ঢাকা, বুধবার 16 August 2017, ০১ ভাদ্র ১৪২8, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিলডাকাতিয়ায় ফের জলাবদ্ধতা খনন প্রকল্প আট মাসেও শুরু হয়নি

খুলনা অফিস : স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সালতা ও ভদ্রা নদীর ৩০ কিলোমিটারজুড়ে খনন  প্রকল্প শুরু করার কথা ছিলো। কিন্তু সময়মতো টেন্ডার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্প কাজ এখনও শুরু করা যায়নি। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল ‘ডাকাতিয়া’ স্থায়ী জলাবদ্ধতার রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি টানা প্রায় এক সপ্তাহের ভারি বর্ষণে বিল ডাকাতিয়াসহ অন্যান্য বিলের প্রায় ১৮শ চিংড়ির ঘের ডুবে যাওয়ায় মাছ ভেসে গেছে। ঘের মালিকরা আপ্রাণ চেষ্টা করে নেট, পাটা দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি চিংড়ির ঘের ভেসে গেছে। তবে মৎস্য অফিস দাবি করে ১৮শ মত। এর ফলে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মত ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়।
খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা থানাসহ জেলার ডুমুরিয়া, ফুলতলা এবং যশোরের কেশবপুর, মনিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার অভ্যন্তরের প্রায় ৩০ একর জমি নিয়ে গঠিত বিল ডাকাতিয়া। বিলটি আশির দশকে স্থানীয় মানুষের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। কারণ ষাটের দশকে উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে পোল্ডার তৈরি করার ফলে এটি ধীরে ধীরে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধ হয়ে পড়েন বিলসংলগ্ন হাজার হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে যায় কৃষিজমি। ঠুঁটে মাছ ছাড়া কৃষিপণ্য ছিল কল্পনাতীত। অচল হয়ে পড়ে মানুষের জীবন-জীবিকা।
এ অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্ল্যানের আলোকে ১৯৯২-৯৩ সালে খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি) নেয়া হয়। এর আগে আরো দু’টি প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রকল্পের আওতায় কৈয়া নদী খনন করা হয়। একই সঙ্গে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে শলুয়া থেকে ফুলতলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খাল খনন করা হয়। এর পরই বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশন শুরু হয়। নতুন করে জীবন শুরু করেন ভুক্তভোগী হাজারো মানুষ।
কিন্তু স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে অতিবর্ষণ হলেই বিলটি তলিয়ে যাচ্ছে। কৈয়া নদী ও ফুলতলা উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি দখল ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে নতুন করে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা।
এলাকাবাসী জানান, একসময় বিল ডাকাতিয়ার আশপাশের অঞ্চলের মানুষকে শাপলা আর ঠুঁটে মাছ খেয়ে জীবন কাটাতে হতো। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ফলে বিলে এখন মাছ ও ধানচাষ হচ্ছে। চাষ হচ্ছে, নানা রকম রবিশস্যও। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থাও এগিয়ে এসেছে কৃষকদের পাশে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে খুলনার বিল ডাকাতিয়াই হতে পারে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক ও কৃষি উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্র।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মত্স্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিল ডাকাতিয়ার ৩০ হাজার একর জমির অধিকাংশই মাছ ও সবজিচাষের আওতায় আনা হয়েছে। গলদা চিংড়ির সঙ্গে চাষ হচ্ছে সাদা মাছ। কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। দিন দিন বাড়ছে সবজিচাষের পরিমাণও। এখন এ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ধরে রাখতে দ্রুত খাল ও নদী খনন কর্মসূচি হাতে নেয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কৈয়া নদী দখলমুক্ত করে পানি নিষ্কাশন যেমন জরুরি, তেমনি শলুয়া নদীতে আরো একটি স্লুইস গেট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে থুকড়োর সন্ধ্যার খালটি দখলমুক্ত করে সেখানেও আরো একটি স্লুুইস গেট নির্মাণ করা দরকার। বৃষ্টি মৌসুমে জলাবদ্ধতা এড়াতে গত ডিসেম্বও মাসে তারা বিলের খাল ও কৈয়া নদী খননের দাবি জানান।
স্থানীয় সার্ভেয়ার নির্মল কান্তি জোয়ার্দার বলেন, খনন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিল ডাকাতিয়ার লাখো মানুষকে এখন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রামপ্রসাদ জোয়ার্দার বলেন, বর্ষা মৌসুমে সামান্য বর্ষণেই বিলটি ডুবে যায়। বর্ষার আগেই আমরা নদী-খাল খননের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সৌমিত্র বিশ্বাস জানান, কেজেডিআরপির উদ্দেশ্য ছিল পানি নামবে কিন্তু প্রবেশ করবে না। কিন্তু সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। এখন ৮০ ফুটের খালটি জরুরি ভিত্তিতে পুনঃখনন দরকার। প্রয়োজন নদী দখলমুক্ত করা।
এদিকে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সালতা ও ভদ্রা নদীর ৩০ কিলোমিটারজুড়ে খনন কাজ শুরু হওয়া কথা ছিলো। এর পরই কৈয়া নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলো পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু গত আট মাসেও খনন কাজ শুরু হয়ন্
িএ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরীফুল ইসলাম জানান জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সালতা ও ভদ্রা নদীর ৩০ কিলোমিটারজুড়ে খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ইতোমধ্যেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলে শুস্ক মৌসুমে কাজ শুরু করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরী হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া দেরীসহ অন্যান্য কারণে বর্ষার আগে কাজ শুরু করা যায়নি।
এদিকে ঘের মালিক সূত্রে জানা গেছে, সপ্তাহ ধরে একটানা বৃষ্টি হওয়ায় বিল ডাকাতিয়া ও আশেপাশের ছোটখাট বিলগুলো পানিতে একাকার হয়ে গেছে। গ্রাম-গঞ্জে, মাঠে-ঘাটে পানি থইথই করছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ঘের মালিকদের এই দুর্গতি। জলাবদ্ধতায় পানি আটকে আছে। পুনঃরায় টানা বৃষ্টি হলে বিল ডাকাতিয়ার সমস্ত চিংড়ির ঘের ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
জামিরা বাজারের ব্যবসায়ী মো. আ. কবির জানান, অতিবর্ষণে বিল ডাকাতিয়ার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
আলকা গ্রামের ঘের মালিক রবিউল ইসলাম জানান, তার নিজের ঘেরসহ বিল ডাকাতিয়ার অধিকাংশ ঘের ভেসে গেছে বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে কৃষি অফিসের একটি সূত্র জানায়, অতিবর্ষণে বিল ডাকাতিয়ার চিংড়ির ঘের ও বীজতলা সম্পূর্ণ পানির নিচে ডুবে গেছে। কৃষকরা/ঘের মালিকরা পড়েছে মহাবিপাকে। গত বছর বন্যা ও অতিবর্ষণে চিংড়ির ঘের ভেসে যাওয়ায় তাদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এ বছরও ব্যাংক, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চিংড়ির ঘের পরিচালনা করে আসছে। এ অবস্থায় এ বছরও অতিবর্ষণে চিংড়ির ঘের ভেসে যাওয়ায় তাদের মাথায় হাত উঠেছে। তাদের একটাই চিন্তা এই ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে নেবে।
বিল ডাকাতিয়ার চিংড়ির ঘের অতিবর্ষণে ভেসে যাওয়ার ব্যাপারে ফুলতলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোল্যা ইমদাদুল্লাহ জানান, উপজেলায় মোট ৮ হাজার ১শ চিংড়ি ও সাদা মাছের ঘের রয়েছে। এর মধ্যে টানা বর্ষনে প্রায় ১ হাজার ৮শ চিংড়ির ঘের সম্পূর্ণ ভেসে গেছে।  এরপর যদি আবার বৃষ্টি হয় তাহলে শতকরা একশ ভাগ ঘের ভেসে যেতে পারে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মত ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, খুলনায় অতিবর্ষণে মৎস্য সেক্টরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৯ উপজেলায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর আমন বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। একই সাথে ২শ’ হেক্টর রোপা আমান আবাদের জমিও পানিতে নিমজ্জিত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ