ঢাকা, সোমবার 14 August 2017, ৩০ শ্রাবণ ১৪২8, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অভিমত

১.
ক্ষমতার দাপটে তুফনরা যখন ধর্ষক
-মো. তোফাজ্জল বিন আমীন
আর কতকাল সংবাদের শিরোনামে চাপাতি বদরুল আর তুফানের অপর্কমের কাহিনী মুদ্রিত হবে? চাপাতি বদরুল প্রকাশ্য দিবালোকে সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। বদরুলের বিচারের রেশ কাটতে না কাটতে গত ২৯ জুলাই শুক্রবার বিকালে বগুড়ায় কলেজে ভর্তি করে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক ছাত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেন বগুড়ার শহর শ্রমিক নেতা তুফান সরকার। শুধু তাই নয়, এই ছাত্রী ও তার মাকে বেদম পিটুনি দিয়ে মাথা ন্যাড়া করে এই নরঘাতক। খুন, চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা, দখল সব কিছুই যেন তার কাছে মামুলি ব্যাপার। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত, হত্যাচেষ্টা, মাদকব্যবসা ও চোরাচালানের ছয়টি মামলার আসামী তুফান। তবে একজন তুফান সরকারের তুফান সৃষ্টির ক্ষমতা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতা-নেত্রীদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। সরকারের কাছে দেশের হাজারো মানুষের জিজ্ঞাসা এত কম বয়সে কী করে অর্থ-বিত্তের মালিক হলেন তুফান সরকার? মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের নাম যখন ধর্ষক হিসেবে সংবাদের শিরোনাম হয় তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে জাতি উত্তম চরিত্র আশা করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে নিজ দলের কর্মীদের অপর্কম অন্যদলের উপর চাপিয়ে দেয়া মোটেও উচিত নয়। অপরাধী যে দলের হোক তার শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তুফান কোন দল করে এটা বড় কথা নয়! সে আত্মস্বীকৃত অপরাধী দুষ্কৃতকারী। আওয়ামী লীগ তুফানকে অস্বীকার কিংবা বহিষ্কার করলেই কি মা-মেয়ে তাদের হারানো ইজ্জত ফিরে পাবে? সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসনের ব্যতয় ঘটে তখনই কেবল বদরুল তুফানরা জন্ম নেয়। তুফানরা তো ধর্ষক হয়ে জন্মায় না। তারা তো কোন না কোন এক মায়ের সন্তান। জন্মধাত্রীকে তো দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ তুফানকে ধর্ষক হওয়ার উৎসাহটা কারা জুগিয়েছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে প্রকাশ্যে তুফানরা নারীর ইজ্জত লুটে নেয় তা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর উদঘাটন করা জরুরী। উন্নয়নের মহাসড়কে জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন না হলেও ধর্ষণের জোয়ার বইছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। দেশের পরিস্থিতি কেমন তা বুঝার জন্যে বেশি জ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই, মা-মেয়ের একসঙ্গে নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে আইনের শাসনের বাস্তব চিত্র জাতির সামনে আবারও উন্মোচিত হয়েছে।
পত্রিকার পাতায় ধর্ষণের শিরোনাম আর দেখতে ইচ্ছে করে না। প্রতিনিয়ত ঘুমানোর আগে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি আগামীকালের দিনটা যেন সুন্দর ও ভালো হয়। কিন্তু কোথাও শান্তি স্বস্তির খবর ততটা মুদ্রিত হয়নি যতটা না ধর্ষণের হয়। একের পর এক অপকর্ম, দুনীতি, দুঃশাসন, ধর্ষণের বিভীষিকায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। মানুষের অবস্থা দিনকে দিন খারাপ থেকে আরো খারাপতরের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে। নারী ও শিশু ধর্ষণের বিরাজমান চিত্র আতংকিত করে তুলেছে অভিবাক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের। প্রতিয়িত দেশের কোথাও না কোথাও তরুণী, কিশোর বা শিশুকে মানুষরূপী দানবেরা ধর্ষণ করছে। বিচার চাইতে গিয়ে ধর্ষিতা ও তাদের স্বজনরা কখনও কখনও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর হাতে নিগৃহীত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। আবার ক্ষমতার দাপটের কারণে প্রভাবশালীদের অপকর্মের কথা ভুক্তভোগীরা বলতে পারছে না। ধর্ষকের সাজা যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ডের বিধান থাকলেও মানুষরূপী হায়েনাদের লালসার শিকার থেকে রেহাই পাচ্ছে না তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃয়োবৃদ্ধরা। এক দেশে তো দূরকম আইন থাকা উচিত নয়! কোথায় ঘুমিয়ে আছে মানবাধিকারের বিবেক, কোথায় ওপারের চেতনা ব্যবসায়ীরা, কোথায় সুলতানা কামাল, আর কোথায় ইমরান সরকারের শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-নেত্রীরা। তোমাদের বিবেক আজ কেন জাগ্রত হচ্ছে না এটা জাতি জানতে চায়? ’৭১ সালের ধর্ষণকারীদের শাস্তির জন্যে মাসের পর মাস শাহবাগের রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করছো অথচ আজ ৩ বছরের শিশু তানহা এই রাজধানীতে ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুর মিছিলে সামিল হচ্ছে। কিন্তু তোমরা তার বিচারের দাবিতে গণজাগরণ তো দূরের কথা একটু টুঁশব্দ পর্যন্ত করার সাহস করোনি। তোমাদের মতলবটা জনগণ বুঝে গেছে?
দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির জন্য বিরোধীদল বা জোটের দোষ এখন আর ক্ষমতাসীনরা দিতে পারছে না। কারণ বিএনপি বা জামায়াতের সংবাদ এখন আর কাউকে আলোড়িত করে না। বরফের চেয়ে বেশি ঠান্ডা অবস্থানে বিরোধীজোটের রাজনীতি চলছে। কথায় আছে অভ্যাস মানুষের দাস। আওয়াম লীগের অবস্থাও তাই হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে জামাত বিএনপিকে রাজনীতির মাঠ থেকে বিতাড়িত করতেই দেখামাত্র গুলীর ব্যবস্থা তারা নিয়েছে। বিরোধী জোট যখন আন্দোলনের গর্তে ঠিক তখন তারা ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। পৃথিবীতে এমন খেলা এখনও আবিষ্কার হয়নি যে খেলা একা একা কেউ খেললে স্টেডিয়াম দর্শকে পূর্ণ হয়ে যায়। ক্রিকেট খেলতে গেলেও তো বাবা দুটিমের প্রয়োজন হয়। তাহলে রাজনীতির মাঠে কেন শুধু এটিম থাকবে? এই বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের ভেবে দেখার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের সোনার ছেলেরা এখন বিটিম খুঁজে পাচ্ছে না বলেই তারা নানা অপর্কমে জড়িয়ে পড়ছে। এই সরকারের শাসনামলে গত ৮ বছরে তুফান বদরুলের জন্ম হয়েছে। অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ থেকে বটগাছে পরিণত হয়েছেন। একসময় যারা টিনের চালের ছাউনির নিচে বাস করতো তারা এখন ৫ তলা, ৬ তলা বাড়িতে এসির রিমোট কন্ট্রোল ছেড়ে ঘুমান। কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির ভার এখন ক্ষমতাসীনরা বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন বলেই তো সড়ক ও সেতু মন্ত্রী বলছেন ক্ষমতা না থাকলে পালাইবার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা চাই না কোন রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী পালিয়ে থাকুক। বর্তমানে তো অনেকে বছরের পর বছর ধরে পালিয়ে পালিয়ে জীবনযুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি টেনে বেড়াচ্ছে। এটাতো অস্বীকার করা যাবে না যে, তুফান সরকারদের উত্থানের পেছনে রয়েছে রাজনীতির লম্বা হাত। যে রাজনীতির বিষবৃক্ষের বিষফল বদরুল, তুফান সরকাররা, সেই বৃক্ষকে অটুট রাখলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা যাবে না এই বিষয়টি যত দ্রুত ক্ষমতাসীনরা অনুধাবন করবেন ততই দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের ভাষ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৭১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২৪ জন। যৌতুকের অভিশাপের শিকার হয়েছে ১২৮ জন। এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছে ৩০ জন। তুফান সরকারের তুফান সৃষ্টিকারী প্রলয়ের ওছিলায় শুধু বগুড়ার তুফান বন্ধ করলেই হবে না দেশের আনাচে কানাচে ঘাপটি মেরে থাকা হাজারো তুফানকে আইনের আওতায় আনতে হবে। গোটা দেশেই এখন কান পাতলে তুফানদের গর্জন শোনা যায়। তারপরও বগুড়ার পুলিশ প্রশাসন স্বস্তির পাল আকাশে উড়িয়ে দিয়েছে যা প্রশংসার দাবি রাখে। তারা তৎপরতা চালিয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনায় জড়িত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকেই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। দায়িত্বশীল ভূমিকার পরিচয় দিয়েছেন বগুড়ার ডিসি ও এসপি সাহেব। আইনের হাত যে লম্বা এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে সেটা তারা প্রমাণ করেছেন। প্রশাসনের নেতিবাচক ভূমিকায় মুখ ফিরিয়ে নেয়া সাধারণ মানুষ আজ প্রশাসনকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। তাই সরকারকে অনুরোধ করব কোনো ধর্ষক যেন সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ে পার পেয়ে যেতে না পারে। সে বিষয়টি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে নিশ্চত করা হোক। ধর্ষণকারীদের নির্যাতন বন্ধ করার প্রয়াসে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব সর্বস্তরে চালু করা প্রয়োজন। আমরা আশা করব সরকার উন্নয়নের মহাসড়কে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে তুফানদের রাশ টেনে ধরবে।

২.
শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে হামলা ও মামলা
-হোসাইন আনোয়ার
বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা দিয়েই আজকের লেখা শুরু করছি। তাঁর মতে-“মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা।” মোতাহার হোসেন চৌধুরী তার শিক্ষা ও মনুষত্ব প্রবন্ধে বলেছেন-“মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা রয়েছে পশুত্ব ও মনুষত্ব। পশুত্ব থেকে মনুষত্বের স্তরে পৌঁছার মাধ্যম হলো শিক্ষা।” এভাবে অনেক বিখ্যাত লেখক ও সাহিত্যিক শিক্ষার বিষয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। শিক্ষা মানুষের এমন একটি মৌলিক চাহিদা; যা ছাড়া সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে জীবন যাপন করা অসম্ভব। দেশ ও জাতির উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষার বিকল্প নাই। এজন্যই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক আগে থেকে গড়ে উঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশও তার বিকল্প নয়। এ দেশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার ব্যয় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলক একটু বেশি। এজন্য দরিদ্র ঘরের সন্তানেরা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে থাকে। কিন্তু মাঝেমধ্যে এসব সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও সেশন জট ও বিভিন্ন ফি বৃদ্ধি করে থাকে ফলে ছাত্ররা আন্দোলনমুখী হতে বাধ্য হয়।
কিছু দিন আগে এধরনের এক ন্যায্য অধিকার আদায়ের মিছিলে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেলে গুরুতর আহত হয়ে দু’চোখ হারাতে বসেছে তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর। ময়মনসিংহের তারাকান্দার ঢাকেরকান্দা গ্রামের এক অতিদরিদ্র পরিবারের সন্তান সিদ্দিকুরের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরি করবে। বড় ভাই ও মায়ের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করবে। মাকে সে দু’বছর ধৈর্য ধরতে বলেছিল। সিদ্দিকুরের সেই স্বপ্ন এখন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। যদিও বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী তার চাকরির কথা বলেছেন। শিক্ষার আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করতে গিয়ে যদি নিজের চোখের আলো নিভে যায় তার চেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি আর কি হতে পারে। এভাবে একজন মেধাবী ছাত্রের উজ্জল ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়ার দায় পুলিশের সেই সদস্যরা কোনভাবেই এড়াতে পারে না যারা সেদিন শাহাবাগের ছাত্র সমাবেশে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেছিল।
আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সাতটি কলেজ (ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল ইসলাম কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও মিরপুর বাংলা কলেজ) ঢাকা বিশ্যবিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয় সেশনজট মুক্ত করার লক্ষ্যে। দ্রুত রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার জন্য সেদিন কিছু ছাত্র শাহাবাগে অবস্থান গ্রহণ করে। সেই কর্মসূচীতে সিদ্দিকুরও অংশ নেয়। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। হঠাৎ পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। ছুটে এসে তাদের ব্যানার কেড়ে নেয়, লাঠিপেটা শুরু করে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশের একজন সদস্য দৌঁড়ে এসে খুব কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছে। এর পরপর সিদ্দিকুর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রাস্তার ওই স্থানটি রক্তে লাল হয়ে যায়। এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ তো দূরের কথা উল্টো অজ্ঞাত ১২০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে।
এধরনের একটি ঘটনা ২০১৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হয়। বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স বন্ধের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্র্ষের ঘটনাটি নিয়ে তৎকালীন সময়ে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় যেভাবে সংবাদ ছাপানো হয়েছিল তার কয়েকটি নমুনা নি¤œরূপ- দৈনিক প্রথম আলো ০৩.০২.২০১৪ ইং তারিখে শিরোনাম করে “ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় আহত শতাধিক শিক্ষার্থী।” একই তারিখে দৈনিক সমকালে লেখা হয়- “শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র হাতে চড়াও পুলিশ-ছাত্রলীগ।” একই দিনের দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে- “রাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা গুলী।” ০৪.০২.২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় অস্ত্রধারীদের ছবিসহ নিচে লেখা হয়- “অস্ত্রধারীরা ধরা পড়েনি” যেখানে লেখা হয়েছে ছয় অস্ত্রধারীর পাঁচজন ছাত্রলীগ নেতা একজনের পরিচয় জানা যায়নি। একই পৃষ্ঠায় আরেক শিরোনামে লেখা হয়েছে- “চার মামলা, আসামী ৭৯০” সেখানে এটাও লেখা হয়েছে যে, “মামলা করেছে ছাত্রলীগও।” একই তারিখের দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় রিপোর্ট করা হয়- “রাবির আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ৪ মামলা: ছাত্রলীগের নাম নেই।” ০৫.০২.২০১৪ ইং তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় রিপোর্ট করা হয়- “অস্ত্রধারীদের আসামী করা হয়নি” একটু ছোট করে হাইলাইট করা হয়েছে “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা: প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা আসামী।” সেই ঘটনা সেদিন মিডিয়ার সুবাদে সারা দেশের মানুষ দেখেছিল; কারা হামলা করেছিল আর কারা হামলার শিকার হয়েছিল। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে মতিহার থানায় মোট ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাগুলোর এমজিআর নং- ৭৩/১৪ ও ৭৪/১৪ মামলার বাদি এস আই মাসুদার রহমান, ৭৫/১৪ ও ৭৬/১৪ মামলার বাদি ড. সাদ আহমেদ রেজিস্টার। ৭৭/১৪ ও ৭৮/১৪ এ দুটি মামলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল পরবর্তীতে তুলে নেয়া হয়।
সেদিনের অস্ত্রধারী কোন ছাত্রলীগের নামে মামলা হয়নি। মামলায় আসামি করা হয় সাধারণ নিরীহ ছাত্রদের। যারা ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় আহত হয়েছিল। ছয়টি মামলার মধ্যে ছাত্রলীগের দায়ের করা দুটি মামলা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হলেও বাকি চারটি মামলা এখনো চলমান। গত ২৯ মে রাজশাহী মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত পুলিশের দায়ের করা দুইটি মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণ করে ২৫ ছাত্রের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে। গত ৭ মে রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ১৬ জন নেতাকর্মীসহ ৪৩ জনকে আসামী করা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে গত ২৯ মে ২৫ আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করেন।
এদিকে মামলার চার্জশিট প্রদান ও গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা। সেদিন কয়েকজন অভিযোগপত্রভুক্ত আসামী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে মার খেলাম। আবার আমাদের উপরই মামলা হলো। এখন আদালতে হাজিরা দিতে হবে। আইনের উপর আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু এমন বিচার মেনে নেয়া কষ্টের। ওইদিন কি ঘটেছিলো, কারা হামলা করেছিলো আর কারা হামলার শিকার হয়েছিলো- গণমাধ্যমের কারণে সারা দেশের লোকজন জানেন। এধরনের আরও অনেক ঘটানা রয়েছে।
যে দেশে শিক্ষার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে মামলা এবং হামলার শিকার হতে হয়, হতে হয় চিরদিনের জন্য অন্ধ, সে দেশে শিক্ষার মান উন্নয়নে গলাবাজি করা কতটুকু শোভা পায় সে প্রশ্নের জবাব আমাদের জানা নেই। কবে জাতি এধরনের আমানবিক আচরণ থেকে পরিত্রাণ পাবে সেটাও ভাবার সময় হয়েছে।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
০১৭৬০-০১২৭৭০

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ