ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 August 2017, ২৬ শ্রাবণ ১৪২8, ১৬ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাধ্বী প্রাচিরা ভারতকে কোথায় নিয়ে যেতে চান

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল এমপি অধ্যাপক সৌগত রায় লোকসভায় শাসকদল বিজেপির উদ্দেশে প্রশ্ন করেছেন, ‘বিজেপি কি মুসলিমমুক্ত ভারত চাচ্ছে?’ ভারতের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনির ঘটনা প্রসঙ্গে লোকসভায় আলোচনার সময় গত ৩১ জুলাই সোমবার তিনি ওই প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ইন্ডিয়া টুডে ও পার্স টুডে পরিবেশিত খবরে আরো বলা হয়, সৌগত রায় বলেন, গণপিটুনিতে হত্যার ৯৭ শতাংশ ঘটনাই কেন্দ্রে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঘটেছে। আমি এর মধ্যে হিন্দু-মুসলিমের প্রশ্ন আনতে চাচ্ছি না, কিন্তু গণপিটুনিতে হত্যার ৯৭ শতাংশ ঘটনাই নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরই ঘটেছে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই মুসলিম। তিনি ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কংগ্রেসমুক্ত ভারতের কথা বলে থাকেন কিন্তু আপনারা কি মুসলিমমুক্ত ভারতও চান? তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গণপিটুনির বিরুদ্ধে আইন তৈরিরও দাবি জানান। এছাড়া সোমবার সংসদে কংগ্রেস এমপি মুহাম্মাদ আসারুল হক টুপি ও বোরকা পরিহিতদের টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, টুপি পরা ও দাড়ি রাখা লোক এবং বোরখাপরা নারীরা ঘরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। লোকেরা তাদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করছে, এর প্রতিবাদ করলেই তারা আক্রমণ করছে। এদিকে সংসদে বিজেপি এমপি হুকুমদেব নারায়ণ যাদব গণপিটুনির ঘটনাকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।
প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত জুন মাসে ভারতের বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেত্রী সাধ্বী প্রাচি ‘মুসলিমমুক্ত ভারত’ গড়ার ডাক দিয়েছিলেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে পাঞ্জাব এবং কেরালায় পৃথকভাবে এফআইআর দায়ের করা হয়। সাধ্বী প্রাচি বলেছিলেন, “আমরা ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ অভিযান সম্পন্ন করেছি, এবার দেশকে মুসলিমমুক্ত করার সময় এসেছে। আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।” সাধ্বী প্রাচির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সে সময় জম্মু-কাশ্মীর বিধান সভাতেও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এর আগে ২০১৪ সালে আরএসএস সংশ্লিষ্ট ধর্ম জাগরণ মঞ্চের নেতা রাজেশ্বর সিং ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতকে মুসলিম ও খৃস্টানমুক্ত করার ঘোষণা দেয়ায় তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বিজেপি সরকারের আমলে ভারতে উগ্রবাদীদের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে, সে কথা আমরা জানি। তবে এমন ক্ষেত্র তৈরির প্রস্তুতি বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। আর এমন পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও ধর্মজাগরণ মঞ্চের মতো সংগঠনগুলো। নরেন্দ্র মোদি তো ওখান থেকেই উঠে এসেছেন।
সাম্প্রতিককালে ভারতে ধর্মীয় উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতার যে পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা অবশ্যই দুঃখজনক। শাসকদলের প্রশ্রয়ে বিষয়টি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। গরুর গোশত ইস্যুতে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। তবে আশার কথা, ভারতের সব রাজনৈতিক দল কিংবা সব নাগরিক উগ্রবাদীদের সমর্থন করছে না। সেখানকার লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তারা সরকারি খেতাবও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আর ভারতের সংবিধানও গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বার্তা বহন করছে। তারপরও ভারতে উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতার মাত্রা বেড়ে চলছে কেন? এই প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে উঠেছে।
ভারতে সাধ্বী প্রাচিরা ধর্মের নামে যে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন, তা হিন্দু ধর্মও অনুমোদন করে না। উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা ধর্মের বার্তা হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে তরুণদের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়।
তরুণরা তো সাহস ও চাঞ্চল্যের প্রতীক, তরুণরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের প্রতীক। তবে সাম্প্রতিকালে আমরা দেশে-বিদেশে তরুণদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক নানা তৎপরতার অভিযোগও লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এর জন্য শুধু তরুণদের দায়ী করলে চলে না, দায়ী করতে হয় বর্তমান সভ্যতা এবং বিশ্বব্যবস্থাকেও। তবে এমন বাতাবরণেও আদর্শবাদী তথা ধর্মপ্রবন তরুণরা উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে। এ প্রসঙ্গে খালিজ টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যায়।
১৬ জুলাই প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়, লন্ডন থেকে সাইকেলে চড়ে হজ্বে যাচ্ছেন ৮ তরুণ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানের ৮ তরুণের একটি দল ছয় সপ্তাহের সফরে লন্ডন থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওয়ানা করেছেন। তারা সাইকেল চালিয়ে লন্ডন থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছবেন। যাত্রাপথে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে অনুদান সংগ্রহ করবেন এবং অনুদানের সেই টাকা সিরিয়ায় জরুরি সেবা কাজে ব্যবহার করা হবে। এর আগে যুক্তরাজ্য এবং মালয়েশিয়াসহ আরও কিছু সংস্থার মানবিক সহায়তায় সিরিয়ায় ৮৫টি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়। তরুণদের সংগৃহীত অর্থ দিয়ে আরো কিছু অ্যাম্বুলেন্স কেনা হবে। এছাড়া সিরিয়ায় জরুরি মানবিক সেবা দিতে যা যা প্রয়োজন তারা তা সরবরাহ করতে চেষ্টা চালাবেন। আমরা মনে করি তরুণদের এই কার্যক্রম সেবার চাইতেও আরো বেশি কিছু। মহান স্রষ্টা মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়ে সঠিক জীবনযাপনের জন্য নির্দেশনাও দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার মূল বিষয় হলো, স্রষ্টার প্রতি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন। ধর্মীয় পরিভাষায় যাকে বলা হয়, ‘হক্কুল্লাহ’ এবং ‘হক্কুল ইবাদ’। ৮ তরুণের হজ্বযাত্রায় আমরা উভয়বিধ দায়িত্ব পালনের উজ্জ্বল উদাহরণ লক্ষ্য করেছি। তারা হজ্বের ফরয ইবাদতের সাথে সাথে সিরিয়ার মজলুম মানুষকে সাহায্যের ইবাদাতও করছেন। তাই বলছিলাম, ওই ৮ তরুণের কার্যক্রম সেবার চাইতেও বেশি কিছু।
মানুষ আসলে স্রষ্টার সাথে কৃত আদি-অঙ্গীকারের কথা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে বলেই তো সে এখন জীবনযাপনে এবং শাসন-প্রশাসনে তার রবের কথা মানছে না। এ কারণে এখন পৃথিবীতে চলছে জুলুম-নির্যাতন, অসহিষ্ণুতা, প্রহসন-প্রতারণা এবং আগ্রাসনের বিভীষিকা। সিরিয়া তার এক বাস্তব উদাহরণ।
৮ তরুণ আলমে-আরওয়ার সেই আদি অঙ্গীকারের কথা যেভাবে তাদের চেতনায় যুক্ত করেছে, অন্যরাও যদি নিজ নিজ অবস্থানে সেই চেতনা যুক্ত করতো, তাহলে এই পৃথিবীর চেহারা হতো অন্যরকম, যেখানে ‘সিরিয়া সংকট’ কিংবা ভারতের অসহিষ্ণুতা-সংকটের মতো কিছু থাকতো না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ