ঢাকা, সোমবার 21 August 2017, ০৬ ভাদ্র ১৪২8, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রয়োজন একজন আইয়ুবীর

এহতেশামুল আলম জাকারিয়া : জেরুজালেম! অগণিত নবী-রাসুলের স্মৃতিধন্য পূণ্যভূমি। এই শহরেই রয়েছে মুসলমানদের প্রথম কিবলা মসজিদুল আল আকসা। ১৬ মাস যাকে কিবলা ধরে নামাজ আদায় করা হয়েছিল। প্রিয় নবী (স.) এর পবিত্র মেরাজ বেহেশ্তি বাহন বোরাকে চড়ে শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। পবিত্র আল-কোরআনের  এ সম্পর্কে বলা  হয়েছে” “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।” [সূরা আল ইসরাঃ ১]। এখানে মসজিদে আকসার চারদিক বলতে জেরুসালেম শহরকেই বুঝানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল কুদসের (জেরুসালেম) এমন কোন জায়গা খালি নেই যেখানে একজন নবী সালাত আদায় করেননি বা কোন ফিরিশতা দাঁড়াননি।” [তিরমিজি] এর পূর্ব নাম ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। রাসুল (স.) এর যুগ থেকেই এর  নামকরন করা হয় মসজিদুল আস আকসা। মুসলমানদের কাছে জেরুজালেম শহরটি আল কুদস নামেও পরিচিত। যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে ইবাদাতের নিয়াতে সফরের অনুমতি আছে তার মধ্যে একটি হল আল আকসা মসজিদে। বাকি ২টি হলো মসজিদে হারাম (মক্কা) ও মসজিদে নববী (মদিনা) [বুখারী] ১১৮৯; মুসলিম:১৩৯৭। এর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (স.) বলেছেন, ‘ঘরে নামাজ পড়লে এক গুণ, মসজিদে ২৫ গুণ, মসজিদে নববী ও আকসায় ৫০ হাজার গুণ, মসজিদে হারামে এক লাখ গুণ সাওয়াব’ (ইবনে মাজাহ)। মহানবী সা: মদিনায় হিজরত করার পর প্রায় ১৬ মাস মসজিদুল আকসার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হিজরি দ্বিতীয় সনের শাবান মাসে মতান্তরে রজব মাসের মাঝামাঝি মহানবী (স.) কিছু সাহাবায়ে কিরামসহ মদিনার অদূরে মসজিদে বনু সালামায় জোহর মতান্তরে আসর নামাজ আদায় করেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাকাতের মাঝামাঝি আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (স.) ও সাহাবায়ে কিরাম চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজের দুই রাকাত কাবা শরিফের দিকে ফিরে আদায় করেছিলেন বিধায় ইসলামের ইতিহাসে মসজিদটি মসজিদে কিবলাতাইন বা দুই কিবলা হিসেবে সুপরিচিত ও সমাদৃত। অনেকে মনে করেন হযরত সুলাইমান (আ.) মসজিদে আকসা তৈরি করেছেন, অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুল। ইব্রাহীম (আ.)ই প্রথম আল আকসা তৈরি করেন। ইব্রাহীম (আ.) যেমন কাবার প্রতিষ্ঠাতা নন, ঠিক তেমনি সুলাইমান (আ:) ও মসজিদে আকসার প্রতিষ্ঠাতা নন। বরং উভয়েই পুনঃনির্মাণকারী। কাবার মূল প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন হযরত আদম (আ:)। আর আল আকসার মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরত ইব্রাহিম (আ:)।
একটি হাদিস থেকে জানা যায়-হযরত আবু যার গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করি, যমীনে প্রথম কোন মসজিদে তৈরি হয়েছিল? তিনি উত্তরে বলেন,“মসজিদে হারাম”। আমি জিজ্ঞেস করি তারপর কোনটি? তিনি বলেন “মসজিদে আকসা”। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করি। এ দুটোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান কতো? তিনি বলেন। ৪০ বছর। [বুখারি, মুসলিম]। ইব্রাহীম (আ.) ও সুলাইমান (আ.) এর সময়ের ব্যবধান হচ্ছে ১ হাজার বছর। এবং উপরের সহিহ হাদিসে বলাই হয়েছে কাবার ৪০ বছর পরে আকসা তৈরি হয়েছে। ইবনুল যাওজী (র) বলেন, এই হাদিসে মসজিদে আকসার প্রথম ভিত্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইব্রাহিম (আ) এর পর উনার ছেলে ইসমাইল (আ.)ও ইসহাক (আ.), তারপরে ইসহাক (আ.) এর ছেলে ইয়াকুব (আ.)। যার উপাধি ছিল ইসরাইল। তার বংশধরদের বনু ইসরাইল বলা হয়। তারপর ইয়াকুব(আ.) এর ছেলে ইউসুফ (আ.), তারপর মুসা (আ), তারপর ইউশা বিন নুন(আ), তারপর দাউদ(আ) এবং তারপর দাউদ(আ) এর ছেলে সুলাইমান(আ.)দুনিয়াতে আগমন করেন। তিনিই মসজিদে আকসা পুনঃনির্মাণ করেন। এই মসজিদে নির্মাণে ৩০হাজার শ্রমিকের ৭ বছর সময় লেগেছিল। ইবনে তাইমিয়া (র) বলেন, হযরত ইব্রাহিম (আ) এর যুগেই মসজিদে আকসা তৈরি হয়েছিল, হযরত সুলাইমান (আ.) তা বড় ও মজবুত করে তৈরি করেন। [মাজমুউল ফাতাওয়া ১৭খন্ড, ৩৫১পৃঃ]
মসজিদে আকসা থেকে ৫০০ মিটার দক্ষিনে অবস্থিত কুব্বাতুস সাখরা, যা ৬৯১ সালে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক কাবা শরীফের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে  মহানবী (স.) যে যায়গা হতে মেরাজে গমন করেছিলেন (বায়তুল মুকাদ্দাস সংলগ্ন), সে যায়গা তৈরী করেছেন এবং মুসলমানদেরকে আগামী বছর হতে কাবার পরিবর্তে এখানে হজ্জ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ৬৯২ সালে খলিফা আব্দুল মালিকের প্রাদেশিক শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট আরাফাতের যুদ্ধে তৎকালীন মক্কা-মদিনার শাসক আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের পরাজিত ও নিহত হওয়ায় মক্কা-মদিনা আব্দুল মালিকের অধীনে চলে যায়। তাই এখানে হজ্জ করার আদেশটি বহাল রাখার প্রয়োজন হয় নি। কুব্বাতুস সাখরা চুনা পাথরে নির্মিত ইমারত। বাহিরের দিক অষ্টভুজবিশিষ্ট কিন্তু অভ্যন্তরে চতুর্দিক বৃত্তাকার করে সাজানো স্তম্ভের সমষ্টি। এ স্তম্ভের সংখ্যা ১৬টি । বাহিরের অষ্টভুজের এক দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৬৭.৫ ফুট, উচ্চতা ২৯.৫ ফুট, প্রত্যেক দেয়ালে ৭টি করে জানালা আছে মনে হয় কিন্তু জানালা ৫টি আর বাকি দুটি বন্ধ প্যানেল। গম্বুজের পিপার নিম্মাংশ হতে একটি ঢালু ছাদ বাহিরে অষ্টভুজ দেয়ালের উপর মিলিত হয়েছে। কুব্বাতুস সাখরা চার দিকে ৪ টি তোরন আছে। এর অলঙ্করণ অপরূপ, তবে একাদশ শতাব্দী হতে ফাতেমীয়, মামলুক, উসমানীয় তুর্কি, ব্রিটিশ এবং আরব শাসকগন বিভিন্ন সময়ে সংস্কার এর কারণে প্রাচীন অলঙ্করণ খুব কমই আজ বিদ্যমান। অনেকেই এই কুব্বাতুস সাখরাকেই আল আকসা মসজিদ বলে ভুল করে থাকেন।বাস্তবে দুটির আবস্থান ও গুরুত্ব আলাদা। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.)-এর  নেতৃত্বে মুসুলমানরা আল কুদস তথা জেরুজালেম জয় করে। ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা নামধারী মুসলিম শাসকদের সহায়তায় সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে। এরপর তারা ১০৯৯ সালের ৭ জুন বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গির্জায় পরিণত করে। ক্রুসেডাররা চালায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, মুসলমানদের রক্তে প্লাবিত হয়েছিল পবিত্র আল কুদস। এভাবেই কুদসে  ৪৬২ বছরের মুসলিম শাসনের পতন ঘটে। এর পর দীর্ঘ প্রতিক্ষা, গোলামীর জিঞ্জির ভেংগে, জিল্লতির জীবন ছেড়ে মাথা তোলে দাঁড়াবার জন্য মুসলিম মিল্লাত অপেক্ষা করছিল একজন মুক্তিদূতের। ১০৯৯ সালের পরের কোন এক সময়, তখন আল কুদস ক্রুসেডারদের দখলে। বাগদাদ শহরে এক কাঠমিস্ত্রি  থাকতেন।লোকটি মনের সকল ভালোবাসা দিয়ে খুব সুন্দর একটি মিম্বর বানালেন। মিম্বরটির সৌন্দর্যের কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে লোক মিম্বরটি দেখতে আসতে শুরু করলো। অনেকেই মিম্বরটি কিনতে চাইতো, কিন্তু কাঠমিস্ত্রির জবাব ছিল এটি বিক্রির জন্য নয় এটি বানিয়েছি মসজিদে আল আকসার জন্য। তার কথাশুনে সবাই  হাসতো। কাঠমিস্ত্রিকে  পাগল ঠাওরাত। কিন্তু কাঠমিস্ত্রি তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। একদিন এক ছোট ছেলে তার পিতার হাত ধরে এসেছিল মিম্বরটি দেখতে এবং কাঠমিস্ত্রির কাছ থেকে তার স্বপ্নের কথাও জেনেছিল।ছোট ছেলেটি মনেমনে প্রতিজ্ঞা করেছিল কাঠমিস্ত্রির স্বপ্ন সে পূরণ করবে। সময়ের ব্যবধানে সেই ছেলেটি মিম্বরটি আল আকসায় স্থাপন করেছিল। তিনি আর কেউ নয়, দিক বিজয়ী বীর সুলতান গাজী সালাউদ্দিন আইয়ূবী। ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। ফাতেমি খিলাফতের কেন্দ্রীয় খলিফার নির্দেশে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী র: গভর্নর ও সেনা প্রধান হয়ে মিসরে আগমন করেন। এরপর ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হিত্তিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহ:) জেরুসালেম শহর মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। অতঃপর ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর শুক্রবার সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহ:) বিজয়ীর বেশে বাইতুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করেন। বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত হওয়ার পর সেখানকার মুসলিমরা প্রায় ৯০ বছর পর ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছিল। আল আকসায় উড়ল কালেমা খচিত হিলালি নিশান। ১৯৪৮ সালে বিশ্ব  মোড়লদের চক্রান্তে মধ্যপ্রাচ্যের বিশফোড়া অভিশপ্ত ইসরাইল  নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৬৭ সালে জুন মাসে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া,জর্ডান এবং ইরাক এই চারটি আরব রাজ্যের প্রতিরোধ বুহ্য ধ্বংস করে ইসরাইল পূর্ব আল কুদস, পশ্চিমতীর, গাজা এবং গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। ধীর্ঘ ৭৮০ বছর পরে আবারো পবিত্র আল আকসা থেকে হিলালি নিশান খসে পড়ে।  সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীর আমানত হাতছাড়া হয়।তার পর থেকে বিগত অর্ধশতাব্দি ধরে আল আকসা কাঁদছে আর বিলাপ করে বলছে, “আমি আল আকসা! মুসলমানদের প্রথম কিবলা। মিল্লাতের পিতা ইব্রাহীমের সুনিপুণ হাতে বানানো ইবাদত গৃহ। যায়নবাদীদের হাতে বন্দী হয়ে, একজন সালাউদ্দিন আইয়ুবীর জন্য বিগত ৫০ বছর ধরে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি, কিন্তু মুসলমানদের নেতৃত্ব আজ ঘুনেধরা। ক্ষমতালিপ্সা,অর্থের লোভ আর নারীর অন্ধমূহে বুদ হয়ে আছে তার বড় একটি অংশ। মিল্লাতের পিতা ইব্রাহীম!তোমার সন্তানেরা সংখ্যায় বিপুল, ১৫০ কোটির উপরে। কিন্তু তারা আজ অথর্ব মেরুদ-হীন। কেননা তারা ভুলেগেছে দ্বীনের জন্য তোমার ত্যাগের শিক্ষা, শুধু আনুষ্ঠানিকতাকেই তারা ইবাদত মনে করে। কয়েক লাখ ইহুদীর  দখল থেকে মুক্ত করতে পারছেনা পবিত্র আল আকসা।  খালিদ সাইফুল্লাহ-মুসান্না-তারিক বিন জিহাদ-সালাউদ্দিন আইয়ুবীর ইতিহাস ভুলে তারা পড়ে রূপকথার গল্প আর নোংরা প্রেমের উপন্যাস । মহিলারা আছিয়া-সুমাইয়্যার ইতিহাস বাদ দিয়ে তার স্টার জলসা-জি বাংলার নেশায় বুদ হয়ে থাকে। দিগবিজয়ী ওমরের গল্প তাদের কাছে সেকেলে মনে হয়। স্বার্থপরতা আর বিজাতীয় অন্ধ অনুকরনে মিল্লাতের রক্তে  জন্ম নিয়েছে গাদ্দারের বীজ। এ জাতীর উত্তরনে আবারো একজন গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবীর প্রয়োজন, যিনি চারিত্রিক মাধুর্যতা, অসীম সাহসীকতা, দূরদৃষ্টি ও বাঘের ক্ষীপ্রতা দিয়ে আভিশপ্ত ইহুদীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনবেন পবিত্র আল আকসা, সূচিত হবে ইসলামের বিজয়। কে হবে সেই মুক্তিদূত?”  আর কত কাল অপেক্ষা......। বিবেক কে প্রশ্ন করি, একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ? বিবেকই বলে দেবে সঠিক পথ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ