ঢাকা, সোমবার 18 December 2017, ৪ পৌষ ১৪২৪, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশে আইনের শাসন গুম হয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার: দেশে আইনের শাসন গুম হয়েছে। এখন রাষ্ট্রও গুম হওয়ার পথে রয়েছে। সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশের ১৬ মাস পর বিচারপতি খায়রুল হক ওই রায় পরিবর্তন করে যা প্রকাশ করেছিলেন, তাতে তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এদের আইনের আওতায় আনা দরকার। 

 আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা’ শিরোনামে এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। আলোচনা সভার সমন্বয়ক সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট জ্যোতির্ময় বড়য়ার সভাপতিত্বে এসময় বক্তব্য রাখেন,বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন,  সাতক্ষীরার ভিকটিম জেসমিন নাহার প্রমুখ। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা শীর্ষক আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেদওয়ানুল হক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ছাড়া আইনের শাসন হবে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের ভূমিকা পালন করতে পারবে না। নির্যাতন, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। দীর্ঘদিন যাবত মামলার তদন্ত হয় না, হলেও ধীর গতি, মাইনরিটিদের নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে ঘরের ভেতর আলোচনা করলেও অনুমতি নিতে হয়, ৫৭ ধারার মতো আইনের বৈষম্যমূলক ব্যবহার হচ্ছে। এসব কারণে আইনের শাসন ব্যাহত হচ্ছে। দেশে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার যতদিন বন্ধ না হবে, ততদিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অজ্ঞাতপরিচয় লোকজন অপহরণ করে তিন বছর আগে। অপহরণের পরপরই থানায় মামলা করলেও কারা এর পেছনে ছিল, সে সম্পর্কে তদন্তে কিছু জানা যায়নি।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, টেলিভিশন টক শোতে দেখলাম খুব কথা। যাঁরা অপহৃত হয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা আর কথা বলেন না। এটা বুঝবার বুদ্ধি নেই আপনাদের? কথা কেমন করে বলবে? যদি একটা অপহরণের ঘটনাই হতো শেষ অপহরণের ঘটনা, তাহলে অবশ্যই যাঁরা অপহৃত হয়েছেন, তাঁরা এবং তাঁদের পরিবার কথা বলতেন। একটা অপহরণের ঘটনা সারতে না সারতেই যদি দেখেন সাতজন অপহরণ হয়েছেন, তা–ও আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে এবং এমন পর্যায় থেকে যাকে আপনি ফেলে দিতে পারবেন না।...এটা তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কালচারের ভেতরে ঢুকে গেছে।

বাংলাদেশের মানুষ একটা ‘বিপদে পড়ার কালচারের’ মধ্যে ঢুকে গেছে বলেও মন্তব্য করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, মানুষ এখন প্রতিবাদ করতে গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিপদে পোড়ো না। জনগণের অনাস্থা, অবিশ্বাসের জায়গাগুলো শনাক্ত করে, আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বেলার নির্বাহী প্রধান বলেন, যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা চরম, অবিশ্বাস চরম, সেখান থেকে মুক্তি পেতে হলে, কোনো আইন বাতিল করতে হলে আমাদের বাতিল করতে হবে। যদি বিডিআরের নাম বদলে যেতে পারে, যে সে মূল্যবোধ নিয়ে ব্যাজ পরতে পারছে না, তাহলে র‌্যাবের ব্যাপারেও আসলে আমাদের চিন্তা করতে হবে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মতে, নাগরিকেরা হারিয়ে গেলে নির্বাচনে জেতা যাবে না। তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রধারী নাগরিকেরা হারিয়ে যায়। কেউ বলতে পারে না। পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী বলতে পারবে না, এটা তো দিনের পর দিন হতে পারে না। এটা কোনো কথা? ন্যূনতম জবাবদিহিটুকু থাকবে না? তারা সমানে গ্রেপ্তার করতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, এরেস্ট করতে পারে, কেউ তো বাধা দিচ্ছে না, কিন্তু আমরা হারিয়ে যাব কেন? তাহলে এই পরিচয়পত্র দিয়ে আমাদের লাভটা কী হলো? এটা আমাদের সুরক্ষাকবচ। আর নাগরিকেরা হারিয়ে গেলে কি হবে, আগামী নির্বাচনে জেতা যাবে? কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরং নাগরিকেরা যদি থাকতে পারে, তাহলেই আগামী নির্বাচনে জেতা সম্ভব।

 সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশের ১৬ মাস পর খায়রুল হক ওই রায় পরিবর্তন করে যে লিখিত রায় প্রকাশ করেছিলেন, তাতে তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এছাড়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায় নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তাতে আইনের লঙ্ঘন, আদালত অবমাননা করেছেন।

আসিফ নজরুল বলেন, খায়রুল হকের মতো এই রকম একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা আছে? প্রধান বিচারপতি কি তাকে শাস্তি দিতে পারেন? রাষ্ট্রের এই রকম সর্বোচ্চ ব্যক্তি যদি এমন করেন, তাহলে আপনি পুলিশকে কী বলবেন? 

আসিফ নজরুল আরও বলেন, মানুষ তো গুম হয়নি, আইনের শাসন গুম হয়েছে, গণতন্ত্রের গুম হয়েছে। রাষ্ট্রও গুম হওয়ার পথে। তথ্য প্রযুক্তির ৫৭ ধারার আইন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো আইন। আইনের বৈষম্যমূলক ব্যবহার হচ্ছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য, নির্যাতনের জন্য, মুখ বন্ধের জন্য সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা আইনের অপপ্রয়োগ করছেন।

আসিফ নজরুল আরও বলেন, মানুষ তো গুম হয়নি, আইনের শাসন গুম হয়েছে, গণতন্ত্রের গুম হয়েছে। রাষ্ট্রও গুম হওয়ার পথে। তথ্য প্রযুক্তির ৫৭ ধারার আইন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো আইন। আইনের বৈষম্যমূলক ব্যবহার হচ্ছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য, নির্যাতনের জন্য, মুখ বন্ধের জন্য সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা আইনের অপপ্রয়োগ করছেন। 

ড. জাফরউল্লাহ চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয়করণের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। আমরা সবাই হতাশায় ভুগছি। একটা স্বাধীন কমিশন গঠন করে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান করা যেতে পারে। সাবেক বিচারপতি খায়রুল হককে কে কি কিছু করা যায় না? আমি কিংবা আসিফ নজরুল তো আদালত অবমাননা করিনি। অবমাননা করেছেন খায়রুল হক। 

সুব্রত চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি ঢাকা শহরে যেমন চিকুনগুনিয়া নামক রোগের প্রকোপ বেড়েছে, ঠিক তেমনি পুরো বাংলাদেশ যেন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন, তাতে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে রিভিউ করতে পারেন। কিন্তু সব পক্ষ যেভাবে এ রায়ের পিছু লেগেছে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি ক্ষমার অযোগ্য কাজ করেছেন। তার নিজের কর্মকা- নিয়ে প্রশ্ন আছে।

সুব্রত চৌধুরী আরও বলেন, এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এই একটা জায়গাই আছে। এটা নষ্ট করবেন না। আমাদের মৌলিক অধিকার নিচে নেমে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আগামীকাল সাত খুন হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়। এটাও তো হতো না। এই ঘটনায় জড়িতদের স্ব স্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। হাইকোর্টে মামলা করে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করতে হলো।

সাতক্ষীরার জেসমিন নাহার নামে এক নারী ভিকটিম বলেন, তাঁর স্বামীর তিন দিন হাজতে অবস্থানের সুস্পষ্ট  প্রমাণ আছে। জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের প্রতিবেদনে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পরও পুলিশ অভিযোগ অস্বীকার করছে। তাঁকে ‘জঙ্গি’ বলে প্রচার করছে। 

 জেসমিন নাহার আরও জানান, আমার স্বামীকে গুম করা হয়েছে। আমার স্বামীকে আমি ফিরে পাব কিনা, জানি না। তবে আমি এই জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি, যেন আর কোনও পরিবারকে এই ধরনের ঘটনার শিকার হতে না হয়।

এডভোকেট জ্যোতির্ময় বড়–য়া বলেন, আইনে অপহরণের ব্যাপারে বিধান আছে যখন কোনো ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, তখন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তারা কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গ্রেপ্তার করছে। সে কারণে গ্রেপ্তারের পরিবর্তে তুলে নিয়ে যাওয়া, উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বেআইনি শব্দগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। যেহেতু আইনি প্রক্রিয়া না মেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত প্রতিকার আসলে নেই বলে মন্তব্য করেন জ্যোতির্ময় বড়য়া।

## ####

 

 

 

 

     

 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ