ঢাকা, শুক্রবার 11 August 2017, ২৭ শ্রাবণ ১৪২8, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ প্রসঙ্গে

ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের নেয়া ১৬ দিনব্যাপী কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটেছে কিন্তু সাধারণ মানুষ সে সম্পর্কে বলতে গেলে জানতেই পারেনি। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কথা ছিল- ২৫ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তালিকায় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করেছে এমন নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করা। এর মধ্যে যেসব ভোটারের মৃত্যু ঘটেছে তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া ছিল দ্বিতীয় উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ঠিকানা বদলসহ প্রাসঙ্গিক আরো কিছু তথ্যও সংগ্রহ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। 

সে অনুযায়ী ইসি তথ্য সংগ্রহ করার জন্য মাঠকর্মীদের নিযুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশন যেমন ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালায়নি, মাঠকর্মীরাও তেমনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেনি। প্রচারণা না চালানোর ফলে সাধারণ মানুষ বিষয়টি সম্পর্কে জানতেই পারেনি। ওদিকে মাঠকর্মীরাও প্রচারণা চালানোর এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ-খবর করার পরিবর্তে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও এলাকার স্কুলে গিয়ে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেছে। তাদের কাছে যে স্বল্পসংখ্যক মানুষ গেছে তারা গেছে লোকমুখে শুনে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তাদের সঙ্গেও খুব ভালো বা উৎসাহব্যঞ্জক ব্যবহার করেনি মাঠকর্মীরা। অনেকাংশে অনুগ্রহ করার ঢঙে কমিশনের তথ্য সংগ্রহের ফরম হাতে তুলে দিয়েই দায়িত্ব পালন শেষ করেছে তারা। সেই ফরম পূরণ করেছে আগ্রহী মানুষেরা। কেউ নিজে লিখেছে, অনেকে আবার অন্যকে দিয়ে লিখিয়েছে। কিন্তু তাদের দেয়া নাম, পিতা-মাতার নাম, বয়স ও ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্য আদৌ সঠিক কি না, তাদের কারো জাতীয় পরিচয়পত্র আছে কি না- এ ধরনের কোনো ব্যাপারেই যাচাই বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। 

অর্থাৎ সকল অর্থেই দায়সারাভাবে কাজ শেষ করেছে মাঠকর্মীরা। কমিশনের যেসব কর্মকর্তাকে মাঠকর্মীদের কাজ তদারকি করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারাও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। দু’চারটি স্কুল বা কেন্দ্রে গেলেও তারা গেছেন বেড়ানোর মনোভাব নিয়ে। মাঠকর্মীরা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে কি না এবং ফরম পূরণকারীদের পরিচিতিসহ তাদের দেয়া সকল তথ্য যাচাই করে দেখেছে কি না- এ ধরনের কোনো বিষয়েই কর্মকর্তারা তেমন খোঁজ-খবর করেননি। 

এসব কারণেই ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সৃষ্টি হয়েছে সংশয়ের। অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে আশংকাজনক অনেক তথ্য। যেমন প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এবার প্রায় ৩৫ লাখ নতুন ভোটার নিবন্ধিত হবে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। অন্যদিকে নতুন ভোটারের সংখ্যা হয়েছে মাত্র ১৪ লাখ ৫০ হাজারের মতো। মৃত ভোটারদের সংখ্যা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। কারণ, এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯৪ হাজার। অথচ কমিশনের ধারণা ছিল, আরো বেশি সংখ্যক ভোটারের মৃত্যু ঘটেছে। সময়ের ব্যবধানের কারণে সেটা স্বাভাবিকও বটে। কিন্তু মাঠকর্মীরা যে তথ্য-পরিসংখ্যান হাজির করেছে আপাতত কমিশনকে তা-ই মেনে নিতে হচ্ছে। ওদিকে আসল কাজে ব্যর্থ হলেও এবং অযোগ্যতা দেখালেও অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে কিন্তু যথেষ্টই এগিয়ে রয়েছে মাঠকর্মীসহ কমিশনের কর্মকর্তারা। কারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কার্যক্রম পরিচালণার জন্য বাজেট ছিল ৪১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৬ কোটি টাকারও বেশি। এখন চলছে বাজেটের ব্যয় বাড়ানোর জন্য নানামুখী তৎপরতা। বলা হয়েছে, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের পক্ষে বাড়তি টাকা না দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার নামে নির্বাচন কমিশনের ১৬ দিনব্যাপী কার্যক্রম আসলে ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা তথা অনুমান যেখানে ছিল অন্তত ৩৫ লাখ নতুন ভোটারের সেখানে মাত্র ১৪ লাখ ৫০ হাজারের সংখ্যা আদৌ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই কথা মৃত ভোটারদের বেলায়ও সত্য। কারণ, মাঝখানে পেরিয়ে যাওয়া দীর্ঘ সময়ে ১০ কোটি ১৮ লাখ ভোটারের মধ্যে মাত্র সাত লাখের মতো ভোটার মারা গেছে- এমন হিসাব বিশ্বাস ও গ্রহণ করা কঠিনই বটে। বলা বাহুল্য, সব কিছুর পেছনে রয়েছে মাঠকর্মীদের অবহেলা ও ফাঁকিবাজি। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার পরিবর্তে এলাকার স্কুলে অফিস খুলে বসেছিল বলেই জনগণের সাড়া পাওয়া যায়নি। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনও এত বড় একটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের ব্যাপারে যথোচিত গুরুত্বসহ প্রচারণা চালায়নি। কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও যথেচ্ছভাবে ফাঁকি দিয়েছেন। কর্তব্য পালনে অবহেলা দেখিয়েছেন। এটা অবশ্যই অমার্জনীয় অপরাধ।

আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনের উচিত নতুন করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কার্যক্রম হাতে নেয়া। তার আগে কমিশনকে প্রচারপত্র ও পোস্টারের পাশাপাশি রেডিও-টেলিভিশন ও সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাতে হবে, জনগণ যাতে বিষয়টি সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পারে। কোনো এলাকায় কার্যক্রম চালানোর আগে সে এলাকায়ও প্রচারণা চালানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বড় কথা, মাঠকর্মীদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে এবারের মতো স্কুলে বসে দায়সারাভাবে কাজ করার পরিবর্তে তারা কষ্ট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। একই সাথে এমন ব্যবস্থাও নেয়া জরুরি যাতে ইতিমধ্যে বাদ পড়া সকলেই সহজে তালিকাভুক্ত হতে পারে। তাদের যাতে ঝামেলায় পড়তে না হয়। আমরা চাই, সব মিলিয়ে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরি করা হোক। এই তালিকা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হতে পারে। আমাদের ধারণা, গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে থাকা বর্তমান বাংলাদেশে ভোটার তালিকার বিষয়টি যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর- সে কথাটা অনুধাবন করতে ভুল করবে না নির্বাচন কমিশন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ