ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 August 2017, ০২ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঐতিহাসিক পঙ্খিরাজ খালসহ বিলুপ্তির পথে বহু খাল-জলাশয়

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ (নারায়ণগঞ্জ) থেকে: ঐতিহ্যবাহী পঙ্খিরাজের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রাচীন বাংলার বিশ্বখ্যাত গর্বিত জনপদ পানাম নগরী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পৌরসভায় অবস্থিত। ঐতিহাাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিখ্যাত প্রাচীন জনপদটির ব্যবসা বানিজ্যের একমাত্র পানিপথ ও সুরক্ষা দেয়াল হিসেবে পরিচিত, পঙ্খিরাজ আজ দখলদারদের দৌরাত্মে মৃতপ্রায়।
ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে একসময় সোনারগাঁ, আড়াই হাজার ও রূপগঞ্জসহ অনেক গ্রামের মানুষের নৌকাযোগে চলাচল ও পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়ার  একমাত্র ভরসার নাম ছিলো পঙ্খিরাজ খাল।  তৎকালীন সময় পানাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ভবন ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া পূর্বদিকে মেনিখালি নদ পঙ্খিরাজ খাল হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। বর্তমানে পূর্ব দিকের মেনিখালী নদের সাথে পঙ্খিরাজের সংযোগস্থলের জলপ্রবাহ প্রায় বন্ধ।
উপজেলার পৌরসভা এলাকায় মেনিখালী নদের মুখে খালের সংযোগস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার প্রভাবশালী দখলদাররা পঙ্খিরাজ খালের পশ্চিমপাশে বালু ভরাট ও পূর্বপাশে আরসিসি দেয়াল দিয়ে খালের প্রবাহ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে । দখলের কারনে সরু হয়ে যাওয়া খাল দিয়ে পানি সরতে না পারায় স্থানীয় প্রায় ১০ গ্রামে জলাবদ্ধতাসহ নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। াএ এলাকায় নদী পথে যোগাযোগ এখন শুধুই ইতিহাস। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সোনারগাঁ পৌরসভার মেয়র সাদেকুর  রহমান বলেন , ‘এ খালটি অবমুক্ত না করলে পৌরবাসী মারাত্বকভাবে  পরিবেশ দূষনের শিকার হবে’। এবিষয়ে সরকারের উপর মহলের হস্থক্ষেপ কামনা করেন তিনি। এছাড়াও পৌরসভার ভট্টপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের  পিছনে বয়ে যাওয়া খাল দখল করে তৈরি করা  হয়েছে একাধিক স্থাপনা। বর্তমানে পুরো খালটি দখলদারের লালসার বস্তুতে পরিনত হয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় জনগন  জানান,‘পৌরসভার অদক্ষতা ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ঋষিপাড়া খালের উপর অপরিকল্পিতভাবে নির্মান করা ছোট্ট কালভার্টটি সহ খালটির উপর নির্মান করা আরো কিছু কালভার্ট খাল ধ্বংসে অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। এ খালটি দখলমুক্ত করা না হলে, পৌরবাসী ভয়ংকর জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হবে।’ নাম না প্রকাশ করার শর্তে ঋষিপাড়া গ্রামের সত্তুরোর্ধ এক ব্যাক্তি জানান, ‘ঋষিপাড়ার পূর্বের ব্রীজ ও কাঠের পুলটি বর্তমান ব্রীজ থেকে অনেক বড় ছিলো’। বর্তমানে ব্রীজের নিচে ময়লা জমে পানি চলাচল প্রায় বন্ধ।
ইতিহাসবিদদের মতে বিশ্বনন্দিত বানিজ্যিক শহর পানাম নগর ও এর আশপাশ এলাকা ছিলো এক সময়ের উপমহাদেশের অন্যতম বানিজ্যিক কেন্দ্র। পঙ্খিরাজ খালের তীরে গড়ে ওঠা অট্টালিকা, সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুরঘর, নাচঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাকশাল, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ ও প্রমোদালয় এখনো এ খালের দূরন্ত প্রবাহের  স্বাক্ষী বহন করে দাড়িয়ে আছে। প্রাচীন এ নগরটিকে অনেক ইতিহাসবীদ মসলিন ক্রয় বিক্রয়ের প্রধান বন্দর বলেও আখ্যায়িত করেছেন। ১৩৪৬ সালের ১৪ আগষ্ট মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা সোনারগাঁকে একটি সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর এ সুরক্ষার দ্বায়িত্বে ছিল পঙ্খিরাজ খাল। যদিও ইতিহাসে পঙ্খিরাজ খালের যৎসামান্য উল্লেখ আছে। সোনাগাঁয়ের সমৃদ্ধি ও বহিশত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষায় এ খালটি বর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর পানাম নগরী তৈরি করতে কাঁচামালসহ আনুসাঙ্গিক সকল মালামাল আসত এই পঙ্খিরাজ খাল দিয়ে। জেমস টেলরের মতে,‘মসলিন শিল্প বেচাকেনার এক প্রসিদ্ধ বাজার ছিলো পানাম নগর।’ এ ব্যাপারে স্থানীয়  সুরেন্দ্র দাস বলেন,‘বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, পঙ্খিরাজ খাল দিয়ে বড় বড় সওদাগরী ও ব্যাপারী নৌকা চলাচল করত।’
পঙ্খিরাজ খালটি উদ্ধারের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভুমি) রোবায়েত হায়াত শিপলু উভয়েই দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ‘নকঁশা অনুযায়ী খালের অবস্থান ও আয়তন নির্ণয় করে, ঐতিহাসিক পঙ্খিরাজ খালকে দখল মুক্ত করতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ