ঢাকা, বুধবার 16 August 2017, ০১ ভাদ্র ১৪২8, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পঞ্জিকার শাসনে এলো ‘মাহ ভাদর’

সাদেকুর রহমান : শ্রাবণের শেষ দিন গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, সক্রিয় মওসুমী বায়ুর প্রভাবে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। 

অন্যদিকে, এদিন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণাধীন ৯০টি স্টেশনের মধ্যে সকাল ৯ টার তথ্য অনুযায়ী, যমুনা, কংস, ধলেশ্বরীসহ ২১টি নদীর ৩০টি স্টেশনে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে রাজধানীসহ মধ্যাঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা আরো বেড়ে গেছে। লাখ লাখ বন্যার্ত মানুষ খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। 

আবহাওয়াগত অবস্থা বা বিশ্লেষণ যাই হোক, পঞ্জিকার শাসন মেনে কাব্যকথার অমল শোভার শরৎ এসেই গেলো। আজ বুধবার পহেলা ভাদ্র। সারাদেশে যখন বড় বন্যার পদধ্বণি শোনা যাচ্ছে, ঠিক তখন এসেছে ‘মাহ ভাদর’। ‘মেঘ পালাই পালাই’ করার প্রাকৃতিক খেলায় ব্যত্যয় ঘটেছে। শাওনের বিদায় দিনেও আকাশ জুড়ে ছিল মেঘের ঘনঘটা। এদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ স্থানে বৃষ্টিপাতের খবর দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

নিকট অতীতেও শরৎ ছিল অবকাশ যাপন, তালের পিঠা ও পাগলা হাওয়ার ঢেউ খেলানো কাশবনের ঋতু। মানুষের জীবনধারার সময় নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার বিবর্তনেও সে বিশিষ্টতা একেবারে মিলিয়ে যায়নি। পাকা তালের মোহনীয় ঘ্রাণ যেনো পূর্বাহ্নেই এর আগমনী বার্তা সগৌরবে প্রচার করে। আহ্নিক গতির প্রভাবে বাংলা-প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চের ভোরের পর্দা সরিয়ে সূর্যোদয়ের মতোই হাজির হবে বঙ্গাব্দের পঞ্চম তনয়া। লোকজ ভাষায় যার আরেক নাম ‘ভাদ্দর’। ‘তালপাকা গরম’ আর ‘মোলায়েম সফেদ কাশফুল’ এ মাসের সমার্থক। জর্দা রঙ্গা শিউলী ফুল ফোটে দেহে স্নিগ্ধতার আমেজ মেখে।

শরৎ চিরকালই রহস্যময়ী ষোড়শীবালার মতো অবোধ্য। কান্না-হাসির দোল দোলানো খেলার মাঝেই রয়ে গেছে জীবনের না বলা অনেক কথা। তাইতো কবি যখন শরতের পেঁজা তুলোর মতো নরম মেঘ দেখে মনের একান্ত গহীনে তার অভিমানী প্রিয়তমাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, তখন সেই বিমূর্ত রূপ কিন্তু অন্যরকম মাধুরিমায় ভরে ওঠে। যেমন : ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে দেখি আজ শরৎ-মেঘে’। কবি তার প্রিয় ঋতু শরতের অনন্য সাধারণ রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধ অনন্ত সৌন্দর্যের মাঝে। তিনি তার নাম জানেন না অথচ তার মোহনরূপে নিজেকে অকপটে সমর্পণ করে তাকে খুঁজে ফিরছেন আপন মনের আলোছায়াতে এভাবে : ‘তোমার নাম জানি নে, সুর জানি তুমি শরৎ-প্রাতের আলোর বাণী।’

সাধারণত বাংলা বছরের প্রথম পাঁচ মাস একত্রিশ দিনের হয়ে থাকে। পঞ্জিকা বিশারদদের হিসাব অনুযায়ী, ভাদ্র পঞ্চম একত্রিশা মাস। বলাবাহুল্য, অধিবর্ষে ফালগুন মাস একত্রিশ দিনের হয়ে থাকে। ‘ভাদ্রপাদ’ তারার নামে ভাদ্র মাসের নামকরণ করেছেন পন্ডিতরা। এ মাসে শুক্র একাদশীতে ‘পাশ মোড়া’ নামক ধর্মীয় আচার পালন করে হিন্দু সম্প্রদায়। ধর্মানুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগ থাকা সত্ত্বেও এটি প্রধানত আনন্দ উপভোগের উপলক্ষ হিসাবেই লোকের কাছে সমাদৃত। শুধু যে হিন্দুরাই উৎসব পালন করে তা নয়। দেশের মুসলমানসহ অপরাপর অমুসলমানরাও ভাদ্রের তালের পিঠা খাওয়ার ‘খুশিতে বিষম উৎসবে’ মেতে ওঠে। এছাড়া পেয়ারা, আনারস, চালতা, জাম্বুরা, আমড়া, উড়িগাব ইত্যাদি এ উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করে।

‘গা শিন্ শিন্’ করা আশ্বিনের অগ্রজ ভাদ্রে অনুষ্ঠেয় লৌকিক উৎসব মেলার সংখ্যাও নেহায়েৎ কম নয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক ১৩৯০ বঙ্গাব্দের বৈশাখে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ মেলা’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ভাদ্র মাসে সারা দেশে ১৮টি মেলা ও পার্বণ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় গুড়পুকুরের মেলা, দোহারের মৈনটে মেলা, লৌহজংয়ের ঝুলন মেলা, মালীনতা মেলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। গুণী লোক সংগ্রাহক মোহাম্মদ সাইদুরের হিসেবে এ মাসে কমপক্ষে ৩৩টি মেলা হয়। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মেলার মধ্যে রয়েছে নওগাঁর হামিদপুর মেলা, কালিকা জয়যাত্রা উৎসবের মেলা, কসবা মেলা, নিকলী মেলা ইত্যাদি। এ তালিকাটি বাংলা একাডেমির কিশোর সাহিত্য পত্রিকা ‘ধান শালিকের দেশ (২৫ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, এপ্রিল-জুন ১৯৯৭)’ এ প্রকাশিত হয়। এসব মেলা একদিন থেকে পক্ষকাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ