ঢাকা, সোমবার 14 August 2017, ৩০ শ্রাবণ ১৪২8, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গজলডোবার ৫৪ গেট খুলে দিয়েছে ভারত ॥ তিস্তায় পানি বাড়ছে হু হু করে রেড

লালমনিরহাট : বন্যায় ডুবে গেছে রেল লাইন। ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন (বামে) । দিনাজপুর : ক’দিন পরেই কুরবানি ঈদ। দীর্ঘদিন ধরে ছাগল পালন করে কুরবানির সময় তা বিক্রি করে সংসারের প্রয়োজন মেটানোর আশা এই গৃহবধূর। কিন্তু বন্যার স্রোতে সেই আশা ভেসে যেতে বসেছে। শহরতলীর কাঞ্চন মোড় এলাকা থেকে সে তার পালিত ছাগল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে (ডানে) -সংগ্রাম

 

সংগ্রাম ডেস্ক : বন্যার অবনতি ঘটেই চলেছে বিভিন্নস্থানে। উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢল আর অবিরাম বৃষ্টিপাতে বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। বন্যার সঙ্গে সঙ্গে নদী ভাঙনও ভয়ঙ্কররূপে দেখা দিচ্ছে। ভাঙছে ঘরবাড়ি, ফসলের জমি, স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। পানিবন্দী হয়ে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকেই ঠাঁই নিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র অথবা উঁচু সড়কে। কাজকর্ম আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় নানা দুর্ভোগ আর দুর্গতির মধ্যে কষ্টের জীবন কাটাচ্ছে বন্যার্তরা। বিশেষ করে ভারত গজলডোবার ৫৪টি গেটের সবকটি খুলে দেয়ায় তিস্তায় পানি বাড়ছে হু হু করে। এতে বন্যাপরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিস্তা অববাহিকায় সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। সরিয়ে নেয়া হয়েছে লোকজনকে।

নীলফামারী সংবাদদাতা : ৪ দিনের ভারি বর্ষণ আর উজানের ঢলে তিস্তা নদী ফুঁসে উঠেছে। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানি। তিস্তার পানি রবিবার সকাল থেকে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তায় রেড এলার্ট জারী করে মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরে জানা যায়, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের ৫৪ টি স্লুইচগেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সূত্রমতে, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের উজানে দো-মোহিনী পয়েন্টে গত কয়েকদিন ধরে অবিরাম বর্ষণ হচ্ছিল। পানির চাপ সামলাতে গজলডোবার সবকটি গেট খুলে দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। গজলডোবার গেট খুলে দেয়ার কারণে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে হু হু করে বাড়ছে পানি। উজান হতে ঢল বাংলাদেশের তিস্তা নদীতে ধেয়ে আসছে। এতে করে তিস্তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় ভারত তাদের অংশের তিস্তা নদীতে রেড এলার্ট জারি করেছে। বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজের উজানের ভারত তিস্তা নদীর অসংরক্ষিত এলাকায় ও ভারতের দো-মোহনী থেকে বাংলাদেশ কালিগঞ্জ জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত নদীর অসংরক্ষিত এলাকায় জারি হয়েছে হলুদ সংকেত। গজলডোবার গেট খুলে দেয়ার খবরে বাংলাদেশে তিস্তা অববাহিকায় সতর্কতা জারি করেছে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। তিস্তার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তিস্তা ব্যারেজ এলাকার ফ্লাড বাইপাস হুমকির মুখে পড়েছে। যে কোন সময় এটি বিধ্বস্ত হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। সেখানে অবস্থান করছেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমানসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে শনিবার রাত থেকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা অববাহিকার গ্রাম ও চর এলাকায় মাইকিং ও ঢোল-শহরত করে মানুষজনকে নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। রবিবার সকালে ডিমলা খালিশাচাঁপানী ইউনিয়নের বাঁইশপুকুরের একটি সাইট বাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে। 

এদিকে নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছচাপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার, গোলমুণ্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের ১০ সহ¯্রাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে অন্তত পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশাচাঁপানী, খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা জানান, ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে তিস্তার তীরবর্তী গ্রামগুলোর মানুষজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান কুড়িগ্রাম থেকে : ১০ দিনের দীর্ঘমেয়াদী প্রথম বন্যার ধকল কেটে না উঠতেই আবার ভারত থেকে হু হু করে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়ক ভেঙ্গে ৩ উপজেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন। নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপরে। বেড়েছে দুর্ভোগ। টানা বৃষ্টিতে স্থবির কাজকর্ম। ফুরিয়ে গেছে মজুত খাবার। কাজ নেই। ভাতও নেই। খাই কি? সদরের যাত্রাপুর এলাকার বানভাসী মানুষরা এভাবেই প্রশ্ন করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হু হু করে ভারত থেকে নেমে আসা পানির তীব্র স্রোতে কুড়িগ্রাম ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের পাটেশ্বরী বাজার এলাকায় পাকা রাস্তা ভেঙ্গে রাস্তার সাথে অবস্থিত আসাদুজ্জামান প্রতিবন্ধী বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি পানির তোড়ে ভেসে গেছে। এদিকে কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের কাঁঠালবাড়ী বাজার থেকে ছিনাই পর্যন্ত রাস্তার উপর দিয়ে পানি ধেয়ে আসছে প্রচণ্ড গতিতে। 

সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার এবং পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমারের পানি বিপদসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

রাজারজাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ারচরে বাঁধ ভেঙ্গে এক মহিলা শিশুসহ নিখোঁজ হয়েছে। জেলার সর্বত্র শুধু পানি আর পানি। বানভাসী মানুষের আহাজারি।

ফলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে জেলার রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও সদর উপজেলার ৫৫ ইউনিয়নের প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ। তলিয়ে গেছে ২৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ উচঁ জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে বন্যা কবলিত মানুষজন।

কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলাসহ সোনাহাট স্থল বন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থা।

পানির তীব্র স্রোতে সদরের আরডিআরএস বাজারে ৩০ মিটার ও ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমন্ডলে ১৫ মিটার বাঁধ ভেঙ্গে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষজন সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আশ্রয় নিয়েছে।

 জেলার ৯ উপজেলার অন্তত ৫৫ ইউনিয়নের ৫শতাধিক গ্রামের প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেক বানভাসী পরিবার ঘরের ভিতর উচুঁ মাচান বেঁধে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে। পাঠদান বন্ধ রয়েছে ২ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

আমিনুল ইসলাম, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল ও অবিরাম বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম-রংপুর আর কে রোডে পানি উঠায় চরম জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় বাস মিনিবাসসহ সকল যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বন্যা। বন্যা পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে চরম অবনতি হওয়ায় উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের ধরলার কালুয়া ও বাংটুর ঘাট বাঁধ ভেঙ্গে প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। অপরদিকে তিস্তা নদীর পানিও বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চরাঞ্চলগুলো ডুবে যাওয়ায় চরের প্রায় ২হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে গৃহপালিত গবাদীপশু গরু-ছাগল-ভেড়া, হাঁস-মুরগীও পানির উপরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। চরম সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের। অনেক পানিবন্দী পরিবার গবাদী পশুসহ বাঁধের অপরদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বাঁধে এবং অন্যের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া ঘরে পানি উঠায় অনেকে মাচা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এদিকে ধরলা নদীতে ৩টি লাশ ভেসে এসেছে বলে বন্যাকবলিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য বেশ কয়েকটি স্থানে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। ওই সব ক্যাম্পে চিকিৎসা প্রদান অব্যাহত রয়েছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে।

ছিনাই ইউনিয়নের ছিনাই কিং আবুল হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর তৈয়ব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যাল, নামাভরত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বগুড়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিতাব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,ছিনাই হাট বড় ঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিশামত ছিনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেখলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঘব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালুয়ার চর নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মুসুল্লী পাড়া দাখিল মাদরাসাসহ ১৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠায় প্রতিষ্ঠনগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আরো ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যাকবলিত মানুষ আশ্রয় নেয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। 

১৩ আগস্ট রোববার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মইনুল ইসলাম জানান, বন্যাকবলিত পানিবন্দী আড়াই হাজার পরিবারের মধ্যে ১০ কেজি করে চাল, শুকনা চিড়া-গুড়-মুড়ি-চিনি বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ৪০ হাজার টাকার অনুদান পাওয়া গেছে। এছাড়া বন্যা কবলিতদের জন্য আরো বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। ত্রাণ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমজাদ হোসেন পার্বতীপুর : ৩ দিনের টানা অবিরাম বর্ষণে পার্বতীপুর বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির সদ্য রোপণকৃত আমন ধানের চারা ৩ থেকে ৪ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ খবর নিশ্চিত করেছে পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। আকাশের বৃষ্টি বন্ধ না হলে বা ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে বন্যার পানি নেমে না গেলে উপজেলায় আমন চাষে চরম বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উপজেলার করতোয়া, ছোট যমুনা, তিলাই ও সাকোয়া নদীর পানি বিপদ সীমার ২ থেতে ৩ ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে পলাশ বাড়ী ইউনিয়নে ৫টি, রামপুর ইউনিয়নে ৩টি , চন্ডিপুর ইউনিয়নে ৭টি, হাবড়া ইউনিয়নে ৮টি, হামদিপুর ইউনিয়নে ৬টি, এবং মন্মথপুর ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রমের কয়েক হাজার মানুষ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরকে চেয়ারম্যানদের উদ্যোগে খাবার ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে। বন্যার পানিতে গ্রাম গুলো প্লাবিত হওয়ায় প্রায় সহশ্রাধিক কাচাবাড়ী বিধস্থ হয়েছে। ৩দিনের টানা বর্ষণের কারণে দিন মজুর, ভ্যান চালক ও কুলি কামাররা কাজকর্ম করতে না পারায় চরম কষ্টে দিন যাপন করছেন। ব্যনার কারণে পার্বতীপুর-পঞ্চগড়গামী কাঞ্চন এক্সপ্রেস ও ঠাকুরগাও গামী ডেম্যু ট্রেনটি যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। পার্বতীপুর-দিনাজপুর ও আমবাড়ী-দিনাজপুর সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ঐ ২ সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পার্বতীপুর-ঢাকাগামী সকল নাইট কোচ গুলোর যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। ফলে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। 

হাবড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আনিছুর রহমান জানান, তার ইউনিয়নে ৫নং ওয়ার্ডে প্রায় ২শ কাঁচা ঘরবাড়ী, রামরায়পুর চৌধুরী পাড়ায় ৩০টি ও কাটলা পাড়ায় ১০০টি কাঁচা ঘরবাড়ী বিধস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার মানুষ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন।

মাসউদ রানা, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা : ব্রহ্মপূত্র, ধরলা, দুধকুমর ও তিস্তা নদীর বানের পানি উপজেলাকে আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে ফেলেছে। এক রাতের ব্যবধানে ৪টি নদ-নদীর বানের পানিতে উপজেলার ৮ ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান,তার ইউনিয়ন ধরলা,দুধকুমর ও ব্রহ্মপূত্র নদ বেষ্টিত। ধরলা নদীর পানি স্বরণ কালের ভয়াবহ আকার ধারণ করায় তার ইউনিয়নের ২২ হাজার মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম আকার ধারণ করছে। ব্রহ্মপূত্র বিচ্ছিন্ন সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৫২ টি চর তলিয়ে যাওয়ায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন বিএসসি জানান, চর গুজিমারী, চর দাগারকুটি,বাবুরচর, গাবুরজান,র নয়াডারা, শ্যামপুর, তাঁতিপাড়া, হাতিয়া ভবেশ, অনন্তপুর সহ নদ অববাহিকার বেশিরভাগ গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এদিকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দলদলিয়া ইউনিয়নের চররতিদেব,ঠুটাপাইকর, চরঘাটিয়ালপাড়া. কর্পূরাখাস, চর অর্জুন, অর্জুন, লালজুম্মা, চাপড়ারপাড়, রেডক্রস, বসনিয়াপাড়া গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। পরিবার পানিবন্দী হয়েছে। ঠুটাপাইকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,কর্পূরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঠুটাপাইকর উচ্চ বিদ্যালয়সহ ঠুটাপাইকর বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের বেশির ভাগ রাস্তা তলিয়ে যাওয়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান মুন্সি জানান। গতকাল রোববার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বন্যা কবলিত দলদলিয়া ইউনিয়ন পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের ত্রাণ সহায়তার আশ^াস দিয়েছেন। বজরা ইউনিয়নের সাদুয়াদামার হাট, বিরহিমচর, পূর্ববজরা, চর বজরা, খামার বজরা গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ১০হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বজরা কাশিমবাজার সড়কের হাঁসখাওয়া ব্রিজ যেকোন মুহূর্তে ভেঙ্গে গিয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। গুনাইগাছ ইউনিয়নের টিটমা,কাজিরচক, সন্তোষঅভিরাম, শুকদেবকুন্ড, রাজবল্লগ্রামের প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। থেতরাই ইউনিয়নের জুয়ানসতরা, খারিজালাটশালা, চরগোড়াইপিয়ার, রামনিয়াশা, চর গোড়াইপিয়ারমধ্যচর, চর হোকডাঙ্গা গ্রামের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত এলাকার অনেক কৃষকের পাটজাগ পানির তোড়ে ভেসে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসার অশোক কুমার রায় জানান,উপজেলার ১০ হাজার ১ শত হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত, ১ শত হেক্টর জমির বীজতলা ও ২ শত হেক্টর জমির শাক-সবজি তলিয়ে গেছে। উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, উপজেলার ২৩ হেক্টর জমির ১৬৫ টি পুকুরের ৩৫ লক্ষ টাকার মাছ ভেসে গেছে। গতকাল রোববার পর্যন্ত ৮ ইউনিয়নে ২৬ মেঃটন খয়রাতি চাল বিতরণ করা হয়েছে। এসব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা বলেন, দুর্গত মানুষের তুলনায় ত্রাণ সহায়তা খুবই অপ্রতুল।

জামালপুর সংবাদদাতা : জামালপুরে দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিয়েছে। যমুনার নদী এবং ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ১২ আগস্ট বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্ট যমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ১১ সে: মি: উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড মাপক গেজ পাঠক আব্দুল মান্নান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে জামালপুরে দ্বিতীয় দফা বন্যায় দেওয়াগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার নিম্নঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকাবাসীরা জানায় এবার বন্যায় সদ্য রোপিত রোপা আমণ ধান, কাঁচা তরিতরকারী পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ থেকে আবদুস সামাদ : সপ্তাহকালব্যাপী টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীতে আবারপানি বাড়ছে। গতকাল (রবিবার) ২৪ ঘন্টায় বানের পানি ৪৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির ফলে কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালি, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ২ শতাধিক গ্রাম পুনরায় বর্ষা কবলিত হয়ে পরেছে। নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যেই নদী তীরবর্তী অনেক নীচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান আগামী ২/৩ দিনে পানি ব্যাপক বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধের ঝুকিপূর্ণ এলাকা গুলি নজরদারীতে রেখেছে। তিনি জানান যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে।

বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা : রাজশাহীর বাগমারায় টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে গতকাল রোববার উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের বীরকয়া এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। গতকাল সকালের দিকে বাঁধ ভেঙ্গে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মাছ। পানির গতিতে বন্যা কবলিত এলাকার লোকজন বাড়ি-ঘর নিয়ে ভীতি গ্রস্ত হয়ে পড়েছে। 

জানা গেছে, এবারে বর্ষার শুরুতে গত দু’ দফায় টানা বর্ষণে উপজেলার নদ-নদী, খাল-বিল ও পুকুর পরিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এছাড়া টানা বর্ষণের সাথে উজানের পানি মিলে পানির তোড়ে এলাকায় দেখা দিয়েছে প্রবল বন্যা। এতে করে উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের লাককাটি বিলের বীরকয়া এলাকার বটতলা স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ী বাঁধ ভেঙ্গে বিল ও গ্রামের মধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। গ্রামের নিম্নাঞ্চলের কৃষি আবাদ তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে শত পান বরজ, ধান, মরিজ, পাট ক্ষেত, ভেঙ্গে পড়ছে কাঁচা ঘরবাড়ি। শত শত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। হলুদঘর গ্রামের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম জানান, বাঁধ ভেঙ্গে পানি বিলের মধ্য দিয়ে গ্রামের ভিতর প্রবেশ করেছে। এতে হলুদঘর, খয়রা, মন্দিয়াল সাঁইপাড়, বীরকয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের ফসলি জমি ও বাড়ি-ঘর ডুবে গেছে। এতে তারসহ আমে পাশের গ্রামের অন্ত ৭০/৮০ জন লোকের পান বরজ পানিতে ডুবে গেছে। ফসলি উড়তি ধান, পাট, মরিজসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরো জানান, তার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল দিয়ে পানি প্রবেশ করে উপজেলার আরো ৪টি ইউনিয়নে পানি প্রবেশ করেছে। এতে করে ওই সব ইউনিয়নের পানবরজ ও উড়তি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির সম্মখীন। একই ভাবে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ আব্দুল জব্বার জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত ফকিরনী নদীর বাধঁ ভেঙ্গে তার ইউনিয়ন বাসুপাড়াসহ শুভডাংগা, আউচপাড়া, নরদাশসহ ৫টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে গতকাল বিকেলে উপজেলা চেয়ারম্যান জাকিরুর ইসলাম সান্টু ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক ঘটনা স্থল পরিদর্শন করেছেন। এতে জাকিরুল ইসলাম সান্টু বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি উচ্চ মহলের সংগে কথা বলেছেন। শ্রীঘ্রই ব্যবস্থা হবে বলে জানান তিনি।

বগুড়া অফিস ঃ একদিন আগে যে নদীর পানি ছিল বিপদসীমার অনেক নিচে সেই যমুনা নদীর পানি বগুড়ার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে বর্তমানে প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে। চব্বিশ ঘন্টায় পানি বেড়েছে ৭১ সেন্টিমিটার। ভারত থেকে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে হু হু করে বাড়ছে যমুনার পানি। ফুলে ফেঁপে উঠছে নদী। ভয়াবহ বন্যার আশংকা আতংকিত হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের লাখো মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, শনিবার বিকেলেও বিপদীসার নিচ দিয়ে যমুনা নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু ভারত গজল ডোবা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দিলে শনিবার সন্ধার পর হু হু করে পানি বাড়তে থাকে বগুড়ার যমুনায়। অতিরিক্ত পানির চাপে সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশায় পুরাতন বাঁধে ভাঙ্গন ধরেছে। এছাড়াও চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের মানিকদাইড় চরে স্রোতের গতি বৃদ্ধির ফলে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। 

সারিয়াকান্দি উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়নগুলো হলো- কাজলা, চালুয়াবাড়ী, চন্দনবাইশা, কর্ণিভাড়ী, বোহাইল ও হাটশেরপুর। এসব এলাকার জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে, পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী মজুদ আছে বলে তিনি জানান।

এদিকে, প্রথম দফা বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই দ্বিতীয় দফা বন্যার আশংকায় নদীপাড়ের মানুষের মাঝে আতংক দেখা দিয়েছে। বাঁধে আশ্রয় যেসব পরিবার তাদের বাড়ীঘরে ফিরতে শুরু করেছিলেন তারা আবারও বাড়ীঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে শুরু করেছেন।

মোঃ লাভলু শেখ, লালমনিরহাট থেকে : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে লালমনিরহাটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। লালমনিরহাট রেল বিভাগের মহেন্দ্রনগর-তিস্তা রেল স্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে বন্যার পানিতে রেল লাইন ডুবে যাওয়ায় ৩টি রেল সেকশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে রাজধানীর সাথে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। বন্যার পানির তোড়ে রাস্তা-ঘাট ও ব্রিজ-কালভাট ভেসে গেছে। ফলে লালমনিরহাট জেলা সদরের সাথে ৪২টি ইউনিয়নের যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ে। বন্যার পানির তোরে শিশু নাজিম (৮) সহ ৫জন নিখোঁজ হয়। পরে নিখোঁজদের মধ্যে শিশু নাজিমসহ ২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধরলা নদীর বাম তীর সংরক্ষন বাধের ২০ মিটার ধ্বসে যাওয়ায় সদর উপজেলার কুলাঘাট মোগলহাট ও বড়বাড়ী ইউনিয়নের সম্পূর্ণ পানির নিচে রয়েছে। পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সদর উপজেলার গোকুন্ডা, রাজপুর ও খুনিয়াগাছ, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ও পলাশী ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা, তুষভান্ডার ও ভোটমারী, হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী, সিন্দুনা, পাাটিকাপাড়া, পারুলিয়া, সিংগীমারী ও পাটগ্রাম উপজেলার জগৎবেড়, শ্রীরামপুর, বুড়িমারী, দহগ্রাম আঙ্গরপোতাসহ জেলার ৪২টি ইউনিয়নের বন্যায় কবলিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নে বানভাসী পরিবার গুলো চৌকির উপর এবং চাংড়া পেতে জীবন যাপন করছে। ওই সব পরিবারের মাঝে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। অনেক বানভাসী পরিবার বাড়ী-ঘর ছেড়ে গাবদি পশু নিয়ে উচু স্থানে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। লালমনিরহাট রেল বিভাগ সুত্র জানায়, রেল লাইনে বন্যার পানি উঠায় এ বিভাগের ৩টি সেকশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে রাজধানীর সাথে লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম দুটি জেলার সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে বন্যায় রোপা আমনের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। রোপা আমনের ক্ষেত গুলো গত ৩ দিন ধরে পানির নিচে থাকায় অনেক ক্ষেতের রোপা আমনের চারা পচে যাওয়ার আংশকা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বন্যায় রোপা আমন ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বেশি ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। বীজ তলা গুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, নতুন করে বীজ তলার অভাবে বন্যা পরবর্তী রোপ আমন রোপন করা সম্ভব নয়। এছাড়া লালমনিরহাট জেলায় ৬ হাজার ৪শ পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এতে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সফিউল আরিফ জানান, বন্যায় বানভাসী প্রায় ১ লক্ষ পরিবারকে জিআর হিসেবে ১ লক্ষ ৬০ হাজার মেক্ট্রিকটন চাল ও নগদ ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে এ জেলায় কত পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সঠিক তথ্য দিতে পারেনি।

দিনাজপুর অফিস : তিন দিনের টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের পানিতে দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দিনাজপুরের প্রধান নদী পূণর্ভবায় ৮০ সেন্টিমিটার এবং আত্রাইয়ে ৮৫ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পূণর্ভবা নদীর পানির তোড়ে গতকাল রোববার ভোরে মাহুতপাড়া তুত বাগানের কাছে শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। প্রথমে বিজিবি এবং পরে রংপুর ৬৬ ডিভিশন পদাতিক সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ উদ্ধারকারী টিম বাঁধটি মেরামতের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে ডুবে গেছে শহরের বেশকিছু এলাকা। দ্রুতগতিতে শহরের নতুন নতুন এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। ফলে শহরের জনজীবন প্রায় থমকে দাঁড়িয়েছে। দোকানপাট অধিকাংশ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। মানুষ স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। শহরের সাথে আশপাশের জেলা-উপজেলাসহ রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রেল যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে চরম দূর্ভোগে পড়েছে যাত্রী সাধারণ। দু’দিন ধরে শহরের স্কুল-কলেজ অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে। গতকাল বন্যা পরিস্থিতির অবনতির জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ডিগ্রী পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়। জেলার হাকিমপুর উপজেলার হিলি স্থলবন্দরের আমদানী-রপ্তানী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। এছাড়া শহরের হঠাৎপাড়া এলাকায় পানিতে ডুবে এক কিশোর ও কাহারোল উপজেলায় দেয়াল চাপায় এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ