ঢাকা, বুধবার 16 August 2017, ০১ ভাদ্র ১৪২8, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ঘিরে অভিযান ॥ সন্দেহভাজন ‘জঙ্গি আত্মঘাতী’

 

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকার পান্থপথে একটি আবাসিক হোটেলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সোয়াট সদস্যদের অভিযানের মধ্যে নব্য জেএমবির সন্দেহভাজন এক জঙ্গি নিহত হয়েছেন। পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক জানিয়েছেন, নিহত ওই যুবক নব্য জেএমবির সদস্য। আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সে ‘সুইসাইড ভেস্টে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী’ হয়েছে। 

এক জঙ্গির অবস্থানের খবরে পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের কাছে ওলিও ইন্টারন্যাশনাল নামের ওই হোটেল ভবন গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ঘিরে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ সদস্যরা ওই এলাকার প্রতিটি গলি এবং বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন, সোয়াট সদস্যরা অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। অভিযানের নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন অগাস্ট বাইট’। পান্থপথের যে জায়গায় চারতলা ওই হোটেল ভবনের অবস্থান, সেখান থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি ভবনের দূরত্ব মাত্র ৩০০ মিটার।

১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সকালে সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল পান্থপথের অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, সন্দেহভাজন এক জঙ্গির অবস্থানের তথ্য পেয়ে সোয়াটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই অভিযান শুরু করে। সেখানে ‘নাশকতার সরঞ্জাম’ থাকতে পারে বলেও তাদের কাছে খবর আছে।

পুলিশ কয়েক ঘণ্টা ঘিরে রাখার পর সকাল পৌনে ১০টার দিকে চারতলা হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল থেকে বিকট বিস্ফোরণ ও গুলীর শব্দ পাওয়া যায়। বিস্ফোরণে হোটেলের চতুর্থ তলার রাস্তার দিকের অংশের দেয়াল ও গ্রিল ধসে নিচে পড়ে। চতুর্থ তলার ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একজনের দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ছবিতে। পরে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, হোটেলের যে কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটেছে, আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী এক যুবক সোমবার রাতে সেটি ভাড়া নেয়। “হোটেলের রেজিস্ট্রার খাতার তথ্য অনুযায়ী ওই যুবকের নাম সাইফুল ইসলাম, বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায়। বি এল কলেজে সে অনার্স পড়ছে। আমরা ধারণা করছি, ওই যুবকই নিহত হয়েছে।”

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গোপনীয়) মনিরুজ্জামান বলেন, সাইফুলের ওপর আগে থেকেই নজর রাখছিল পুলিশ। “সে নব্য জেএমবির সদস্য; আগে শিবির করত। তার বাবা আবুল খায়ের মোল্লাও খুলনায় একটি রাজনৈতিক দলের নেতা।”

পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, নিহত যুবক নব্য জেএমবির সদস্য। গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার তথ্য পায়। “হোটেলে অনুসন্ধান চালানোর সময় তার কক্ষ থেকে আমরা কোনো সাড়া পাইনি। তাকে সারেন্ডার করতে বলা হয়েছিল, কিন্তু সে করেনি। সে প্রথমে একটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। অভিযান শুরু হলে সে সুইসাইড ভেস্টে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়।” 

সকালে পুলিশ হোটেলটি ঘিরে ফেলার পরপরই রাসেল স্কয়ার থেকে পান্থপথ-গ্রিন রোড পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। আশপাশের প্রতিটি গলিতে অবস্থান নেন পুলিশ ও সোয়াট সদস্যরা। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও এনে রাখা হয়।

ছুটির দিনের সকালে রাস্তার এই অবস্থা দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ। যান চলাচল বন্ধ থাকায় স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশে আসা অসুস্থ এক ব্যক্তিকে পুলিশের সহযোগিতায় নিয়ে যেতে দেখা যায়।

 পৌনে ১০ টার দিকে বিকট বিস্ফোরণের সঙ্গে হোটেল ভবনের চতুর্থ তলার দেয়াল ও গ্রিল ভেঙে নিচে পড়লে তৈরি হয় আতঙ্ক। স্কয়ার হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা হাসপাতালের ভেতরের দিকে চলে যান। এর পরপরই সামনের রাস্তা দিয়ে আহত অবস্থায় একজনকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। তেজগাঁও থানার ওসি মাজহার হোসেন জানান, ওই ব্যক্তি ব্যাংকের বুথে টাকা তুলতে যাচ্ছিলেন। বিস্ফোরণের ফলে ইটের টুকরো ছিটকে গিয়ে তার মাথায় লাগে। কিছু সময় পর সোয়াট সদস্যদের হোটেলের চতুর্থ তলার ওই অংশে দেখা যায়। পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক পরে ঘটনাস্থলে আসেন। 

 বেলা পৌনে ১১টার দিকে হোটেল ভবনের চতুর্থ তলায় প্রবেশ করেন পুলিশের বোমা নিস্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা। সেখানে আরও বিস্ফোরক আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখেন তারা।

সাইফুলের সন্ধান মিলল যেভাবে

অগাস্টে বড় ধরনের নাশকতা পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার পর অনুসন্ধান চালাতে গিয়েই ঢাকার পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের একটি কক্ষে এক জঙ্গির খোঁজ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে চার তলা ওই ভবন ঘিরে ফেলার পর পুলিশের আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে খুলনা থেকে আসা ওই তরুণ সুইসাইড ভেস্টে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন। 

অভিযান শেষে বেলা ১১টার দিকে আইজিপি শহীদুল হক এবং পরে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। মনিরুল বলেন, দুই দিন আগে তারা তথ্য পান যে এ মাসেই বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছে জঙ্গিরা। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন হোটেল ও মেসে তারা তল্লাশি চালানো শুরু করেন। “আমাদের কাছে ইনফরমেশন ছিল, যে চক্র হামলা করবে, তারা খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। গতকাল সন্ধ্যায় তথ্য পেলাম, ১৫ অগাস্টকে কেন্দ্র করে অনেক বড় ধরনের নাশকতা ঘটানো হবে। আরও জানতে পারি, মিরপুর রোড ও পান্থপথ- ওই এলাকাতেই তারা থাকবে।” ওই তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়ে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে সন্দেহভাজন জঙ্গির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তারপর ভোর ৩টার দিকে সেখানে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। 

মনিরুল বলেন, “তল্লাশির সময় ওই হোটেলের প্রতিটি কক্ষের বোর্ডারকে ডাকা হয়। তারা কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের পরিচয় দেন। কিন্তু চতুর্থ তলার একেবারে পূর্ব দিকের শেষ কক্ষের বোর্ডারকে ডাক দিলে সে ভেতর থেকে বলে, ‘আপনারা কারা, সকালের আগে আমি দরজা খুলব না’।” সে সময় ওই কক্ষের একটি জানালা দিয়ে পুলিশ সদস্যরা একটি ব্যাগ ও তার দেখতে পান। পরে আর কথা না বলে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিয়ে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও বোমা নিস্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা নিচে নেমে অবস্থান নেন। এরই মধ্যে চলতে থাকে অভিযানের প্রস্তুতি। হোটেলের অন্য বোর্ডারদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে আশপাশের প্রতিটি গলিতে অবস্থান নেন পুলিশ সদস্যরা। সকালে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এনে রাখা হয় হোটেল ভবনের সামনে। ছুটির দিনের সকালে রাস্তায় বেরিয়ে এই অবস্থা দেখে উদ্বেগ তৈরি হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। কাউন্টার টেরোরিজম, সোয়াট, বোমা নিস্ক্রিয়কারী দল ও অন্যান্য বাহিনীর এই অভিযানের নাম দেয়া হয় অপারেশন ‘অগাস্ট বাইট’।

আইজিপি বলেন, পুলিশ মাইকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেও ওই তরুণ তাতে সাড়া দেয়নি। ফলে পুলিশ অভিযানে যেতে বাধ্য হয়। “পুলিশ যখন অপারেশন শুরু করেছে, তখন সে একটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো দরজা ভেঙে ফেলে। সে যখন আরেকটি বোমা ফাটাতে যাবে, পুলিশ তখন গুলী করে। তার সাথে সুইসাইড ভেস্ট ছিল, ব্যাকপ্যাক ছিল, সেগুলো দিয়ে সে নিজেই আত্মাহূতি দিয়েছে।”

পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের বাড়ি ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের নোয়াকাঠি গ্রামে। ওই এলাকার উলা দাখিল মজিদিয়া মাদরাসা থেকে দাখিল এবং খুলনা আলীয়া মাদরাসা থেকে আলিম পাসের পর তিনি সরকারি বিএল কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। নব্য জেএমবির সদস্য সাইফুল এক সময় ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কাউন্টার টেররিজমের মনিরুল। সাইফুলের বাবা আবুল খায়ের মোল্লা নোয়াকাঠির মাঠের হাট মসজিদের ইমাম এবং ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর বায়তুল মাল (কোষাধ্যক্ষ) সম্পাদক। চাকরির খোঁজ করার কথা বলে ৭ অগাস্ট ঢাকায় আসেন সাইফুল। সোমবার তিনি ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে ওঠেন। ডুমুরিয়া থানা পুলিশ আবুল খায়ের মোল্লাকে থানায় নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এছাড়া সাইফুলের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ থাকায় নোয়াকাঠি গ্রামের আবু ওয়াহেদের ছেলে মো. সানি (২২) ও একই এলাকার জালাল সরদারের ছেলে ইসানকে (২১) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কলাবাগান থানার পরিদর্শক তদন্ত সমীর চন্দ্র সূত্রধর জানান, পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের মালিক লায়ন ফিরোজুর রহমান ওলিও। তিনি হোটেল এনাম ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল গোল্ডেন ড্রাগন ও হোটেল পিকক লিমিটেডেরও মালিক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেডের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক। হোটেলে পুলিশের অভিযান নিয়ে তার বা তার প্রতিষ্ঠানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাইফুলের লাশ ঢামেক মর্গে

পান্থপথে বোমা বিস্ফোরণে আত্মঘাতী জঙ্গি সাইফুল ইসলামের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের পুরনো ভবনের চতুর্থ তলা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে ঢামেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঢামেক সূত্রে জানা গেছে, সাইফুলের লাশ ঢামেক মর্গে এসে পৌঁছায় বিকাল ৫টা ৫ মিনিটে। এরপর লাশটি জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ