ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 August 2017, ০২ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নাজাম শেঠি কি পারবেন পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে?

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : পাকিস্তান ক্রিকেট আর বিতর্ক যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই ভালো তো এই খারাপ। এই ছন্দে তো কাল উল্টো পথে। কিছুই আগ থেকে আঁচ করা সম্ভব নয়। তাই তো দলটির গায়ে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ শব্দটি ভালো ভাবে এঁটে আছে। বিশ্বের যে কোন দলকেই এরা নাস্তানাবুদ করে জয় তুলে নিতে পারে। আবার খুব বাজেভাবে হারের অসংখ্য রেকর্ড় রয়েছে দেশটির।  সদ্য শেষ হওয়া আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রপিতে গ্রপ পর্বের খেলায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি ভারতের কাছে হেরেছিল খুব বাজেভাবে। এ নিয়ে দেশটিতে ব্যঅপক সমালোচনার ঝড়ও উঠেছিল। আবার সেই দলটিই ভারতকে নাস্তানাবুদ করে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এই মুহূর্তে দেশটিতে চলছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের চেষ্টা। ২০০৯ সালে সন্ত্রাসী হামলার পর কোনদেশই পাকিস্তানে খেলার আগ্রহ দেখাচ্ছেনা।
তাই এখন দেশটির একমাত্র টার্গেট নিজেদের মাটিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের। এবার সেই উদ্যোগকে সফল করার ঘোষণা দিয়েছেন সদ্য দায়িত্ব নেয়া পিসিবির নতুন চেয়ারম্যান নাজাম শেঠি। পাকিস্তানের ক্রিকেটের সাথে ওতপ্রোতভাবে নাজাম শেঠির নামটি জড়িত আছে। তাকে নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। তবে অবশেষে আবার সভাপতির আসনটা ফিরে পেয়েছেন নাজাম শেঠি। ২০১৩ সালে আদালতের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যানের পদ হারিয়েছিলেন তিনি। এবার নির্বাচন করেই চেয়ারম্যান হয়েছেন। আর এরপর দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। নাজাম জানিয়েছেন দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরিয়ে আনাই হবে তার মূল লক্ষ্য। পিসিবির সাবেক হয়ে যাওয়া চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খান প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন পাকিস্তানের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরিয়ে আনতে। অবশ্য দুই বছর আগে জিম্বাবুইয়েকে আনতে পেরেছিলেন তিনি ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যে স্বল্প পরিসরের সিরিজ খেলানোর জন্য। কিন্তু আর কোন দলকে আনতে পারেননি। ২০০৯ সালে লাহোরে গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের কাছাকাছি সফরকারী শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের বাসে বন্দুকধারীরা হামলা করেছিল। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ও কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হন সেই হামলায়। এরপরই সিরিজের মাঝপথে দেশে ফিরে আসে লঙ্কান দল। তখন থেকে আর কোন বিদেশী দলই পাকিস্তান সফর করেনি। বারবার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছে পিসিবি। কারণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে এবং চোরাগোপ্তা হামলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা শঙ্কাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে পিসিবিকে ঘরোয়া সিরিজগুলো আয়োজন করতে হয়েছে আরব আমিরাতে।
 শাহরিয়ার খানের সময়ে সবচেয়ে বড় সাফল্যটা এসেছে শেষ সময়ে। এবার আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছে পাকিস্তান দল। ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর এটাই প্রথম কোন আইসিসি ইভেন্ট জয় পাকিস্তানীদের। এরপর থেকেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে পিসিবি। তারা আশা করছে এখন বড় দলগুলো তাদের মাটিতে এসে সিরিজ খেলতে আগ্রহ প্রকাশ করবে। তিন বছরের মেয়াদে চেয়ারম্যান হওয়ার পর নাজাম এখন তাই নিজের মূল লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছেন দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের ধৈর্য দেখাতে হবে। কারণ বিষয়টি দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে সেপ্টেম্বরে বিশ্ব একাদশের পাকিস্তান সফরটা দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস নাজামের। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি তিনম্যাচের টি২০ সিরিজে বিশ্ব একাদশ আসবে এবং পরবর্তী ২/৩ মাস আরও কিছু সুখবর বয়ে আসবে।
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভায় যোগ দিতে শ্রীলঙ্কায় গেছেন নাজাম শেঠি। তিনি জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কাকেই সবার আগে সিরিজ খেলার জন্য পাকিস্তানে আসার আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ২ টেস্ট, ৩ ওয়ানডে ও ২ টি২০ ম্যাচের একটি সিরিজ আরব আমিরাতে খেলার কথা রয়েছে পাকিস্তানের। সেই সিরিজটি হোমসিরিজ হওয়ায় এবার পাকিস্তানের মাটিতেই খেলার আহ্বান জানাবেন নাজাম। পাকিস্তানের মাটিতে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ। সদ্য চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জয় দেশটিকে নতুন করে আশা দেখাচ্ছে। নিজ মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের তোড়জোড় শুরু করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির সহযোগিতাও পাচ্ছে তারা।
এই মুহূর্তে টেস্ট খেলুড়ে কোন দেশ না গেলেও আগামী সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে বিশ্ব একাদশের বিপক্ষে একটি তিন ম্যাচের টি২০ সিরিজ আয়োজন করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। যে ম্যাচগুলো পাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের মর্যাদা। বিশ্ব একাদশের হয়ে এই সিরিজ খেলতে পাকিস্তানে যেতে পারেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক, হাশিম আমলা, লুক রনকি, টিম পেইনের মতো ক্রিকেটাররা। আর এই দলের কোচের দায়িত্বে থাকবেন এ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। গত আট এখন পর্যন্ত শুধু জিম্বাবুইয়েকে একবার ছাড়া আর কোন দলকে দেশের মাটিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলার জন্য আনতে পারেনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। কারণ নিরাপত্তা সমস্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। তবে প্রতিনিয়তই চেষ্টা চালিয়ে গেছে পিসিবি।
বিভিন্ন দলকে দেশের মাটিতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলার জন্য। বিশেষ করে এই আহ্বান বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুইয়ের প্রতি জোরালো ছিল কয়েকবার। বাংলাদেশও জাতীয় দল পাঠাতে সম্মত হয়েছিল একবার। কিন্তু সফরের বিরুদ্ধে করা রিটের বিপরীতে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সেটা বাতিল হয়ে যায়। এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার পর নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পিসিবি। আগামী সেপ্টেম্বরে আইসিসিই বিশ্ব একাদশ পাঠাবে তিন ম্যাচের টি২০ সিরিজ খেলতে। পিসিবি অন্য বোর্ডগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করে চেষ্টায় আছেন সফর নিশ্চিতের। পিসিবি বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। দেশের মাটিতে বাংলাদেশ দলকে খেলাতে এখনও সক্রিয়ভাবে চেষ্টা-তদবির ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড।
আর বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে দারুণ আশাবাদী পিসিবি। এ বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান শাহরিয়ার নিজেই বললেন, এখন সবগুলো দলই আমাদের সঙ্গে খেলতে চায়। তাদের এখন পাকিস্তানে আসা উচিত। সেখানে পূর্ণ নিরাপত্তা আছে। আল্লাহর ইচ্ছায় দলগুলো আসতে শুরু করবে। আমরা এই মুহূর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। তারাই প্রথম দল পাঠাতে পারে সংক্ষিপ্ত সফরের জন্য। হতে পারে সেটা শুধু টি২০ সিরিজ। এবার সবাইকে চমকে দিয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে শিরোপা জয় করে আট নম্বর র‌্যাঙ্কিংধারী পাকিস্তান দল। ১৯৯২ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের পর সেটাই ছিল পাকিস্তানের প্রথম কোন আইসিসি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। এই দারুণ অর্জনের পর এবার পাকিস্তান দলের দিকে সবার দৃষ্টি ফিরেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিসিবির নতুন চেয়ারম্যানকেই দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন সেটিকে শুধু বক্তৃতাতেই সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এক্ষেত্রে আইসিসির সহযোগিতা তার একান্তই প্রয়োজন হবে। এদিকে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশটিতে আবারো নেতিবাচক খবর। ফিক্সিং সন্দেহে দুই তারকা উমর আকমল ও মোহাম্মদ সামি। একজন বুকির স্বীকারোক্তিতে দু’জনের নাম উঠে আসায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) এ বিষয়ে নতুন তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন মোহাম্মদ ইউসুফ নামে এক বাজিকর। তাতেই বেশ কয়েকবার উঠে এসেছে পাকিস্তান দলের এই দুই ক্রিকেটারের নাম। ‘ওদের নাম স্বীকারোক্তিতে পাওয়া গেছে এবং এনসিএ’র কর্মকর্তারা বলেছেন, মোহাম্মদ ইউসুফ বেশ কয়েকবার তাদের নাম বলেছে।’ জানিয়েছে স্থানীয় শক্তিশালী এক সংবাদ মাধ্যম।
তবে পিসিবি এ নিয়ে কোন নোটিশ পাঠাতে পারেনি। বোর্ডের দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালা ভাঙ্গার কোন প্রমাণ না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। দু’জন ক্রিকেটারই সম্প্রতি পাকিস্তান দলে জায়গা হারিয়েছেন। তবে আগামী নবেম্বরে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে (বিপিএল) খেলার কথা তাদের। বাংলাদেশের এই টি২০ লীগে দু’জনের আচরণের ওপর তাই কড়া নজর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিসিবি। পাকিস্তান সুপার লীগে (পিএসএল) স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে এ বছরের শুরুতেই শারজিল খান ও খালিদ লতিফকে দুবাই থেকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।
একই টুর্নামেন্টে বাজিকরদের প্রস্তাব পেয়েও সেটি বোর্ডকে না জানানোয় ১২ মাসের নিষেধাজ্ঞা জুটেছে দীর্ঘদেহী পেসার মোহাম্মদ ইরফানের। তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই আগে থেকেই পিসিবির এই নজরদারি। বিপিএলে যে প্রায় প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই খেলতে আসেন পাকিস্তানী ক্রিকেটাররা। ২৭ বছর বয়সী আকমল ২০০৯ থেকে পাকিস্তানের হয়ে ১৬ টেস্ট, ১১৬ ওয়ানডে ও ৮২টি ম্যাচ খেলেছেন। এক সময় তাকে ছাড়া দল কল্পনাই করা যেত না। আচরণগত সমস্যায় বারবার ছিটকে গেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ