ঢাকা, শুক্রবার 11 August 2017, ২৭ শ্রাবণ ১৪২8, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিলুপ্তির পথে প্রকৃতি প্রাণি ব্যাঙ

খুলনা অফিস : ব্যাঙ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মেরুদন্ডী প্রাণি। ব্যাঙকে উপকারী প্রাণি হিসেবে অভিহিত করা হয়। কুনো, সোনা এবং গেছো ব্যাঙ সহ বাংলাদেশে প্রায় ২০ প্রজাতির ব্যাঙ রয়েছে। ব্যাঙ কিছু সময় পানিতে এবং কিছু সময় স্থলে বাস করে। তবে কিছু প্রজাতির ব্যাঙ সব সময়ই পানিতে বা স্থলে বাস করে। এরা পোকা-মাকড় ও অন্যান্য ছোট ছোট জীবন্ত জীব খেয়ে থাকে। সোনা ব্যাঙ কিংবা রানা তিগরিনা (পুরুষ ব্যাঙ) অধিকাংশ ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে ফসলের উৎপাদন ও ফলন বৃদ্ধিতে সাহায্য এবং জীব-বৈচিত্র্য রা করে।

বাংলাদেশে ব্যাঙ-এর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অবাধে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, বিদেশে ব্যাপকহারে ব্যাঙের রফতানি এবং বৈশ্বিক উজ্ঞতা তথা জলবায়ূর পরিবর্তনের কারণে অধিকাংশ প্রজাতির ব্যাঙ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর। মশা ও ফসলের অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গ সহ বিভিন্ন প্রকার পোকা-মাকড়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে একদিকে যেমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অপরদিকে মশার উপদ্রব বেড়ে গিয়ে নানা রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ব্যাঙ শস্য ক্ষেতের এক’শ প্রজাতির ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে থাকে।  

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাঙমুক্ত একটি ধানের জমির চেয়ে ১০ থেকে ৩০টি ব্যাঙযুক্ত একটি জমিতে শতকরা ১৬ থেকে ৪০ ভাগ ক্ষতিকর পোকা কম পাওয়া গেছে। এর ফলে ৬-১৯ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও ব্যাঙের মলমুত্র মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ব্যাঙের মলমুত্র ও দেহাবশেষে রাসায়নিক সারের চেয়ে ৪ গুন অধিক ফসফরাস ও পটাশিয়াম রয়েছে। যা মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন মতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। 

একটি জরিপের তথ্য মতে, একটি ব্যাঙ মাসে ১০ হাজার কীটপতঙ্গ খায় এবং সারা জীবনে (৪/৫ বছরে) ৫ থেকে ১০ লাখ পোকা-মাকড় খেয়ে থাকে। ব্যাঙ কার্যকরভাবে শুয়ো পোকা, ফড়িং, শামুক, কেঁচো, মশা ও অন্যান্য পোকা ধরে খায়।

খুলনা সাতক্ষীরা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এডি ইব্রাহিম হোসেন জানান, ব্যাঙ প্রতিদিন গড়ে প্রায় শতকরা ৫৪ ভাগ ঘাস ফড়িং, ৪৭ ভাগ হলুদ মাজরা পোকা, ৩৭ ভাগ সবুজ পাতা ফড়িং, ৩৫ ভাগ বাদামী গাছ ফড়িং এবং ৯ ভাগ পামরী পোকা খেয়ে ফেলতে পারে। পোকা-মাকড় দমন এবং মাটির উর্বরতা সংরণ ও বৃদ্ধির জন্য দেশে প্রতি বছর প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা মূল্যের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আমদানি করা হয়ে থাকে। প্রতি বছর পোকা-মাকড়ের আক্রমনের কারণে ফসলের উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হ্রাস পায়। ফলে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। কীটনাশক ফসলকে পোকা-মাকড়ের আক্রমন থেকে রক্ষা করলেও তা পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে এবং মাটির র্উবরতা শক্তি হ্রাস করে। অধিকন্তু, কীটনাশকের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারনে ব্যাঙের বংশ বৃদ্ধিতে বিঘœ ঘটছে। শস্য ক্ষেতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও রাসায়নিক সার পানির সাথে মিশে যায় এবং ব্যাঙের প্রজনন ও বাসস্থানকে বিষাক্ত করে তোলে। তাছাড়া রফতানিকারকরা ব্যাঙের প্রজননের সময়ে ব্যাপকহারে ব্যাঙ ধরে তা বিদেশে রপ্তানি করে। ফলে অতি দ্রুত সোনা ব্যাঙ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্যাঙ চাষের উজ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই প্রাকৃতিক উপায়ে শস্যের অনিষ্টকারী পোকা-মাকড় দমন, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস এবং জীব বৈচিত্র ও পরিবেশের ভারসাম্য রায় দেশে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যাঙের ব্যাপক চাষ ও শস্য ক্ষেতে এর সংরণের ওপর বিশেষ নজর দেয়া একান্ত আবশ্যক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ