ঢাকা, শুক্রবার 11 August 2017, ২৭ শ্রাবণ ১৪২8, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচারপতি খায়রুল হক জুডিশিয়াল ক্রাইম করেছেন                              --------------ব্যারিস্টার মওদুদ

 

স্টাফ রিপোর্টার : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের দেয়া রায় নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হকের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় দিয়ে জুডিশিয়াল ক্রাইম করেছেন। তার কোনো লজ্জাবোধ নেই। এখন সরকারি দায়িত্বে থেকে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করতে পারেন না। তাকে একদিন জনগণের কাঠগড়ায় দাড়াতেই হবে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক মুন সিনেমা হলের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত মামলার রায় দিতে গিয়ে উদ্দেশ্যমূলক, পূর্বপরিকল্পিত ও অপ্রাসঙ্গিক ভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছেন বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই আইন মন্ত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার দলের কেন্দ্রীয় অফিসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

প্রসঙ্গত, বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে এনে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সরকার যা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নামে পরিচিত। এরপর নয়জন আইনজীবী এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে রিট আবেদন করলে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ৩ জুলাই এই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগ। ১ আগস্ট আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ হয়। এতে ষোড়শ সংশোধনী ছাড়াও শাসন বিভাগের নানা দিক নিয়ে মন্তব্য্য করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বর্তমান সংসদকে অপরিপক্ক, অকার্যকর বলে উল্লেখ করেন।

গত বুধবার আদালতের এই পর্যবেক্ষণের তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে। আপিল বিভাগের রায়টি অপরিপক্ক, পূর্বপরিকল্পিত ও অগণতান্ত্রিক। এই পর্যবেক্ষণে মানহানিকর বক্তব্য দেয়া হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে এবং সংসদ সদস্যদের হেয় করা হয়েছে।

খায়রুল হক বলেন, অনারেবল চিফ জাস্টিস যদি বলেন, পার্লামেন্ট ইজ ইমম্যাচিউর বা সংসদ সদস্যরা অপরিপক্ক, তাহলে তো আমাকে বলতে হয়, অভিয়াসলি লজিক্যালি চলে আসে, সুপ্রিম কোর্টের জজ সাহেবরাও তাহলে ইমম্যাচিউর। কারণ তারাও তাদের রায়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের বিষয়ে বলেছেন, যা তাদের বলার দরকারই ছিল না।

মওদুদ আহমেদ বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে এ বিএম খায়রুল হক যে রায় দিয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন আগামী দুটি টার্মের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে। তিনি সেখানে গ্রীক ফিলোসফি নিয়ে এসে বলেছিলেন যে, জনগণের স্বার্থে এটা করা যেতে পারে। কিন্তু ১৬ মাস পরে এবিএম খায়রুল হক সাহেব পূর্ণাঙ্গ রায় দিলেন। কিন্তু রায়ের মধ্যে একথাগুলো ছিল না। প্রশ্ন রেখে মওদুদ বলেন, প্রধান বিচারপতির পদে থেকে তিনি এধরনের কাজ কিভাবে করেছিলেন। আমি মনে করি এটি একটি বিরাট অপরাধ করেছিলেন। যেটি ছিল জুডিশিয়াল ক্রাইম।

খায়রুল হকের বক্তব্য প্রসঙ্গে মওদুদ আরও বলেন, পঞ্চম সংশোধনী ও ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি যে অপরাধ করেছেন এর জন্য জনগণের কাঠগড়ায় একদিন তাকে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি বর্তমানে আইন কমিশনের পদে বসে এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে আচরণ বিধি লঙ্ঘন।

মওদুদ উল্লেখ করেন খায়রুল হক এখন কথা বলেন। কিন্তু তিনি মুন সিনেমা হল নিয়ে করা মামলার রায়ে নিয়ে অনেক মন্তব্য করেছিলেন।  বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক মুন সিনেমা হলের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত মামলার রায় দিতে গিয়ে উদ্দেশ্যমূলক, পূর্বপরিকল্পিত ও অপ্রাসঙ্গিক ভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছেন।

 প্রসঙ্গত, মুন সিনেমা হলের মালিকানা দাবি করে বাংলাদেশ ইতালিয়ান মার্চেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুল আলমের একটি রিট আবেদনে হাইকোর্ট ২০০৫ সালের ২৯ অগাস্ট সিনেমা হলটির মালিকানা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয় এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে। এতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং জিয়াউর রহমানের শাসনকে বেআইনী ঘোষণা করা হয়।

মওদুদ আহমেদ আরও বলেন, সংবিধানে দেয়া আছে রিভিউ পিটিশনের কথা। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ করা। তাদের উচিত রিভিউ করা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টকে স্ক্যান্ডালাইজ করার অধিকার তাদের নাই। 

মওদুদ বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা হয়েছে। এ রায়ে কোনও অপ্রাসঙ্গিক কথা রাখা হয়নি। প্রতিটি শব্দই প্রাসঙ্গিক।

রায় নিয়ে আইনমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, আইনমন্ত্রী তার দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন। আইন মন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব হলো-আদালতের রায় বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তিনি আদালতের বিপক্ষে এসে দাঁড়িয়েছেন। 

সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় দিয়ে তিনি সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি যে পদে আছেন সেটা সম্পূর্ণ বেআইনী। আওয়ামী লীগ নেতারা যেভাবে কথা বলেন সেভাবেই বিচারপতি খায়রুল হক কথা বলেন বলেও মন্তব্য করেন এই আইনজীবী নেতা।

সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, এডভোকেট আহমদ আজম খান, উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব হারুন অর রশিদ, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সানা উল্লাহ মিয়া, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ