ঢাকা, বুধবার 16 August 2017, ০১ ভাদ্র ১৪২8, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা রামসাগর

“রামসাগর” দিঘীর উপর লেখক দাঁড়িয়ে

মু. মিজানুর রহমান : সাগর নয়, তবুও নাম রামসাগর। যে সামান্য সংখ্যক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক কীর্তির গৌরবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে গর্বিত ও গৌরবান্বিত তার অন্যতম কীর্তি সম্পদ এই ‘রামসাগর’। শুধু আকারে বিশালতা নয় শোভা, সৌন্দর্য ও স্বচ্ছতায় এই দীঘি অতুলনীয় এবং ইহার পরিচয় বৈদেশিক ও আন্তর্জাতিক খ্যাত। দেশে ও বিদেশে দিনাজপুরের কীর্তির খ্যাতি ছড়িয়ে আছে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য। ‘রামসাগর’ কান্তজী মন্দির, সীতা কোট বৌদ্ধ বিহার, বিস্ময়কর চেহেল গাজী মাজার, সুবিশাল রাজবাড়ী ও বহু দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য পুরাবস্তব সংগ্রাহাগার দিনাজপুর জাদুঘর তার মধ্যে প্রধান ও প্রসিদ্ধ গৌরব।
রামসাগর শুধু দ্রষ্টব্য ঐতিহাসিক কীর্তিই নয়, এটা প্রাকৃতিক শোভা ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম ও সুন্দরতম দীঘি ‘রামসাগর’ দিনাজপুর জেলার বুকে অবস্থিত। দিনাজপুর শহর থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে ৬ কি.মি. দূরে অবস্থিত এই ‘রামসাগর’।
রামসাগরেরর চারদিকে ধু ধু করা উদাসী গ্রামীণ প্রান্তর। দূরে দূরে ফাঁকা ফাঁকা জনপদ। মাঝখানে পাহাড়ের মতো উঁচু শক্ত মাটির টিলার দ্বারা পরিবেষ্টিত অপরূপ রূপময় পরিবেশে অবস্থিত এই সাগরোপম দীঘি যার সামগ্রিক দৃশ্যাবলী দেখতে বড় নয়নাভিরাম। ‘রামসাগর’ দীঘির চারদিক বেষ্টিত করে টিলার মতো উঁচু পাড়গুলো সব অংশের উচ্চতা সমান নয়। উত্তর-পূর্ব কোণাংশে অবস্থিত পাড়টির উচ্চতা সর্বাধিক বেশি।
‘রামসাগর’ দীঘির পশ্চিম পাহাড়ে অবস্থিত মুসলমানদের উপাসনালয় মসজিদ। জামে মসজিদটির পাশে অবস্থিত একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি অনেকদিন ধরে হাফেজ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। পাড়টির একটু সামনে গিয়ে টিলার ওপর অবস্থিত সুন্দর একটি ডাকবাংলো।
আকারে ও সৌন্দর্যে এটা বাংলাদেশের অদ্বিতীয় দীঘি। সুপরিকল্পিত ভূমি নকশার ওপর ঘণিত প্রায় আড়াইশত বছরের পুরাতন হলেও এই দীঘি কোনরূপ সংস্কা রও সংরক্ষণের প্রয়োজন ব্যতিরেকেই আজতক অক্ষত রয়েছে এবং তার জলে বিরাজ করছে উজ্জ্বল্য যা চিরঅম্লান হয়ে। ‘রামসাগরে’র উত্তর দিকে পাড়ভ’মির বহিরাংশে একটি অর্ধভগ্ন ও সৌধ অবস্থিত। সৌধ নিয়ে মানুষের মাঝে নানা প্রশ্ন থাকলেও অনেকেই এটিকে দেব মন্দির বলে। স্থানীয় সূত্রে এটিকে দোল মন্দির বলে চেনে। এটা হিন্দুদের একটি ধর্মানুষ্ঠান। এতো নির্মিত হলে এটা দোল মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরটির অপরূপ আকার ও অপকৃতির দরজা রয়েছে। সব মিলে মন্দিরটির ৭টি দরজা রয়েছে। দীঘিটির পশ্চিম পাড়ে একটি চিড়িয়াখানা ও শিশু পার্ক রয়েছে। যেখানে অনেক জীবজন্তুসহ শিশুদের খেলার অনেক জিনিস রয়েছে। দীঘিটির পর্যবেক্ষণ করার জন্য চারপাশে অনেক বড় বড় পিলার রয়েছে। যেখানে উঠে পুরো দীঘিটিই একনজরে দেখা যায়। দীঘিটির চারপাশে ফুলের বাগান অবস্থিত। অনেক বড় বড় গাছ ফুলের বাগানে সুশোভিত ‘রামসাগর’ দীঘি। দীঘিটি যখন খনন করা হয়, তখন যান্ত্রিকভাবে খনন করার উপায় ছিল না। একমাত্র কোদালই ছিল খনন করার একমাত্র মাধ্যম। দীঘিটি যে সময় খনন করা হয় তখন হিসাব করেও খনন করার কোন উপায় ছিল না।
জানা গেছে, প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিক খনন কাজে নিয়োজিত ছিল। অবশ্য সন্দেহ করা হয় সামান্য সামন্ত রাজা রামনাথের পক্ষে এতবড় বিরাট কাজ করা ও বিপুল ব্যয় সাপেক্ষ ‘রামসাগর’ দীঘি খনন করা সম্ভবপর হয়েছিল কিনা? তবে কিছু লোক এটা সন্দেহ করলেও ‘রামসাগর’ রামনাথেরই ঐতিহাসিক কীর্তির ব্যাপারে ইতিহাসে প্রমাণের কোন অভাব নেই।
শুধু দিনাজপুরে নয় এমন মনভোলানো দীঘি দেশের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া বিরল। এখানে দিনাজপুরের বাইরেও রংপুর, রাজশাহ, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ইত্যাদি বড় শহরের নাগরিক মনকে উন্মনা করে তোলে ‘রামসাগর’। শীতকালে এখানে বনভোজনের ভিড়ে অত্যন্ত জনসমাগম বেড়ে যায়। এমনকি ভিড়ের আধিক্যে এখানে বনভোজনের জন্য শীত মওসুমে সুবিধামতো জায়গা পাওয়াই দুস্কর। আর এখানে শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, বিদেশ থেকে পর্যটকরা এটিকে পর্যবেক্ষণ করতে আসেন। বহিরাগত কোন সুধী সম্মানীয় মেহমান দিনাজপুরে এসে থাকলে অন্তত ‘রামসাগর’ না দেখে ফিরে যান না কেউ। চিত্তবিনোদনে, অবকাশ যাপন পা বনভোজনের জন্য ‘রামসাগরে’র জাতীয় মূল্য ও ভ’মিকার কথা স্বীকার করে নেয়ার সঙ্গে ঐ সম্সত উপলক্ষে বা অবকাশে উক্ত ডাকবাংলোয় সামাজিক অবক্ষয় তথা অনৈতিক অনাচারমূলক যেসব ব্যাধির অবশ্যম্ভাবী আশঙ্কা জড়িত তা কিন্তু সামাজিক চিন্তা-ভাবনার মোটেই উপেক্ষা করার ব্যাপার নয়। প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সুবিধাগুলোর মোটামুটি হওয়ায় ইদানীংকালে দিনগুলোতে ভ্রমণ, বনভোজন ও অবকাশ যাপনের জন্য ‘রামসাগরে’র বুকে আনাগোনার ভিড় ক্রমেই বেড়ে চলছে। বিশেষ করে শীত মওসুমে বিচিত্র সৌখিন মানুষের পদধূলিতে ‘রামসাগরে’র পাড়ভূমি যেন তীর্থোৎসবের মতো আকার ধারণ করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ