ঢাকা, বুধবার 16 August 2017, ০১ ভাদ্র ১৪২8, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভয়াবহ বন্যার আশংকা

টানা বৃষ্টি আর উজান তথা ভারতীয় পানির ঢলে একদিকে পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপদ সীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে দেশের নতুন নতুন এলাকা। একযোগে আশংকা বেড়ে চলেছে ক্রমাগত বৃষ্টির কারণে। এতদিন উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা হলেও গত কয়েকদিন ধরে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলও বন্যাকবলিত হতে শুরু করেছে। গত সোমবার পর্যন্ত ২০ জেলার ৩৫৬টি উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে এবং সাপের কামড়ে মৃত মানুষের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে।
দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অবনতি ঘটতে থাকা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা আশংকা করছেন, বাংলাদেশকে এবার স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে হবে। কোনো কোনো গণমাধ্যম তাদের খবরে বলেছে, এবারের বন্যা ১৯৮৮, ১৯৯৮ এবং ২০০৪ সালের বন্যাকে তো ছাড়িয়ে যাবেই, এমনকি বন্যায় বিগত ৬০ বছরের রেকর্ডও ভেঙে যেতে পারে। ক্ষয়ক্ষতিও হতে পারে দীর্ঘ মেয়াদি। বিভিন্ন রিপোর্টে বিশেষ করে ঢাকার সম্ভাব্য বন্যা সম্পর্কে গভীর আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। কারণ, সরকারের উন্নয়ন নামের অপরিকল্পিত কর্মকান্ডের কারণে রাজধানী থেকে বৃষ্টির পানি সরে যাওয়াই ইদানীং প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় একবার বন্যার পানি ঢুকে পড়লে সে পানি সরে যেতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাজধানীবাসীর পাশাপাশি সমগ্র দেশও মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে। এমন আশংকার ভিত্তিতেই বিশেষজ্ঞরা বন্যা মোকাবেলার প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা একই সাথে সারা  দেশেও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন।    
বলার অপেক্ষা রাখে না, সামগ্রিকভাবে দেশের বন্যা পরিস্থিতি এরই মধ্যে মারাত্মক হতে শুরু করেছে। অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের বন্যাকে দ্বিতীয় দফার বন্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কারণ, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আষাঢ় ও শ্রাবণের প্রবল বৃষ্টির পানির সঙ্গে উজান তথা ভারত থেকে নেমে আসা পানি দেশকে প্রথমবারের মতো ডুবিয়ে দিয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে ভারতের পানি আগ্রাসনের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেন না, বন্যায় দফার  প্রবল বৃষ্টির দিনগুলোতে ভারত প্রথমে গজলডোবা বাঁধের ৫৪টি গেটের সবগুলো এবং তারপর পর্যায়ক্রমে অন্য সব ছোট-বড় বাঁধের গেটও খুলে দেয়। এর ফলেই তলিয়ে যায় দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিগত কয়েকদিনের বৃষ্টি ও বন্যার মধ্যে গজলডোবা এবং অন্য বাঁধগুলোর পাশাপাশি ভারত বিশেষ করে ‘মরণ বাঁধ’ ফারাক্কার সব গেট খুলে দিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সচিত্র রিপোর্টে জানা গেছে। ওদিকে বৃষ্টির সঙ্গে বন্যাও বেড়ে চলেছে ভারতে। পানি বাড়ছে চীনেও। ব্রহ্মপুত্র নদ যেহেতু এ দুটি দেশের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেহেতু এখানেও বন্যা স্বল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বাস্তবে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিও ঘটতে শুরু করেছে। আবহাওয়াবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই কারণে সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করা। সরকারকে একই সঙ্গে আরো বড় ধরনের বন্যা মোকাবেলার জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনগণের কঠিন বিপদের মধ্যেও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের নামে ‘ফটো সেশন’ করার অভিযোগও উঠছে। এমন অবস্থায় লাফিয়ে লাফিয়ে বিপদ বেড়ে চলেছে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া লাখ লাখ মানুষের। সরকারের দিক থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে শুধু নয়, বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে যথেষ্টসংখ্যক উঁচু স্থান বা স্থাপনা না থাকার কারণেও বিপন্ন মানুষেরা আশ্রয় নিতে পারছে না। ফলে সাপসহ হিংস্র প্রাণীর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পানির মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা চলছে খাদ্য ও সুপেয় পানির। কারণ বন্যায় চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবানা করা একেবারেই সম্ভব নয়। তার ওপর রয়েছে চাল-ডালসহ খাদ্য সামগ্রীর তীব্র সংকট। মুড়ি আর চিড়ার মতো শুকনো খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও কেনার মতো সাধ্য নেই প্রায় কোনো মানুষেরই। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য না পাওয়ায় চিড়া-মুড়ি ও ঝোলা গুড়ের মতো সামান্য কিছু খাবার খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছে বন্যাকবলিতরা। ওদিকে রয়েছে নিরাপদ পানীয় পানির তীব্র অভাব। কুয়া, নলকূপ ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানি পাওয়া ও পান করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বন্যার পানিই পান করতে হচ্ছে, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে ডায়ারিয়া ও আমাশয়ের মতো মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী বিভিন্ন্ রোগ। এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। কিন্তু কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না তারা। হাসপাতাল দূরের কথা, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। অনেকে এমনকি বিনা চিকিৎসায় মারাও যাচ্ছে। কিন্তু সব জানা সত্ত্বেও সরকারকে এখনো কোনো ব্যবস্থা নিতে বা তৎপর হতে দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীন দলের এমপিসহ বড় বড় নেতারা ব্যস্ত রয়েছেন তাদের ‘ফটো সেশন’ নিয়ে। সরকারি কর্মকর্তাদের তো বটেই, ত্রাণ তৎপরতা চালানোর ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদের ‘নির্বাচিত’ জনপ্রতিনিধিদেরও কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বন্যাকবলিত লাখ লাখ মানুষের জীবন লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
আমরা মনে করি, ‘ফটো সেশন’-এর মতো লোক দেখানো কর্মকান্ড চালানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত অবিলম্বে সর্বতোভাবে তৎপর হয়ে ওঠা। ত্রাণ তৎপরতার নামে কিছু বিশেষ এলাকায় শুধু খাদ্য ও কাপড় বিতরণ করলে চলবে না, ওষুধ বিতরণেরও পদক্ষেপ নিতে হবে। চেষ্টা চালানো দরকার বন্যা দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার জন্যও। সরকারকে একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার ব্যাপারেও এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। মহানগরী থেকে যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে বন্যার পানি সরে যেতে পারে- সে জন্য ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে তৎপর করতে হবে কাল বিলম্ব না করে। একথা বুঝতে হবে যে, ভয়াবহ বন্যা আসলেই ধেয়ে আসছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ