ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 August 2017, ২৬ শ্রাবণ ১৪২8, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সড়ক-মহাসড়কের মেরামত

এটি একটি পুরনো খবর যে, এবার আষাঢ় আর শ্রাবণের প্রবল বর্ষণে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় দরকার যেখানে ছিল সকল সড়ক-মহাসড়কের মেরামতের কাজে হাত দেয়া সেখানে আবারও বৃষ্টি হতে পারে এবং বন্যাও অবশ্যম্ভাবী ধরনের যুক্তি দেখিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো মেরামতের কাজ বলতে গেলে শুরুই করা হয়নি। ওদিকে এগিয়ে আসছে পবিত্র ঈদুল আযহা। মাঝখানে সময় রয়েছে মাত্র তিন সপ্তাহ। ফলে ধরেই নেয়া হচ্ছে যে, আসন্ন ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাতায়াত শুধু কষ্টকরই হবে না, প্রাণহানির সংখ্যাও এবার নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে। সেই সাথে দুর্ঘটনায় আহতও হবে অনেকে। এ ধরনের আশংকার কারণেই জরুরি ভিত্তিতে সড়ক-মহাসড়কের মেরামত শুরু করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে সরকারকে।
গণমাধ্যমের রিপোর্টে প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও জানানো হচ্ছে। যেমন একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে ঢাকা থেকে বগুড়া যাতায়াতের একমাত্র মহাসড়ক সম্পর্কে বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল হয়ে যাওয়া এ মহাসড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই যানবাহন চলাচলের জন্য বিপদজনক হয়ে পড়েছে। যেখানে-সেখানে অসংখ্য ও গভীর খানাখন্দক তো রয়েছেই, পাশাপাশি আবার যুক্ত হয়েছে তীব্র যানজটের বিড়ম্বনাও। এই মহাসড়কে যমুনা সেতু হয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু যমুনা সেতুর পশ্চিম অংশে প্রতিদিন কয়েকবার করে যানবাহনগুলো যানজটের শিকার হয়। প্রকাশিত রিপোর্টে বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের হাটিরকুমরুল এলাকার উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের প্রবেশদ্বার হিসেবে চিহ্নিত হাটিরকুমরুল এখন বেশি আলোচিত হয় যানজটের জন্য। সেখানে একবার কোনো কারণে যানজটের সৃষ্টি হলে তার ধকল সইতে হয় সারাদিন। কখনো কখনো রাতও পেরিয়ে যায় কিন্তু যানবাহনকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
এমন এক অবস্থার মধ্যেও কিছুদিন আগে হাটিরকুমরুলে মনোরম একটি গোলচত্বর নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছে সরকার। নির্মাণ কাজের সঙ্গে চলছে আশপাশের সড়কে মেরামতের কাজও। ফলে প্রতিদিন এবং প্রতি মুহূর্তে চত্বরটির চারপাশে আটকে পড়ছে শত শত যানবাহন। সেগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে গোল চত্বর নির্মাণের কাজে হাত দেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত ছিল প্রথমে খানাখন্দকগুলো মেরামত করে মহাসড়কটিকে যানজট মুক্ত করা। কিন্তু সেটা করা হয়নি বলেই যানবাহনের পাশাপাশি যাত্রী সাধারণকেও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়।
রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যমুনা সেতু চালু হওয়ার আগে যখন আরিচা ও নগরবাড়ি হয়ে ফেরিতে যাতায়াত করতে হতো তখন ঢাকা থেকে বগুড়া যেতে গড়ে সময় লাগতো ছয় ঘণ্টা। কিন্তু আজকাল যমুনা সেতু দিয়ে ১০ ঘণ্টার আগে বগুড়া যাওয়া বা বগুড়া থেকে ঢাকায় আসা সম্ভব হয় না। যানজটের কারণে প্রতিদিন বরং সময়ের ব্যবধান বেড়ে চলেছে। আশংকা করা হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে আসন্ন ঈদুল আযহার সময় মানুষকে ভীষণ কষ্টের মধ্যে পড়তে হবে। তার ওপর বৃষ্টি যদি হয় তাহলে ভোগান্তির কোনো শেষ থাকবে না। অনেকে হয়তো যানজট ও বিড়ম্বনার ভয়ে বাড়িতেই যাবেন না।
উল্লেখ্য, ঢাকা থেকে সড়কপথে বগুড়ার দূরত্ব ১৯০ কিলোমিটার। মাঝখানে রয়েছে টাঙ্গাইল জেলা। টাঙ্গাইল হয়ে যমুনা সেতুর প্রবেশমুখ এলেঙ্গা পর্যন্ত দূরত্ব ৯৪ কিলোমিটার। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কটিকে চার লেনের সড়কে পরিণত করার জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে মাটি ও বালু ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু সে কাজ চলছে শম্ভুক গতিতে। ঠিকাদারিও পেয়েছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না বলে তারা কাজ করে যাচ্ছে নিজেদের ইচ্ছামতো। সে কারণে এক মাসের কাজ শেষ হতে পেরিয়ে যাচ্ছে ছয় মাস পর্যন্ত। জানা গেছে, ২০১৮ সালের মধ্যে চার লেনের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদাররা এমন ধীর গতিতেই কাজ করছে- যাতে সময়ের সঙ্গে টাকার পরিমাণও বাড়ানো যায়। এজন্যই আসন্ন ঈদের সময় টাঙ্গাইল হয়ে যাতায়াতও অত্যন্ত কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখানে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের উদাহরণ দেয়া হলেও বাস্তবে দেশের সবস্থানে সব সড়ক-মহাসড়কের অবস্থাই অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। তার ওপর আবার কিছু একটা ঘটলেই টঙ্গি ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় বিশেষ করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ভাঙচুর ও অবরোধ শুরু হয়ে যেতে পারে। প্রতিটি শিল্প এলাকায় সামান্য অজুহাতেই ঘোঁট পাকানোর জন্য মুখিয়ে রয়েছে নেতা ও নেত্রী নামের বহু মুখচেনা লোকজন- বিভিন্ন উপলক্ষে যারা বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য বিদেশীদের নিয়োজিত এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তারা এখনো তৎপর রয়েছে। ফলে আশংকা করা হচ্ছে, বেতন-বোনাস ধরনের অজুহাত তুলে ঈদের আগে যে কোনো মুহূর্তে ঢাকা-টাঙ্গাইল হয়ে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের মহাসড়ক বন্ধ করা হতে পারে। ওদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্পর্কিত খবরও ভীতিকর। এবড়ো-থেবড়ো ও বহুস্থানে ভেঙে যাওয়া এ মহাসড়কটিতে যানজট ইদানীং প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মাত্র পাঁচঘণ্টার পথ হলেও আজকাল ১২-১৪ ঘণ্টার আগে এই পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।  সায়েদাবাদ থেকে সিলেট ও কুমিল্লাগামী বাসগুলোকেও বেশ কয়েক ঘণ্টার ফাঁদে আটকে থাকতে হচ্ছে। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের মধ্যে এমন বহু কিলোমিটার সড়ক রয়েছে যেগুলোর অবস্থা এত বেশি শোচনীয় যে, মোটামুটি চলাচলযোগ্য করে তুলতেও মেরামত করতে হবে অন্তত মাসখানেক সময় নিয়ে।
এভাবে নাম ধরে ধরে এলাকার উল্লেখে যাওয়ার পরিবর্তে এক কথায় বলা যায়, দেশের কোথাও কোনো সড়ক-মহাসড়কই যান চলাচলের উপযোগী নেই। আমরা মনে করি, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর ব্যাপারে সরকারের উচিত জরুরিভিত্তিতে তৎপর হয়ে ওঠা। পবিত্র ঈদুল আযহার ধাক্কা সামাল দেয়ার জন্য এই মুহূর্তে মেরামত ছাড়া যেহেতু উপায় নেই সেহেতু মেরামত করা যেতে পারে; কিন্তু সে মেরামত করতে হবে দ্রুত গতিতে। ব্যস্ততার আড়াল নিয়ে এমনভাবে ফাঁকি দেয়া চলবে না- যার ফলে দু’চারদিনের বৃষ্টিতেই সব মহাসড়ক আবারও অচল হয়ে পড়বে। সরকারকে একই সঙ্গে সারা দেশের সকল সড়ক-মহাসড়কের সংস্কার কাজে হাত দিতে হবে। নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের পদক্ষেপও নেয়া দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ