগ সময় ধরে ঢাকা শহরের পানিবদ্ধতার কারণ এবং এর করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন সময় বলে আসলেও আজও কার্যকর কিছু হচ্ছে না। যার কারণে প্রতি বর্ষা মওসুমে মহানগরবাসীদের ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। শুধু পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হলেই তৎপরতা না বাড়িয়ে, এজন্য একটি কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান করতে হবে। আশা করছি প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় পদক্ষেপে ভবিষ্যতে পানিবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ