ঢাকা, বুধবার 16 August 2017, ০১ ভাদ্র ১৪২8, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রবল বন্যা ও ভূমিধসের পর সিয়েরা লিয়ন এখন মৃত্যুপুরী

১৫ আগস্ট, এএফপি, রয়টার্স : প্রবল বর্ষণ আর ভূমিধসে পশ্চিম আফ্রিকার বিপন্ন দেশ সিয়েরা লিয়ন এখন অচেনা মৃত্যুপুরী। রাজধানী ফ্রিটাউনের কাছের এক অঞ্চল ঢেকে গেছে কাদামাটিতে। তলিয়ে গেছে অধিকাংশ বাড়িঘর। কাদামাটির স্রোতে ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষের মরদেহ। চারপাশ জুড়ে কেবল মৃত্যুর গন্ধ। তবু জীবন বাজি রেখে কাদামাটির স্তূপ থেকে প্রাণের স্পন্দন শোনার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। যারা বেঁচে আছেন সর্বস্ব হারানোর বেদনা নিয়ে, তাদের জন্য জরুরি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন। এরইমধ্যে তিন শতাধিক মরদেহ উদ্ধারের পর ইবোলা আর গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটিতে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে।
রাজধানী ফ্রিটাউনের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই পাহাড়সংলগ্ন অঞ্চল রিজেন্ট। সেখানে কোথাও পা রাখার জন্য একটু শুকনো জায়গা নেই। রাস্তার ওপর দিয়ে যেভাবে স্রোত যাচ্ছে তাতে একে আর রাস্তা বলে ভাবার কোনো সুযোগ নেই। দেখে যে কারো মনে হতে পারে এ এক কাদামাটির নদী। তীব্র স্রোত বইছে রাস্তার ওপর দিয়ে। গত সোমবার ভয়াবহ বর্ষণ আর ভূমিধসে কাদাপানিতে ডুবে গেছে সব। চারদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লাশের সংখ্যা। এরইমধ্যে তিন শতাধিক মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির একজন সাংবাদিক ঘটনাস্থল থেকে মৃতদেহ সরিয়ে নিতে দেখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, রাজধানী ফ্রিটাউনের বড় দুটি এলাকার বাড়িঘর সব পানির নিচে। মৃতদেহগুলো রাস্তার ওপরে স্রোতের সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে। উদ্বিগ্ন মানুষেরা স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন রুদ্ধশ্বাসে। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, মৃতদেহ উদ্ধারে কাজ চলছে। যারা বেঁচে আছেন, প্রিয়জনদের হারানোর শোকে তারা মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। তারাও উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে খুঁজে ফিরছেন তাদের কাছের মানুষদের।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ফোহ বলেন, অনেকেই কাদার মধ্যে ডুবে গেছে। কাজেই মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এতটাই মর্মান্তিক যে, আমি নিজেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমরা এলাকাটি ঘিরে রেখে দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছি।’
স্থানীয় রেডক্রস এই প্রতিবেদন রচনার সময় পর্যন্ত ৩২১ জনের প্রাণহানি নিশ্চিত করেছে। এ সংখ্যা বাড়বে বলে জানিয়ে দিয়েছে তারা। ফ্রিটাউনে কোনাট হাসপাতালের মর্গের একজন টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সিন্নেহ। তিনি বলেছেন, শুধু তাদের মর্গেই নেয়া হয়েছে কমপক্ষে ১৮০টি মৃতদেহ। এর মধ্যে অনেক শিশুর লাশ রয়েছে। এখন তাদের মর্গ উপচে পড়ছে। সেখানে লাশ রাখার মতো আর কোনো স্থান নেই। আরো অনেক মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে বেসরকারি মর্গগুলোতে।
স্থানীয় রেসক্রসের টিম ফ্রিটাউনে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছে। এতে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যার টালিও করা হচ্ছে।
ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে বুক সমান পানিতে রাস্তায় উঠার চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা। জুবা এলাকার এক পাহাড়ের ওপর বাস করতেন ফাতমাতা সেসে। তিনি বলেছেন, সোমবার ভোর সাড়ে চারটায় প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছিল। এ সময় বাড়িতে ঘুমাচ্ছিল তার তিন সন্তান ও স্বামী। ভূমিধসে মাটি এসে চাপা দেয় তাদের বাড়ি। তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে পানিতে ডুবে যায় সব। এ সময় ফাতমাতা ঘরের চালের ওপর উঠে যান। এভাবেই সেখানে বেঁচে আছেন তারা।
স্থানীয় মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, রিজেন্ট এলাকায় একটি পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়েছে। এতেই বিপর্যয় ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আরেকটি ছবিতে দেখানো হয়েছে, একটির ওপর আরেকটি লাশ স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
সিয়েরা লিয়নে বন্যা আর ভূমিধস-৪দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কর্মকর্তা ক্যান্ডি রোজারস বলেছেন, কমপক্ষে ২০০০ মানুষ গৃহহারা হয়েছে। তাই আফ্রিকার সবচেয়ে গরিব দেশগুলোর অন্যতম এই সিয়েরা লিয়নে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এ জন্য সাহায্যের প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ফ্রিটাউন সিয়েরা লিয়নের উপকূলীয় একটি শহর। এখানে বসবাস প্রায় ১২ লাখ মানুষের। প্রায় বছরই এখানে কয়েক মাসের বৃষ্টি হয়। তাতে দেখা দেয় বন্যা। ভেসে যায় মানুসের বসতি। দেখা দেয় কলেরা সহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। ২০১৫ সালের বন্যায় সেখানে মারা যায় কমপক্ষে ১০ জন। গৃহহারা হন কয়েক হাজার মানুষ। এর আগে ২০১৪ সালে এখানে দেখা দেয় ইবোলা ভাইরাসের প্রকোশ। তাতে সারাদেশে কমপক্ষে ৪০০০ মানুষ মারা যান। সিয়েরা লিয়নে বসবাসরত মানুষের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগই দারিদ্য্রসীমার নিচে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ