ঢাকা, মঙ্গলবার 22 August 2017, ০৭ ভাদ্র ১৪২8, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৭৫% পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনে ঘুষ নেয় পুলিশ -টিআইবি

 

স্টাফ রিপোর্টার : পাসপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে ৫৫ শতাংশ মানুষই দুর্নীতির শিকার হচ্ছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। অন্যদিকে তথ্য যাচাই বা ভেরিফিকেশনের সময় শতকরা ৭৫ দশমিক ৩ জন গ্রাহকের কাছ থেকে এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) পুলিশ ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ আদায় করে থাকে। এক্ষেত্রে, ভেরিফিকেশনের জন্য পাসপোর্ট গ্রাহকরা গড়ে ৭৯৭ টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধে পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পুলিশ ভেরিফিকেশন ও সত্যায়নের নিয়ম বাতিলসহ ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে  টিআইবি। 

‘পাসপোর্ট সেবায় সুশাসন : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে এ সুপারিশ করেছে দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবি। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে সংস্থাটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহনূর রহমান প্রতিবেদনে সার সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন। এ সময় টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল, সদস্য এম. হাফিজউদ্দিন খান, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। দেশের ২৬টি জেলায় পরিচালিত এক সমীক্ষার ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয় বলে সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়। এ গবেষণা চলেছে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত।

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন পাসপোর্টের আবেদনকারীদের তিন-চতুর্থাংশকেই পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হয়ে ‘ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত টাকা’ দিতে হয়। সিলেট অঞ্চলের গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে রাজশাহী অঞ্চলের গ্রাহকরা কম দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন।

টিআইবি বলছে, পাসপোর্ট করাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয় পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি), তাদের ছাড়পত্রের (ভেরিফিকেশন) জন্য। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এ কাজের জন্য অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাদের গড়ে ৭৯৭ টাকা ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত টাকা পুলিশকে দিতে হয়েছে ভেরিফিকেশনের জন্য।

টিআইবির জরিপে অংশগ্রহণকরীরা বলেছেন, পুলিশের ওই দফতর ‘অযথা’ আবেদনপত্রে ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। জঙ্গি কার্যক্রম বা অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহের কথা বলে ভয় দেখায়। বাড়িতে না গিয়ে চায়ের দোকান বা থানায় ডেকে পাঠায়। ঘুষ দাবি করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা বিকাশের মাধ্যমে পাঠাতে বলে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। এর মধ্যে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ ঘুষ বা নিয়ম বহির্ভূত অর্থ দিতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর ২৭ শতাংশ শতাংশ উত্তারদাতা অযথা সময়ক্ষেপণের শিকার হওয়ার এবং ২ দশমিক ২ শতাংশ পাসপোর্টগ্রহীতা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কথা বলেছেন। পাসপোর্ট বিতরণে অফিস নির্ধারিত সময়ের পর গড়ে ১২ দিন, সর্বোচ্চ ৪৪.৮ দিন এবং সর্বনি¤œ ৪.৪ দিন বিলম্ব হয়।

বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বজনরা সহজে পাসপোর্ট পেলেও সাধারণ মানুষকে পাসপোর্ট পেতে ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয় বলে জানান টিআইবি চেয়ারপার্সন। এসব ভোগান্তির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, কিছু মানুষ নিয়ম বহির্ভূত সুবিধা পাচ্ছে, এ কারণেই সাধারণ মানুষ সুবিধা পায় না।

পাসপোর্ট অফিসগুলোকে ঘিরে দালালদের উৎপাত ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে থেকেই কর্মকর্তারা দুর্নীতি প্রশ্রয় দেন, এ কারণেই দালালদের তৎপরতা বন্ধ করা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কাগজপত্র সত্যায়িত করার জন্য অনিয়ম দুর্নীতির ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাইরের ফটোকপির দোকানের যোগাসাজশ রয়েছে। সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে পাসপোর্টে সত্যায়ন-প্রত্যয়ন ও পুলিশ প্রতিবেদনের প্রথা চলে আসছে। 

ড. ইফতেখারুজ্জমান বলেন, গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা দেখিয়েছি, পুলিশ ভেরিফিকেশনে হয়রানি হচ্ছে; এটার কোনো দরকারই নেই। এর বদলে সকল নাগরিকের জন্য ‘বায়োমেট্রিক ডাটা ব্যাংক’ এবং ‘অপরাধী তথ্য ভান্ডার’ তৈরি করে তার সঙ্গে পাসপোর্ট অফিস ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের সংযোগ স্থাপন করার সুপারিশ করেন তিনি।

গবেষণা প্রতিবেদনে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে বৃটিশ আমল থেকে চলে আসা পুলিশ ভেরিফিকেশন ও সত্যায়নের নিয়ম পুরোপুরি বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহকের তথ্য যাচাইয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নিয়ম তুলে দেয়ার পক্ষে পুলিশসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাংশ সম্মত রয়েছেন। কিন্তু একাংশ এই নিয়ম বহাল রাখতে চান, আর এ কারণে ভেরিফিকেশনের প্রথা তুলে দেয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া পাসপোর্ট নবায়ন বা রিনিউ করার মেয়াদ দশ বছর করার সুপারিশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, বর্তমানে পাঁচ বছর পর পর পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে গ্রাহকদের দুর্নীতির শিকার হতে হয়। যদি এর মেয়াদ দশ বছর করা হয় তাহলে এমনিতেই দুর্নীতি কমে যাবে। পাসপোর্ট অফিস ও এসবি পুলিশের অসাধু কর্মচারীদের শাস্তির আওতায় আনা এবং দালালের সহযোগিতা নেয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারীদের অফিস সময়ে নির্ধারিত পোশাকের ব্যবস্থা এবং পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করা হয়। এছাড়া  চাহিদার সাথে সংগতি রেখে পাসপোর্ট কার্যালয়গুলোতে জনবল, অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের সরবরাহ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ; পাসপোর্ট আবেদনে প্রি-এনরোলমেন্ট ও বায়ো-এনরোলমেন্টের তথ্যাদি ব্যবহারে জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) সংরক্ষিত তথ্য ব্যবহার পর্যায়ক্রমে শুরু করার সুপারিশ করেছে টিআইবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ