ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 August 2017, ০২ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী ত্রাণ তৎপরতা অপ্রতুল

দিনাজপুর: প্রবল বর্ষণ ও ভারতের বাঁধ খুলে দেয়ায় দিনাজপুর সদরের মাহুতপাড়া এলাকার শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এতে শহরের বাসাবাড়ীতে পানি প্রবেশ করেছে

নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) সংবাদদাতা: টানা প্রবল বষর্ণে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট ৪ উপজেলায় ৫০ হাজার বিঘা জমির আমন রোপা পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। এর কারণে কৃষকের অতিকষ্টের রোপন করা আমন ধানের রোপা ক্ষতি সাধন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এলাকার ক্ষুদ্র প্রান্তিক শ্রেণীর কৃষকেরা আমন ফসল রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এদিকে প্রবল বর্ষনের কারণে ৪ উপজেলার নিচু এলাকায় প্রায় ১হাজার পুকুরের মাছ বের হয়ে ২ কোটি টাকার লোকসান মাথায় নিয়ে দিশে হারা ৫শতাধিক মৎস্য চাষী। মৎস্য চাষী তহিবুর রহমান জানান তিনি এ বছর অন্যের পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় তার ৪টি পুকুরে মাছ উৎপাদন হয়েছিল প্রচুর। আর কয়েকদিন পার হলেই ওই মাছগুলো বাজারে বিক্রি করতে পারত। এই বর্ষণের কারণে তার পুকুরে সব মাছ বের হয়ে গেছে। এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ আব্দুল হান্নান জানান বন্যায় নবাবগঞ্জ উপজেলায় ১২৯টি পুকুর আয়তন ৩৫.৮১ হেক্টর ক্ষতির পরিমাণ ৯৬.৬৯ মেট্রিকটন মাছ। টাকা ৯৬.৬৯ লাখ। তিনি জানান ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্য চাষীদের তথ্য সংগ্রহ করে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে জানিয়েছেন। এদিকে বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ১০টি গ্রামে প্রবল বর্ষণে খিয়ার মাহমুদপুর ,দক্ষিন দাউদপুর ,রণ গ্রাম, গবিন্দপুর, হরিল্যাখুর, মকুন্দপুর সহ পনি বন্দি অবস্থায় রয়েছে ১০হাজার নারী পুরুষ। দেখা দিয়েছে গো খাদ্যের তিব্র সংকট। পার্শ্ববর্তী ভারত সীমান্ত পার হয়েও আসছে পানি। কৃষি ফসল সহ পুকুরের মাছ ক্ষতি সাধিত হয়েছে। গত রোববার সকাল থেকেই দিনাজপুর ৬ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ শিবলী সাদিক বিরামপুরের যমুনা নদীর ভাঙ্গনের বাঁধ পরিদর্শন শেষে সীমান্ত সংলগ্ন উল্লিখিত গ্রামের জনসাধারণের মাঝে শুকনো খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন।
চিরিরবন্দর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে বিদ্যালয় মাঠ, খাল-বিল, ডোবা-নালা। ডুবে গেছে বিন্তীর্ণ ফসলের মাঠ। টানা বর্ষণের ফলে দুর্ভোগে পড়েছে শ্রমজীবি মানুষ। দাম বেড়ে সবজি সহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মুল্যের। বুধবার (৯ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত আজ শনিবার পর্যন্ত মুষলধারে বর্ষণের ফলে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বৃষ্টিপাত থাকার কারণে জেলায় শ্রমজীবি মানুষ কাজে যেতে পারেনি। উপজেলার রাস্তাগুলো ফাঁকা ছিল। দোকানপাট অনেকটাই বন্ধ। শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনি।
জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোঃ তোফাজ্জল হোসেন জানান, শুক্রবার সকাল ৯টায় থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২১৬ মিলি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আরও ২দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন। অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার গুচ্ছগ্রাম এর ২০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছে মসজিদে। ৭ নং আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের মহাদানী এলাকায় প্রায় ২শত বাড়ী পানিবন্দী হয়ে আছে। ৯ নং ভিয়াইল ইউনিয়ন বির্স্তীন এলাকা প্লাবিত হয়ে সেখানেও শতাধিক এর বেশী পরিবার দুর্বিসহ জীবন জাপন করতেছে। প্লাবিত হয়েছে উপজেলা সদরসহ নশরতপুর ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা ঐ এলাকার পরিবারের লোকজন গবাদি পশুসহ আসবাবপত্র নিয়ে বিভিন্ন উচুঁ জায়গায় অবস্থান করছে। এদিকে আত্রাই, ইছামতি, বেলান, কাকড়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে খাল-বিল তলিয়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেস করছে ফলে প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা : উপজেলার কাপাসিয়া, হরিপুর, শ্রীপুর, বেলকা, তারাপুর, কঞ্চিবাড়ী ও চণ্ডীপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ২ হাজার হেক্টর আমন ক্ষেত। পানি বন্দি মানুষ গবাদি পশু হাঁস-মুরগী নিয়ে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। অনেকেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়ি বাঁধে ও আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বন্যা এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, ওষুধপত্র, স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানিয় জলের সংকট। এ পর্যন্ত পানি বন্দি মানুষ জনের নিকট সরকারিভাবে কোন সহায়তা পৌঁছেনি।
উপজেলা কৃষি অফিস সুত্র জানায় বন্যায় ১৬’শ হেক্টর আমন ধান, ৪২ হেক্টর বীজতলা ৪৫ হেক্টর শাক সবজি নিমজ্জিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুন্দরগঞ্জ ইউনিটের এসও এটিএম মোনায়েম হোসেন জানান, সুন্দরগঞ্জ এলাকায় তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১৫ সেঃ মিঃ বিপদ  সীমার উপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম গোলাম কিবরিয়া জানান, ইতোমধ্যে বন্যার্তদের জন্য ৪০ মেঃ টঃ চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
এ দিকে সাঘাটা উপজেলায় গত ৫ দিনের বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়ে রোপা আমন ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, ব্রক্ষ্মপুত্রের পানি ২০.২০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিপদ সীমার ৩৮ সে.মি অতিক্রম করছে। ফলে উপজেলায় বন্যার পানিতে বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ী নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে নতুন নতুন অঞ্চল।
রাঙ্গুনিয়া সংবাদদাতা: গত দু’দিনের টানা বৃষ্টিতে আবারও রাঙ্গুনিয়া জুড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নে রোপা আমন লক্ষ্যমাত্রা ১৫ হাজার হেক্টর। তৎমধ্যে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর রোপা আমন পানির নিচে রয়েছে। উত্তর চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার খ্যাত গুমাইবিল প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। গুমাইবিলে কৃষকরা ৫০% আমন রোপা চাষ শেষ করেছে। আরো ২০% জমিতে চাষ হবে। বাকী ৩০% জমি অনাবাদি থাকবে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। বন্যার পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় রাঙ্গুনিয়ার শতশত গ্রামের মানুষ শংকিত হয়ে পড়েছে।
কাপ্তাই-চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম, চন্দ্রঘোনা-বান্দরবান, চৌমুহনী-রানীরহাট সড়কের কিছু কিছু এলাকায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কর্ণফুলী নদীর পানি বৃদ্ধিতে কোদালা, শিলক, সরফভাটা, বেতাগী, পোমরা, চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ আতংকে রয়েছে। টানা বৃষ্টি ও পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী ঢলের পানি ইছামতি খাল দিয়ে অতিরিক্ত পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির স্রোত বেশী থাকায় পারুয়া, রাজানগর, ইসলামপুর, দক্ষিণ রাজানগর, লালানগর, হোছনবাদ, স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া, পৌরসভার কয়েক একর জমি বিলীন হয়ে গেছে।
সোনাইমুড়ী (নোয়াখালী) সংবাদদাতা : টানাবৃষ্টির ফলে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলা জুড়ে বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারন করেছে। গ্রামীণ অবকাঠামোর অবনতি হয়েছে। সৃষ্ঠ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের মাঝে সরকারী/বেসরকারী কোন ধরনের ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়নি। এই নিয়ে প্রশাসনের মাঝেও নেই তেমন কোন উদ্যোগ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সেনবাগসহ বিভিন্ন উপজেলাকে বন্যা কবলিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সোনাইমুড়ী উপজেলাকে এখনো বন্যা দূর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি এবং কোথায়ও কোন ধরনের ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়নি। এই নিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থরা পড়েছে চরম ভোগান্তিতে । কোন ধরনের ত্রাণ না পাওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী মাঝে হতাশা বিরাজ করছে।
জানা যায়, সোনাইমুড়ী উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড, উপজেলার জয়াগ, নদনা, চাষিরহাট, বারগাঁও, অম্বরনগর, নটেশ্বর, সোনাপুর, আমিশাপাড়া ও দেওটি  ইউনিয়নসহ সর্বত্রই দেখা দিয়েছে বন্যা। রাস্তা-ঘাট, বসতবাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী স্থাপনা ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। পানি বন্দি হয়ে পড়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।  এতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। উপজেলার অধিকাংশ মাছের খামার ভেসে গেছে পানিতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ