ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 August 2017, ২৬ শ্রাবণ ১৪২8, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাবির ১৩ জন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশে দিলো ছাত্রলীগ

 

রাবি রিপোর্টার : রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী আবাসিক হল থেকে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীসহ ১৩ জন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর কারার পরে পুলিশে দিয়েছে বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে হলের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি করে তাদের শিবির কর্মী হিসেবে সনাক্ত করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে শিবিরের বিভিন্ন নথি, কম্পিউটার ও নগদ টাকা উদ্ধার করে। এ সময় হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

আটককৃত ১৩ জনের মধ্যে ১১ জনকে বেধাড়ক মারপিট করায় তাদের চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে ৮ জনের অবস্থা গুরুতর। এদিকে অন্যায়ভাবে হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ছাত্রলীগের মাধ্যমে শিবির কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পুলিশী আটকের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির । 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করে বিশ^বিদ্যালয় প্রক্টর প্রফেসর ড. মো.লুৎফর রহমান বলেন, আমাদের অনুমতি ছাড়াই হলে তল্লাশি চালানো হয়। তবে টহলরত পুলিশ আমাদেরকে জানালে তাদের সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখছিলাম। আটককৃতরা বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে, তাদের খোঁজ নেওয়া জন্য হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষককে পাঠানো হয়েছে। 

আটককৃতরা হলেন, ‘রাবি শিবিরের সাহিত্য সম্পাদক নাবিউল ইসলাম (আরবি মার্স্টাস), শিবিরের সাথী শাহরুল আলম হিমেল (পরিসংখ্যান ৪র্থ বর্ষ), ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি সাহেদ রানা (ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং তৃতীয় বর্ষ), শামসুজ্জোহা হল শিবিরের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন (ইসলামের ইতিহাস তৃতীয় বর্ষ), আশিকুল হাসান নাফিস (নৃবিজ্ঞান, মাস্টার্স), আরিফুল ইসলাম (ফার্সি মাস্টার্স), রাকিব আহমেদ (আইন ২য় বর্ষ), মাহমুদুল হাসান (উদ্ভিদ বিজ্ঞান ৪র্থ বর্ষ), শরিফুল ইসলাম (পরিসংখ্যন ৪র্থ বর্ষ), আব্দুর রাকিব (ইসলামিক ইস্টাডিজ (তৃতীয় বর্ষ), ওয়ালিউল্লাহ (আরবি মাস্টার্স) ও গোলাম রাব্বানী (আরবী ৩য় বর্ষ), আবু জাফর (আরবী)। 

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুর নেতৃত্বে রাত ১২টার দিকে হলের ১৪৩ নম্বর কক্ষে সাহেব রানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে স্বীকার করেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হলের ১৪৮, ১৫০, ১৫৫, ২৪৯, ২৫৪, ২৭৬, ৩৫৮, ৩৬০ ও ৩৬২ নম্বর কক্ষে অভিযান চালিয়ে আরও ১১ জনকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে শিবিরের নথি, রিপোর্ট বই, ডায়েরি, অর্থ বিভাগের ১৯ হাজার টাকা ও শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নাম তালিকা উদ্ধার করে ছাত্রলীগ। 

শিবির কর্মীদের কক্ষ থেকে আটক করার সময় তাদেরকে রড, লাঠি দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধাড়ক মারপিট করে। মারপিটের পরে কেউ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলো না। পরে ছাত্রলীগ হলের অতিথি কক্ষ থেকে তাদেরকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। পুলিশ তাদের চিকিৎসার জন্য ১৩ জনের মধ্যে ১১ জনকে রামেকে ভর্তি করে।

এদিকে রামেক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আহত শিবির নেতা-কর্মীদের রামেকে ৩৩, ৩৯ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড রুমে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। কয়েকজনের মাথা ফেঁটে গেছে, আবার কারোর হাত বা পা ভেঙ্গে গেছে। 

জানতে চাইলে বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে দুজকে আটক করি। পরবর্তীতে মোট ১২ জনকে শিবির হিসেবে সনাক্ত করে সমুচিত জবাব দেয়ার পরে পুলিশে সোর্পদ করা হয়। এ সময় তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে সিলেটে আমাদের ছাত্রলীগ ভাইদের উপর হামলাকারী শিবিরের জবাব দিতে পেরেছি।

এ ব্যাপারে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি এরা শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত। তাদের মধ্যে ১১ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আটককৃতদের মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। 

ছাত্রশিবিরের নিন্দা

মঙ্গলবার মধ্যরাতে হলে ‘শিবির আটক’ অভিযানের নামে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুর নেতৃত্বে ২০/২৫ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী কোন কারণ ছাড়াই নিরীহ ঘুমন্ত সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিবিরকর্মীসহ মোট ১২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের উপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং নগদ অর্থ, মোবাইল, কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লুটপাট করে। তাদেরকে হলের গেস্টরুমে নিয়ে রাতভর নির্যাতন চালিয়ে গুরুতর আহত করে এবং রাবির স্বনামধন্য একটি সাহিত্য পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকসহ ২ জনের পা ভেঙ্গে দেয়। ছাত্রলীগের এধরনের জঙ্গী হামলা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে নৃশংস এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি হাসান তারিক ও সেক্রেটারি লাবিব আব্দুল্লাহ। 

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে জানাচ্ছি এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে মর্মে একাধিকবার জানানো সত্ত্বেও হল প্রাধ্যক্ষ, আবাসিক শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সেখানে যাননি। অথচ হল ও ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের। এমন গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল পদে থেকে তাদের এ ধরণের নীরব ভূমিকা সত্যিই দুঃখজনক। ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে তাদের এধরনের গুরত্বপূর্ণ পদে থাকার কোন যৌক্তিকতা নেই। পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের নীরব দর্শকের ভূমিকায় আমরা স্তম্ভিত এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উপরন্তু নির্যাতিত নিরীহ ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মতিহার থানার ওসি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সমর্থন করা ছাড়া কোন ধরণের অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ নেই। পুলিশের কাছে আমাদের উদাত্ত আহবান যদি নির্যাতিত ছাত্ররা কোন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদেরকে হয়রানি করবেন না। কারণ যেকোন বৈধ সংগঠন সমর্থন করা সকলের সাংবিধানিক অধিকার।

নেতৃবৃন্দ ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের উদ্দেশ্যে বলেন, সিলেটে সংঘটিত একটি অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনাকে ছাত্রশিবিরের উপর চাপিয়ে দিয়ে পুলিশের নির্লজ্জ সহযোগিতায় নিরপরাধ শিবির কর্মীদের উপর নির্যাতনের ঘটনা ছাত্র সংগঠন হিসেবে তাদের দেউলিয়াপনাকেউ তুলে ধরে। এভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ শিবির কর্মীদের উপর হামলা অব্যাহত থাকলে এবং আইন-শৃ্খংলা বাহিনী তাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হলে ছাত্রজনতা আর নিরব ভূমিকা পালন করবে না। ছাত্রশিবির সাধারণ ছাত্রদের সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে এর সমুচিত জবাব দিবে।

এ সময় তারা এঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত সন্ত্রাসীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারপূর্বক যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট উদাত্ত আহবান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ